নিটোরের জরুরি বিভাগে রোগীদের ভোগান্তি

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ২১:৪৯, জুলাই ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৫, জুলাই ১৩, ২০১৮





জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)রাজধানীর শ্যামলীতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এখানে মুমূর্ষু রোগীকে ট্রলিতে তোলা থেকে শুরু করে তার প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট— প্রতি ক্ষেত্রেই কোনও না কোনও সমস্যায় পড়তে হয়। এ অবস্থার জন্য কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা।
হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে গত ১০ জুন গিয়ে দেখা যায়, নতুন ভবনের কাজ চলায় পুরনো ভবনের জরুরি বিভাগে যেতে রোগীদের ভাঙাচুড়া রাস্তা পেরিয়ে যেতে হচ্ছে। নির্মাণকাজের জন্য পানি জমে রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। এরই মধ্যে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স এবং সিএনজিতে চড়ে মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে আসছেন স্বজনরা।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটের কাছে এসেই ‘ট্রলি বিড়ম্বনায়’ পড়েন রোগীরা। অন্য সরকারি হাসপাতালগুলোর মতো এখানেও টাকা ছাড়া ট্রলির চাকা ঘোরে না। গেট থেকে ১০ কদম সামনের জরুরি বিভাগে রোগীকে নিয়ে যেতেই ট্রলিম্যান ও ট্রলিউইম্যানরা সর্বনিম্ন ১০০ টাকা গুণে নেন। সময় ভেদে এবং রোগীর আর্থিক অবস্থা ভেদে এই অর্থের পরিমাণ যায় আরও বেড়ে। অবস্থা খুব খারাপ হলেও টিকিট না কাটা পর্যন্ত রোগী দেখা শুরু হয় না।
রাজধানীর নাখালপাড়া থেকে আসা মানষী সাহা (৩৫) এসেছেন স্বামী পায়ের আঘাতের চিকিৎসা করাতে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানকার চিকিৎসা কেমন কী বলবো! টানা দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। রোগীকে ভর্তি করাচ্ছে না। কখন ভর্তি করবে, কখন চিকিৎসা দেবে, বুঝতে পারছি না।’
মোটর সাইকেল চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন সুমন মিয়া (৪০)। তার হাত কেটে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার হাত কেটে গেছে। এরা ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। এখনও রক্ত বন্ধ হয়নি। হাত উঁচু করে ধরে থাকতে বলেছে। তাই ধরে আছি। দেখি কী হয়!’
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সুমন পাঠান (২২) খেলতে গিয়ে পায়ে আঘাত পাওয়া বন্ধুকে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার ওয়ার্ড বয়, আয়ারা খুবই অমানবিক। প্রত্যেকটা কাজে টাকা দিতে হয়। টাকা ছাড়া এরা একটা কাজও করে না।’ এটা কি একটা সরকারি হাসপাতাল, প্রশ্ন করেন সুমন।
তিনি বলেন, ‘রোগী যখন গাড়ি থেকে নামাচ্ছি তখন একজন বললো যে, এখানে চিকিৎসক নাই, পাশের হাসপাতালে গেলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা পাবেন। এরপর ভেতরে টিকিট কাটতে গেলাম তখন আর একজনও এই একই কথা বললো। এখানে চিকিৎসা নেওয়া খুব কষ্টকর।’
মুনসুর সেলিম (৪৮) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি তার এক স্বজনকে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসা করাতে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই হাসপাতালে বেশি কাটাছেঁড়ার রোগী আসে। কিন্তু এখানে কোনও সিস্টেম নাই। জরুরি বিভাগের অবজারভেশন রুমের অবস্থা খুবই খারাপ। যে কেউ এখানে যখন-তখন ভেতরে ঢুকছে। চিৎকার করছে। জোরে জোরে কথা বলছে। নার্সেরা কাউকে কিছু নিষেধও করে না।’
নিটোরের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে চিকিৎসা নিতে আসা অজ্ঞাত রোগী নিয়ে তারা বেশি বিপদে পড়েন। কারণ, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের বেশির ভাগেরই সঙ্গে স্বজন থাকে না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে জ্ঞান না ফিরলে রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করা যায় না। এক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবক হাসপাতালে থাকলে এই রোগীদের জন্য ভালো হতো বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা।
এছাড়া এখানে যত বেশি রক্তের দরকার তার তুলনায় ব্লাড ব্যাংকে রক্তের পরিমাণ খুবই অপ্রতুল। তাই রক্ত নিয়ে রোগীদের অনেক বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। রোগীর আত্মীয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় রোগীরা ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকেন।
রোগী ও রোগীর স্বজনরা বলছেন, এই হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে তৃতীয়-চতুর্থ কর্মচারীদের কোনও জবাবদিহিতা নেই। এর কারণে তারা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। এ জন্যই ভুগতে হচ্ছে তাদের।
নিটোরের জরুরি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স বজলু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিটোর একমাত্র হাতপাতাল যেখানে কোনও রোগী আমরা কখনও ফেরত পাঠাই না। আমরা অবশ্যই রোগীকে সেবা দিই। যেটা আপনি অন্য অনেকখানে পাবেন না।’
নিটোরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ২৪ ঘণ্টা ইমারজেন্সি খোলা থাকে। আমরা সবসময় রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের চিকিৎসক-নার্সরা সার্বক্ষণিক রোগীদের সেবা দিচ্ছে।’
রোগীদের অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলার জন্য নিটোরের পরিচালক ডা. মো. গনি মোল্লার অফিসে দুদিন গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।

/এইচআই/

লাইভ

টপ