মধ্যবয়সী নারীর হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ১০:০৪, আগস্ট ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৮, আগস্ট ০৮, ২০১৮

হৃদরোগদেশে মধ্যবয়সী নারীদের হৃদরোগে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের নারীরাও। কর্মক্ষেত্রে চাপ, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক চাপ এর অন্যতম কারণ। জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও পরিবর্তিত সময়ে তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় এই মৃত্যুহার বাড়ছে বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, এ বয়সী পুরুষরা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সাধারণত প্রথমবার রক্ষা পেলেও নারীদের ক্ষেত্রে খুব কমজনেরই সে সৌভাগ্য হয়।

উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা যাক। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা নাহিদ শরিফী নীলার (৩৯) ছোট্ট মেয়ে মাহিনার গায়ে ছিল জ্বর। মা সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। এরপর সন্তানের চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে আসেন। কিছুক্ষণ পর মায়ের খারাপ লাগা শুরু হয়। পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। ততক্ষণে তিনি এ পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। চিকিৎসক বলেন, তার হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে। শোকে স্তব্ধ হওয়ার এই সংবাদ যখন আসে তখন নীলার বড় মেয়ে মালিহার বয়স ৮ বছর এবং ছোট মেয়েটির বয়স ছিল মোটে চার বছর।
সৈয়দা তাসনিম আলম মৌটুসী (৩৫)। রাজশাহীতে নিজের বাড়িতে রাত দশটার দিকে অস্বস্তিবোধ করছিলেন দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই সব শেষ। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, হৃদরোগে মৌটুসীর মৃত্যু হয়েছে। পেশায় শিক্ষিকা ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক মৌটুসীর দ্বিতীয় সন্তানটির বয়স তখন মাত্র চার মাস।
অন্যদিকে, অভিনেত্রী ও সাংবাদিক তাজিন আহমেদ (৪২) ঢাকায় নিজ বাসায় অজ্ঞান হয়ে পড়লে বাসার লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নেওয়ার পর তার জ্ঞান আর ফিরেনি। হাসপাতালেই তার মৃত্যু হয়। অকাল প্রয়াত এই অভিনেত্রীর মৃত্যু হৃদরোগে হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক।
এমন ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে দেশের প্রতিটি শহরে, প্রতিটি এলাকায়। মধ্যবয়সী নারীর মৃত্যুর অনেক কারণের মধ্যে হৃদরোগ এখন অনেক বেশি আলোচিত, যা আগে তেমনভাবে চিন্তার কারণ ছিল না।
বাংলাদেশে নারীদের হৃদরোগে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তেমন কোনও গবেষণা নেই। নেই কোনও পরিসংখ্যান। তবে, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA)’র তথ্যানুযায়ী, হৃদরোগ ও স্ট্রোকে সারা বিশ্বে বছরে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন নারী মৃত্যুবরণ করে। প্রতি ৮০ সেকেন্ডে একজন নারী মারা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪ মিলিয়ন নারী হৃদরোগে আক্রান্ত। আর দেশটির ৯০ ভাগ নারীর হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা অনুযায়ী, পুরুষের তুলনায় খুব কম সংখ্যক নারী প্রথমবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর রক্ষা পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ধরন পুরুষের চেয়ে ভিন্ন থাকে। তাছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা নারীর হৃদরোগকে অন্য কোনও রোগ ভেবে চিহ্নিত করতে ভুল করে।

