রাজীবের ঘাতক বাসচালকদের ফাঁসির দাবি

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৯:১৫, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৬, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

রাজীব হোসেনের মৃত্যুতে ঘাতক বাসচালকদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন (ছবি: সাদ্দিফ অভি)রাজধানীতে দুই বাসের রেষারেষিতে চাপা পড়ে হাত ও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজীবের প্রাণ হারানোর ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করেছে যাত্রী অধিকার আন্দোলন। ঘাতক বাসচালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার (১৭ এপ্রিল) সকালে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে সমবেত হন এর সদস্যরা।

রাজীব হোসেনের মৃত্যু, গৃহবধূ আয়েশা খাতুনের মেরুদণ্ড ভাঙা ও বেসরকারি চাকরিজীবী রুনা আক্তারের পা থেতলে যাওয়া— এ তিনটি ঘটনা উল্লেখ করে যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল বলেন, ‘রাজধানীর গণপরিবহনগুলোর চালকরা এতই বেপরোয়া হয়েছে যে মানুষের প্রাণ এখন তাদের কাছে তুচ্ছ। তারা রাস্তায় মানুষের জীবন নিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে।’

যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়কের ভাষ্য, ‘রাজধানীর পরিবহন নৈরাজ্য বন্ধ করতে আমরা বহুদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আগে থেকে ব্যবস্থা নিলে আজ রাজীবকে প্রাণ দিতে হতো না। তাই আমরা মনে করছি, এ হত্যাকাণ্ডে প্রশাসনেরও গাফিলতি আছে।’

মানববন্ধনে বক্তারা আরও বলেন, “রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে চালু হওয়া ‘চিটিং সার্ভিস’ মানুষের পকেট কাটার সঙ্গে গলাও কাটছে। এ পরিবহনগুলো সন্ত্রাসের চেয়েও বড় সন্ত্রাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের এখনই না রুখলে পরিবহন খাতে যে কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হবে তার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে।’

রাজীবের স্মরণে একমাস যাত্রী ও চালকদের সচেতনতায় গণসংযোগ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে স্বজন পরিবহনের রুট পার্মিট বাতিল, রাজীবের পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা ও দ্রুত বিচারের জন্য সরকারকে একমাসের সময় বেঁধে দেন যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক। একমাসের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তার সঙ্গে অন্যান্যের মধ্যে আরও ছিলেন সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম।

এ সময় পরিবহন ব্যবস্থা শৃঙ্খলায় আনাসহ সংগঠনের পক্ষ থেকে ৮ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
১. রাজীব হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ও সব সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করা।
২. যানজট নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও যাত্রীদের যথাযথ সেবা নিশ্চিতে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করা।
৩. সারাদেশে গণপরিবহনে সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করা ও রাজধানীসহ দেশের নগর-মহানগর ও আন্তঃজেলার গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া কার্যকর করা ও দূরপাল্লার পরিবহনে শিক্ষার্থীদের ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় দেওয়া।
৪. নামে-বেনামে চালু হওয়া সিটিং সার্ভিসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও বিআরটিএ’র অনুমতিক্রমে যথাযথ মানের কিছু স্পেশাল পরিবহন চালু রাখা।
৫. গণপরিবহনের ভাড়ায় সমতা আনা ও প্রতিটি গাড়িতে ভাড়ার চার্ট রাখা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা।
৬. পরিবহন নৈরাজ্য বন্ধে বিআরটিএ থেকে নিয়মিত ‘কার্যকর’ অভিযান পরিচালনা করা ও গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তার নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়া।
৭. নারীরা হয়রানির শিকার হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
৮. প্রাইভেট পরিবহনের চাপ কমাতে উন্নতমানের এসি, নন-এসি সার্ভিস ও সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য বীমা চালু করা।
এদিকে রাজীব হত্যার বিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দাবি জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়— বেপরোয়া চালক, বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা, ফিটনেস বিহীন যানবাহন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার মধ্যে আমাদের যাত্রী সাধারণকে সড়কে যাতায়াতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন অসংখ্য তাজা প্রাণ ঝরছে।

দ্রুত এসব বিশৃঙ্খলা দূর করে সড়ক পরিবহন খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একইসঙ্গে নিহত রাজীবের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও দ্রুততম সময়ে সুবিচার নিশ্চিতের দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে মারা যান রাজীব। তার বয়স হয়েছিল ২২ বছর। মঙ্গলবার (১৭ এপ্রিল) দুপুর সোয়া ১টার দিকে রাজীবের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঢামেক চত্বর ছেড়ে যায়। এরপর হাইকোর্ট মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে তাকে পটুয়াখালীর বাউফলের দাশপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

যাত্রাবাড়ীর মিরাজিবাগে একটি মেসবাসায় ভাড়া থেকে তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করতেন রাজীব হোসেন। তার ছোট ভাই মেহেদী হাসান (১৩) ও আব্দুল্লাহ (১১) ঢাকার তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা ও এতিমখানায় পড়ে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ভাইদের খরচও বহন করতেন তিনি।

গত ৩ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দুই বাসের চাপায় রাজীবের শরীর থেকে হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ৪ এপ্রিল বিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি ভর্তি হন ঢামেক হাসপাতালে।

এরপর রাজীবের চিকিৎসার জন্য ডা. শামসুজ্জামান শাহীনকে প্রধান করে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের অন্য সদস্যরা ছিলেন নিউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অসিত চন্দ্র সরকার, মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মজিবুর রহমান, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর হোসেন, অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইদুল ইসলাম, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম ও অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম।

গত ৬ এপ্রিল রাজীবের চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান শাহীন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, রাজীব এখনও আশঙ্কামুক্ত নয়। কারণ তার ‘হেড ইনজুরি’ আছে। মাথার সামনের অংশ আঘাতপ্রাপ্ত। মাথার হাড়ে ফাটল আছে। মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে একই তথ্য। ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস বলেন, ‘রাজীবের মাথার হাড় ভাঙা ছিল। মস্তিষ্কের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই তার মৃত্যু হয়েছে।’
এর আগে ৪ এপ্রিল দুই বাসের চাপায় হাত হারানো রাজিব হাসানের চিকিৎসা ব্যয় বহনের জন্য দ্বিতল বাস মালিক বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহন মালিককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি টাকা প্রদানের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। তার মৃত্যুর পর এ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে এখন পরিবার।

 

 

/এসও/জেএইচ/

লাইভ

টপ