‘কোনও ছাত্র বা ছাত্র সংগঠন পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিতে পারে না’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২১:৩৭, জুলাই ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৭, জুলাই ১২, ২০১৮

 

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি

একক কোনও ছাত্র অথবা কোনও ছাত্র সংগঠন কারও ওপর হামলা করতে পারে না, পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকায় তাদের অবস্থান হতে পারে না। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর যেসব ছাত্রলীগ নেতা হামলা করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হোক। এছাড়া যেহেতু ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এ হামলা করেনি, ফলে ছাত্রলীগেরও উচিত হবে ছাত্রলীগ নেতা মামুনসহ হামলাকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া। এছাড়া পুলিশ প্রশাসনেরও উচিত হামলাকারীদের শাস্তির আওতায় আনা।



দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘আবারও কোটা’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে আলোচকরা এসব কথা বলেন।
বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৪টায় পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা যায় বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি অনুষ্ঠান।
এম এ মোমেনমুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নেন সাবেক যুগ্ম সচিব ড. এম এ মোমেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান,বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সহযোগী অধ্যাপক আরিফা রহমান রুমা এবং বাংলা ট্রিবিউনের চিফ নিউজ এডিটর দুলাল আহমেদ চৌধুরী।
ড. এম এ মোমেন বলেন, ‘আজকের আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন। এর মানে তারা আন্দোলন করছেন আমলা হওয়ার জন্য। কোটা সংস্কারের কাজ করবেন কারা? আমলারা। প্রধানমন্ত্রী যা নির্দেশনা দেবেন তা বাস্তবায়ণ করবেন কারা? এই আমলারাই।’
তিনি বলেন,‘আমলাতন্ত্রের বড় জায়গা হলো বড় জায়গায় নিজেকে নেওয়া। আমাদের সন্তানদের খুশি করবো, নিজে ভালো থাকবো। সরকারপ্রধান কে আছেন অথবা বিরোধী কে আছেন— এটা নিয়ে তাদের কোনও কনসার্ন নেই। তারা শুধু দেখেন নিজে ভালো আছেন কিনা।’
ড. এম এ মোমেন বলেন, ‘একসময় একটি বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। তখন কি আন্দোলন হয়েছিল? তা কিন্তু হয়নি। এখন অন্দোলন যখন হলো, আমলাদের উচিত ছিল এটা নিয়ে তাদের এগিয়ে আসা। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সঠিকভাবে সমস্যার সমাধান করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা হয়নি। আন্দোলনের শুরুতেই যদি আমলারা এগুলো নিয়ে কাজ করতেন তাহলে কিন্তু আজ ছাত্রদের এই অবস্থা হতো না, এত সংকট তৈরি হতো না।’
রুশাদ ফরিদীঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী বলেন, ‘কোটা সংস্কারের দাবির পরে এখন যেটি মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটি হলো ছাত্রদের ওপর হামলা। আমাদের প্রতিদিন দেখতে হয়েছে ছাত্রদের মেরে হাড্ডি গুঁড়ো করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের বর্বরতা আগে কখনও হয়নি। এ নিয়ে শান্তিকামী মানুষ উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠায়। কীভাবে একজন ছাত্র অন্য ছাত্রকে হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে পারে? এই পরিস্থিতিতে ছাত্রদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। শিক্ষকদের অবস্থাও কোণঠাসা।’
তিনি বলেন,‘কতটা ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে: তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মারের ভয়ে ছেলেরা বলতে বাধ্য হচ্ছে তাদের কিছু হয়নি, তাদের কেউ কিছু বলেনি। যা সবার সামনে ঘটছে সেটাও স্বীকার করতে পারছে না। এ কোন সংস্কৃতির মধ্যে পড়েছি, কোন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়েছি আমরা; তা কল্পনাও করা কঠিন!’

রুশাদ ফরিদী বলেন, “ভিসির বাড়িতে কারা হামলা করলো, তাদের প্রমাণসহ খুঁজে বের করুন। কোনও সমস্যা নয়। যারা হামলা করেছে তাদের শাস্তি দেন। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। এটা নিয়ে লুকোচুরি হচ্ছে। আবার যেসব ছাত্রকে পেটানো হচ্ছে, যারা তাদের মারলো, যারা বলছে, ‘আমি মেরেছি তো কি হয়েছে?’ তাদের গ্রেফতার না করে যারা মার খেলো তারা কেন গ্রেফতার?”
রাশেদা রওনক খানঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘কোটা সংস্কার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিকভাবে খেলা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, গ্লোবালাইজেশনের জন্য হোক, ক্যাপিটালিজমের জন্য হোক অথবা আদর্শচ্যুতির কারণে হোক, সবকিছুর মধ্যে রাজনীতি তার আদর্শ থেকে সরে গেছে। সরে গিয়ে এখন সে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে হাতুড়ির মধ্য দিয়ে।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখান থেকে উত্তরণের জন্য কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। যেমন, শিক্ষাবিদ বলেন অথবা আদর্শ ভাবা হয় যাদের, তাদের সামনে আসা উচিত। কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়েছে। দেশে কোনও এক ধরনের ফিগার সামনে দাঁড়াতে পারে না; সেটা মিডিয়ার কারণে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনীতি ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে এমনটি ঘটছে, যাতে বিরাজনৈতিকতা একটি মূল কারণ।
রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘সর্বজনীনভাবে শিক্ষককের যে জায়গাটি অতীতে দেখে এসেছি এখন আর সে পরিস্থিতি নেই। কোনও একটি কারণে সেই শিক্ষকরা এখন আর প্লেস পান না। কারণ, ৩০ জুন ছাত্রদের ওপর হামলায় শিক্ষক কিন্তু এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু হামলাকারীরা ওই শিক্ষককেও মানতে চাননি। তার হাতেও আঘাত লেগেছে।’
আরিফা রহমান রুমাতিনি বলেন, ‘আন্দোলন দমনে একটি মহল পুলিশের ভূমিকায় চলে গেছে। দেশের একটি প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে, প্রোক্টরিয়াল বডি আছে। কিন্তু একটি মহল পুলিশের ভূমিকায় চলে গেলো। নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। ছাত্রীদের হলে যা ঘটেছে তা আতঙ্কের বিষয়, যা ন্যক্কারজনক বলেই মনে করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু দূতাবাস উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এটা নিয়ে আমি নিজেই উদ্বেগ প্রকাশ করি। কারণ, তারা তো অন্য সময় কথা বলে না। তাহলে এখন কেন?’

