যেভাবে দুর্ধর্ষ জঙ্গি হয়ে ওঠে ‘বোমা মিজান’

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২১:২৭, আগস্ট ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৫, আগস্ট ১০, ২০১৮

বোমা মিজান

বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাগ করে জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছিল জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিজান। এটা ২০০০ সালের ঘটনা। ঢাকায় প্রথমে গার্মেন্টে চাকরি শুরু করে সে। তখন সে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তালতলায় একটি মেসে থাকতো। সেখানেই সুমন নামের একজনের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। সেই সুমনের হাত ধরেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে জাহিদুল ইসলাম ওরফে মিজান।

২০০১ সালে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরু থেকেই এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল মিজান। প্রথমে সে সংগঠনের গায়েরী এহসার হিসেবে যোগদান করে। ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠে বোমা তৈরির কারিগর হিসেবে। একপর্যায়ে সংগঠনেই তার নাম হয়ে যায় ‘বোমা মিজান’।
২০০৯ সালের ১৫ মে ঢাকার মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। কিন্তু ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে দুই সহযোগীসহ তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জঙ্গিরা। এরপর থেকে ভারতে আত্মগোপনে থেকে জামাআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া- (জেএমআই)- এর আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল সে।
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘বোমা মিজান শীর্ষ পর্যায়ের জঙ্গি নেতা। বোমা তৈরিতে সে যেমন দক্ষ, তেমনি ক্যারিশমেটিক লিডার হিসেবে দাওয়াতি কাজেও দক্ষ। প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার পর থেকেই সে ভারতে আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।’
মহিবুল ইসলাম বলেন, ‘বোমা মিজান ভারতে থাকলেও দেশে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এজন্য আমরা তাকে ভারতে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবো। তার সঙ্গে বাংলাদেশের কাদের যোগাযোগ ছিল, তা জানার চেষ্টা করা হবে।’
প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আত্মগোপনে থাকার পর থেকেই এই জাহিদুল ইসলাম মিজান ওরফে বোমা মিজানকে গ্রেফতারের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাংলাদেশ এবং ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে একটি বিস্ফোরণের সঙ্গে বোমা মিজানের সম্পৃক্ততা পায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ। কাওসার ছদ্মনামে ভারতে অবস্থান করা বোমা মিজানকে ধরতে তারা পুরস্কারও ঘোষণা করে। বাংলাদেশেও প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাবার পর তাকে গ্রেফতারের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। অবশেষে গত ৬ আগস্ট ভারতের বেঙ্গালুরে থেকে শীর্ষ এই জঙ্গি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ২০০৯ সালে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর বোমা মিজান তার জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া এবং বিভিন্ন হামলায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করে ১৬১ ধারায় একটি জবানবন্দি দিয়েছিল। পুরনো সেই নথিপত্র ঘেঁটে বোমা মিজানের জেএমবিতে যোগদান, জেএমবির আত্মপ্রকাশ, শীর্ষ জঙ্গি হয়ে ওঠা এবং জেএমবির হয়ে বিভিন্ন হামলা এবং ডাকাতিতে অংশ নেওয়ার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেছে।

প্রায় ৯ বছর আগের সেই নথির তথ্য বলছে— ১৯৭৯ সালে জামালপুরের মাদারগঞ্জের ধলীবন্ধ গ্রামে জন্ম নেওয়া মিজান জঙ্গি সংগঠনে যোগদানের পর সুমন, হারুন ও কামরুল নামেও পরিচিত ছিল সংগঠনে। ১৯৮৪ সাল থেকে গ্রামের বাড়ি ধলীবন্ধ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১৯৮৫ সালে জামালপুর সদরের ভোটঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামালপুর সদরের সিংহজানী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও সবশেষে জামালপুর ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পড়াশুনা করে সে। ১৯৯৬ সালে ক্রিকেট খেলা নিয়ে মারামারিকে কেন্দ্র করে ১৯ দিন জেল খাটতে হয় তাকে। এরপর পড়াশুনা বাদ দিয়ে বাবার ব্যবসায় যোগ দেয়। ১৯৯৯ সালের ২৯ মে বাবা মারা যাওয়ার পর ব্যবসার হিসাব নিয়ে বড় ভাই রফিকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হয়। এরপর ২০০০ সালে রাগ করে ঢাকায় চলে আসে মিজান।

যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়ায় মিজান
বোমা মিজানের দেওয়া জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঢাকায় এসে খিলগাঁওয়ের চৌধুরীপাড়ার অ্যাথলেটিকস গার্মেন্টে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করে মিজান। পাশের তালতলা এলাকায় একটি মেসে থাকতো সে। সেখানে থাকা অবস্থাতেই সুমন নামে এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় হলে সে-ই তাকে জঙ্গিবাদের পথে নিয়ে যায়।