প্রতিষ্ঠানটি হৃদরোগের আতঙ্ক থেকে মুক্তির জন্য বেশ কিছু উপায়ও বাতলে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে ৮০ ভাগ হৃদরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন আর হৃদরোগের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট বয়স নেই। এখন যেকোনও বয়সে যে কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারে। আগে বলা হতো, মাসিক বন্ধ হওয়ার আগে নারীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ কম থাকতো। এখন মেনোপজের আগে ও পরে একই ধরনের চিত্র দাঁড়িয়ে গেছে। আগে বলা হতো পুরুষদের নারীদের চেয়ে বেশি হার্ট অ্যাটাক হয়। এখন বলা হচ্ছে, আমরা নারী-পুরুষ আর আলাদা করতে পারছি না। এর মূল কারণটা বলা হচ্ছে, মানসিক চাপ। কর্মক্ষেত্রে চাপ, সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক চাপ। এর সবগুলোই ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস বদলে গেছে। যেমন আগে বড় মাঠ ছিল, আমরা খেলতে পারতাম। গ্রামের নারীরা সাঁতার কাটতে পারত। আগে নারীরা মাঠে কাজ করতো। নারীরাও মাঠে খেলতো। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি নারীরা মাঠে খেলতে পারতেন। পুকুরে এমনকি নদীতে সাঁতার দিতে পারতেন। এখন তো পুরুষদেরই সাঁতরানোর জায়গা নেই। এখন সবখানে দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে। ঘন বসতি হচ্ছে। গ্রাম বলতে, ফাঁকা বলতে আর কোনও জায়গা নেই।
দ্রুত নগরায়ণ হৃদরোগের প্রধান কারণ হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাতের বেলা আমরা ঘুমাই না। টকশো দেখি। বসে বসে টিভি দেখি। আগে যখন টিভি ছিল না আমরা হাঁটাহাঁটি করতাম। এ বাড়ি ও বাড়ি গিয়ে গল্প করতাম। এতে শরীর থেকে ক্যালরি নষ্ট হতো। এখন ক্যালরি নষ্ট হয় না। বসে বসে টিভি দেখি, মেদ-ভুঁড়ি বাড়ে। মেদ-ভুঁড়ি বাড়া, ওজন বাড়া হৃদরোগের বড় কারণ। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারও হৃদরোগ বাড়াচ্ছে। সোশ্যালাইজেশন চেঞ্জ আমাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ। খাদ্যাভাস পরিবর্তনও বড় কারণ। আগে তিন চারদিন ধরে বাড়িতে পিঠা হতো। কিন্তু, এখন আমরা ফাস্টফুড খাচ্ছি। এতে অনেক ক্ষতিকারক পদার্থ থাকছে। এখন অনেক কারণে হৃদরোগ হয়। যেমন কতগুলো কারণ আছে যেগুলো আমি পরিবর্তন করতে পারবো না, যেমন- বয়স হওয়া, লিঙ্গ, আবহাওয়া এগুলো পরিবর্তন করতে পারবো না। এগুলো অপরিবর্তনীয় ঝুঁকি। পরিবর্তনীয় কিছু ঝুঁকি, যেমন - যদি কায়িক পরিশ্রম করি, ৪৫ মিনিট হাঁটি, জাঙ্ক ফুড না খাই, ভাত কম খাই, তাহলে হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে পারবো।
তিনি বলেন, ইনফেকশনের সঙ্গে হৃদরোগের মারাত্মক সম্পর্ক আছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে হার্ট অ্যাটাকও কমে যাবে। পরিবেশ, ড্রাগ গ্রহণ (ইয়াবা, কোকেন) হার্টের গতি বাড়িয়ে দেয়। মধ্যবয়সী নারীদের হাইপারটপিক কার্ডিওমায়োপেথি ঘটে। এতে হঠাৎ করে হৃদপিন্ডের ছন্দহীনতা হতে পারে। এতে করে তার মৃত্যু হতে পারে। তরুণদের মধ্যে এই রোগ বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে বুক ধড়ফড় করে। এটা জেনেটিক কারণে হয়। কতগুলো বিশেষ জিন যাদের থাকে তারা এই বিপদে থাকে। হাইপারটপিক কার্ডিওমায়োপেথি আমাদের দেশে আগে থেকেই ছিল। বাংলাদেশিদের মধ্যে এই কারণ অনেক বেশি। প্রেগন্যান্সির কারণে হৃদরোগে পেরিপার্ডিয়াম কার্ডিওমায়োপ্যাথি ঝুঁকি তৈরি হয়। ডেলিভারি হয়ে যাওয়ার ২৬ সপ্তাহের মধ্যে কারও যদি বুক ধড়ফড় করে তাহলে সে এই ধরনের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়। এই ২৬ সপ্তাহের মধ্যে যে কোনও নারী আক্রান্ত হতে পারে। এজন্য আমরা বলি, ২৬ সপ্তাহ পর্যন্ত কার্ডিওলজিস্টের কাছে ধরনা দিতে হবে। এজন্য আমরা বলি, ন্যূনতম কার্ডিয়াক সিনড্রম যদি (বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, অকারণে ক্লান্তি এবং শ্বাসকষ্ট) কোনও রোগীর থাকে তাহলে অবশ্যই কার্ডিওলজিস্টের কাছে পাঠাতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ কমে গেলে নারীরা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। এটার কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা পরিবর্তিত সময়ে আছি। এটা আমাদের মেনে নিতেই হবে।
অসংক্রামক রোগের মধ্যে হৃদরোগ অন্যতম উল্লেখ করে হেলথ রাইট মুভমেন্ট ন্যাশনাল কমিটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. রশীদ -ই-মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অসংক্রামক রোগগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই নির্ণয় করাটা জরুরি। মূলকথা হলো, সমাজের মানুষ যদি না বোঝে যে এটা তার জন্য ক্ষতিকর, তাহলে কিছুই হবে না।

/টিওয়াই/টিএন/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