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়(বাউবি) শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সহযোগী অধ্যাপক আরিফা রহমান রুমা বলেন, আরিফা রহমান রুমা বলেন, ‘আমার বাসায় যিনি রান্না করেন তার বাচ্চা এবং আমার বাচ্চা— তাদের বেড়ে ওঠা কিন্তু এক নয়, পরিবেশগত কারণেই। এখানে অবহেলা? তা কিন্তু নয়। এ ছাড়া, একই ঘরে দুই সন্তান, নারী ও পুরুষ— একভাবে বেড়ে ওঠে না। এ সমস্যা কিন্তু আছেই।’
তিনি বলেন, ‘আমি সমালোচনা করছি তরিকুলসহ অন্যদের ওপর হামলা করা, হাতুড়িপেটা করার। কিন্তু এর দায় ছাত্রলীগ কেন নেবে? সাংগঠিকভাবে কেন এর দায় ছাত্রলীগ নেবে? বরং ছাত্রলীগের উচিত সাংগঠনিকভাবে ওই হাতুড়ি হাতে ধরা ছাত্রকে খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ এদের উৎসাহ দেওয়া যাবে না।’
দেলোয়ার হোসেনতিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু আজ যা ঘটছে, তাতে বলা হচ্ছে এমন ঘটনা ইতিহাসে আর ঘটেনি! কিন্তু আসলে কি তা-ই? মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন— এগুলো কি এর কাছে কিছুই না?’

আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পরও কোটা আন্দোলনকারীরা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চেয়েছে। সেটার চেয়েও গুরুত্বপর্ণ বিষয় হলো কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছাত্রদের ওপর হামলা হয়েছে দুই গ্রুপের ছাত্রদের মধ্যে। এখানে ছাত্রলীগের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। কিন্তু হামলা হয়েছে দুই গ্রুপের মধ্যে, একটি গ্রুপ কোটা চায় না, এক গ্রুপ চায়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র, অতীতে যারা সেখানে পড়াশোনা করেছি, তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে চাই। আমরা জানি, এটি এমন একটি জায়গা যেখানে সমাজ পরিবর্তন, রাজনৈতিকসহ নানা সময় নানা আন্দোলন ঘটেছে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য। যারা এখানে পড়াশোনা করেন না তারাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ থেকে শেখেন। সবাই সেখানে গিয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন। অনেক শিক্ষক-ছাত্র এখানে প্রাণ দিয়েছেন।’
দুলাল আহমেদ চৌধুরীতিনি বলেন, ‘কোটা আনা হয়েছে পিছিয়ে পড়া মানুষদের এগিয়ে আনার জন্য। নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী এবং মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু কোটা আন্দোলনকারীদের মূল আপত্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে। কিন্তু একসময় মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তারা কিন্তু কোটার জন্য যুদ্ধে যাননি।’
বাংলা ট্রিবিউনের চিফ নিউজ এডিটর দুলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘ভিসির বাসভবনে হামলা ও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনার এখনই লাগাম টেনে ধরতে হবে। ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে, সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন কি হাতুড়িপেটা করে? আমরা জানি, এই অন্দোলন একদিনের নয়। এটা বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই হচ্ছে। এবার বেশ বড় আকার ধারণ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই আন্দোলনের (কোটা সংস্কার) শিক্ষার্থীদের ওপর যেমন হামলা করা হচ্ছে তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসায় হামলাও হয়েছে। ভিসির বাসায় হামলা কারা করেছে? কোটা আন্দোলনের নেতারা করেছে? এটা কারও বিশ্বাস হবে? আবার বিশ্বাস না হয়েও পারা যায় না। আন্দোলনের একসময় মনে হয়েছিল যখন জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ সরকারের কয়েকজন এ বিষয় নিয়ে কথা বললেন, মনে হয়েছিল, তারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন।’
মুন্নী সাহাতিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘তাদের সঙ্গে দেশের শিক্ষাবিদরা, বিশ্লেষকরা সবসময় নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন। দেশে কি এসময় সুশীল সমাজের কোনও প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ছিলেন না? তারা কি দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে পারতেন না? কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি।’
আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘ছাত্রদের ওপর হামলা শুরু হলো। আজ একজন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, কোটা আন্দোলনের নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। ভিসির বাড়িতে যারা হামলা করছে তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে ঘোষণা দিলেন ক্যম্পাসে বহিরাগত নিষেধ। এটাতে বহিরাগত নিষিদ্ধ কেন হবে? এটা তো বহিরাগতদেরই জায়গা। সব সময় বহিরাগতরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকের মাঝে দিয়ে যাতায়াত করে।’

/আরএআর/এইচআই/

লাইভ

টপ