কীভাবে পরীক্ষা দেবেন, এখনও জানেন না রুবিনা

Send
আমিনুল ইসলাম বাবু
প্রকাশিত : ২৩:০৪, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৩, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

হাসপাতালের বেডেই পড়ালেখা করছেন রুবিনাআসছে মে মাসে রয়েছে চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। হাতে সময় মাত্র দুই সপ্তাহের মতো। কিন্তু রেল ইঞ্জিনের নিচে পড়ে দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর রুবিনা আক্তার এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাই হাসপাতালের বেডে শুয়েই পরীক্ষার জন্য পড়ালেখা চালিয়ে গেলেও তিনি এখনও জানেন না, ঠিক কীভাবে ও কোথায় থেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন তিনি। সেই দুশ্চিন্তা নিয়েই এখন দিন কাটছে তার।
গত ২৮ জানুয়ারি কমলাপুর রেল স্টেশনে রেল লাইন ধরে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে আরেক প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার সময় ইঞ্জিনের নিচে পড়েন যান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী রুবিনা আক্তার। এ সময় তার দুই পা-ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে।
রুবিনা বলেন, ‘আগামী মাসেই (মে) আমার ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কবে ছাড়া পাবো, কীভাবে পরীক্ষা দেবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু জানি না আমার কী হবে।’
ঢামেক হাসপাতালে রুবিনার জন্য নির্ধারিত রুমে গিয়ে দেখা গেছে, দুই পা হারানো রুবিনার বেডে, বেডের পাশের টেবিলে রাখা বই-খাতা। মে মাসেই অনার্স চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা। তাই শরীরটা একটু ভালো লাগলেই যতটাসম্ভব পড়ালেখা করছেন পঞ্চগড়ের এই মেয়ে।
সামনে পরীক্ষা, তাই হাসপাতালের বেডেই রুবিনার পড়ালেখা চলছেবই-খাতার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রুবিনা বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল) থেকে ফরম ফিলআপ শুরু হয়েছে। আমারটা এখনও করিনি।’ কেমন আছেন জানতে চাইলে তার উত্তর, ‘সকালে সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। একটু ব্যায়াম করিয়েছে, কীভাবে ব্যায়াম করতে হয় তাও শিখিয়েছে। পরে আবার ঢাকা মেডিক্যালে ফেরত পাঠিয়েছে।’
দুর্ঘটনায় পা হারানোর পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পাশে দাঁড়িয়েছে রুবিনার। এ ছাড়া তার কৃত্রিম পা সংযোজনের জন্য রেল মন্ত্রণালয় থেকেও আর্থিক সহায়তা দিয়ে গেছেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রুবিনার মা রহিমা খাতুন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়েটার ভালো চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। আজ বিশ্ববিদ্যালয় আর সরকার পাশে না দাঁড়ালে তো মেয়ের চিকিৎসাই করাতে পারতাম না। এটুকু সহায়তার জন্য আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’
রুবিনাও কৃতজ্ঞতা জানালেন সবার প্রতি। তিনি বলেন, ‘রেলমন্ত্রীর দেওয়া সহায়তায় কৃত্রিম পা পাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও অনেক সহায়তা করেছে। তাদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই।’
রুবিনা জানালেন, কেবল পড়ালেখার খরচের দায়িত্ব নেওয়াই নয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই তার খোঁজ-খবর নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তার সহপাঠীরা নিয়মিত তাকে দেখতে আসছেন। তাদেরই একজনের দেওয়া হুইল চেয়ারেই এখন চলাফেরা করছেন তিনি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রুবিনাচিকিৎসাটা চলছে, কৃত্রিম পা-ও পাবেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তাতে কমছে না রুবিনা ও তার মায়ের। রুবিনা বলেন, ‘পরীক্ষা নিয়েই দুশ্চিন্তা কমছে না। এই শরীর নিয়ে কীভাবে পরীক্ষা দেবো, সেটা তো এখনও জানি না। কোনামতে পরীক্ষা দিলেও এরপর কী হবে, তা তো ভাবতেই পারছি না। পরীক্ষার পর একটা চাকরি যদি পেতাম, তাহলে খুব ভালো হতো। চাকরির পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতিটাও নিতে পারতাম। আমার পরিবারে তো উপার্জন করার মতো কেউ নেই। একটা সরকারি চাকরি যদি পেতাম, তাহলে হয়তো পরিবার নিয়ে চলতে পারতাম।’
রুবিনার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের অধ্যাপক শামসুজ্জমান শাহীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রুবিনার শারীরিক অবস্থা এখন অনেক ভালো। এখন তার কৃত্রিম পা সংযোজনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। সে জন্যই তাকে ব্যায়াম করানো হচ্ছে। আশা করছি, সফলভাবেই তার কৃত্রিম পা সংযোজন করা সম্ভব হবে।’
রুবিনা আক্তার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শান্তিনগর গ্রামে। বাবা রবিউল ইসলাম মারা গেছেন। ঢাকার সদরঘাট এলাকায় একটি মেসে থেকে তিনি পড়ালেখা করছেন। গত ২৮ জানুয়ারি ট্রেনযোগে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য তিনি কমলাপুরে গিয়েছিলেন। সেখানেই প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করার সময় রেল ইঞ্জিনের নিচে পড়ে দুই পা হারান তিনি।
আরও  পড়ুন-
রাজীবের ঘাতক বাসচালকদের ফাঁসির দাবি
প্রাথমিকের সমমর্যাদা রেখেই স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি নীতিমালা অনুমোদন

/ইউআই/টিআর/

লাইভ

টপ