নিজের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে বোমা মিজান বলেছে, ‘আমি প্রতিদিন মেসের পাশে গাছতলায় কিছু সময় বসে থাকতাম। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা কর্তৃক বিমান হামলা হয়। এ প্রসঙ্গ তুলে সে (সুমন) আমাকে কোরআন হাদিস থেকে উদ্বৃতি দিয়ে জিহাদ সম্পর্কে বুঝায়। ফিলিস্তিন, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে নির্যাতিত মুসলমানরা ইসলাম কায়েমের লক্ষ্যে জিহাদ করছে বলে জানায়। প্রত্যেক মুসলমানেরই জিহাদ করা ফরজ এবং জিহাদের মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলমানের শাহাদাতের তৃপ্তি লাভ করা সম্ভব। সুমনের এ কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমি জিহাদের প্রতি আকৃষ্ট হই। তখন সুমন জানায়, সে একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। আমি তার সংগঠনে যোগদান করি।’
জেএমবিমিজানের দেওয়া ভাষ্য মতে, ‘২০০১ সালে জেএমবির আনুষ্ঠানিক নাম প্রকাশের আগে জামালপুরের নয়াপাড়ায় শায়খ আব্দুর রহমানের বাসায় তার উপস্থিতিতে সাংগঠনিক মিটিং হয়। মিজান তখন সংগঠনের গায়েরী এহসার। ওই মিটিংয়ে সে ছাড়াও সালাউদ্দিন, আব্দুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, তারেক, সালমান, ওসমানসহ ১৫-১৬ জন উপস্থিত ছিল। মিটিংয়ে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধাচরণ করে বুশের বিরুদ্ধে শ্লোগান ও মিছিল করার সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তীতে জামালপুর শহরে মিছিল ও সভা হয়। তখন সংগঠনের নাম ছিল মিতালী দল। পরে শুরা কমিটিকে নিয়ে ঢাকায় মিটিং করে সংগঠনের নাম দেওয়া হয় জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ- জেএমবি।’
মিজান বলেছে, ‘সুমন আমাকে নিয়মিত নামাজ পড়া, দাঁড়ি রাখা, ট্রেনিং নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দেয়। আমি নামাজ পড়া শুরু করি এবং দাঁড়ি রাখি। সুমনের নির্দেশে সংগঠনের দাওয়াতি কাজ করি। আমার দাওয়াতে প্রথম আমার বাল্যবন্ধু আমির জেএমবিতে যোগ দেয়।’

অস্ত্র ও বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ
মিজানের ভাষ্য মতে, ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে জামালপুর জেলার দায়িত্বশীল তারেকের নির্দেশে চরশী মাদ্রাসায় একটি ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে ২০-২৫ জন ট্রেনিং নেয়। কিন্তু কেউ কারও নাম জানতো না। প্রত্যেকের একটি কোড নাম দেওয়া হয়েছিল। প্রশিক্ষক হিসেবে ছিল সালাউদ্দিন, তারেক, মনির, সালমান, শাদ, মোল্লা ওমর। তিন দিনের প্রশিক্ষণ হয় সেখানে।’ মিজান বলেছে, ‘সেখানে প্রত্যেকেরর নাম্বার কোড থাকতো এবং নাম্বার কোড দিয়ে ডাকা হতো। আমার কোড নাম্বার ছিল ৫৫০। প্রতিদিন রাত একটায় ঘুম থেকে উঠে মাদ্রাসা মাঠে পিটি, প্যারেড, ব্যায়াম, লাঠি দিয়ে আত্মরক্ষা, কারাতে প্রশিক্ষণ হতো। ফজরের নামাজ পর্যন্ত চলতো এই প্রশিক্ষণ। তিন দিনের ট্রেনিং শেষে সবাইকে বায়াত বা শপথ করানো হয়।’
তথ্য বলছে, ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে সংগঠনের নির্দেশে ঢাকায় আসে মিজান ও মোয়াজ। ঢাকায় হাফেজ মাহমুদ তাদের কমলাপুর থেকে রিসিভ করে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে সোলায়মানের কাছে পাঠায়। সেখানে তারা দুজন দিনের বেলায় রিকশা চালাতো, আর জেএমবির একটি আস্তানায় থাকতো। ২১ দিন সেখানে থাকার পর সোলায়মান আবারও তাদের ঢাকায় হাফেজ মাহমুদের কাছে পাঠায়। ঢাকার মুগদা এলাকার একটি মেসে ওঠে সে। হাফেজ মাহমুদের নির্দেশে ‘নিকেল’ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য পুরনো ঢাকার পাটুয়াটুলীতে একটি নিকেলের কারখানায় দুই মাস কাজ করে সে। মিজান সেসময় জানিয়েছে, ‘নিকেলের ওপর কাজ শেখার উদ্দেশ্য হলো— নিকেলের প্রলেপ দিয়ে দেশীয়ভাবে তৈরি পিস্তল, রিভলভারের মরিচা প্রতিরোধ করা। সেসময়ে সংগঠনের পক্ষে ক্ষুদ্র অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছিল।’
বোমা মিজান সম্পর্কে প্রাপ্ত নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জেএমবিতে বোমা তৈরির প্রধান কারিগর ছিল শাকিল আহমেদ ওরফে মোল্লা ওমর। মূলত মোল্লা ওমরের কাছেই মিজান বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়। ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ কুমিল্লার কালিয়াজুড়ি এলাকায় র‌্যাবের এক অভিযানে স্ত্রী, দুই সন্তানসহ নিহত হয় মোল্লা ওমর। মিজানের ভাষ্য— শুরুর দিকে ডাকাতির সময় সঙ্গে হ্যান্ড গ্রেনেড নেওয়া হতো। গ্রেনেডগুলো সংগঠনের জন্য তৈরি করতো মোল্লা ওমর ও মারুফ। ধীরে ধীরে নিজেও বোমা তৈরিতে দক্ষ হয়ে ওঠে মিজান। বিশেষ করে হ্যান্ড গ্রেনেড ও টাইম বোমা তৈরিতে দক্ষ ছিল সে। এক পর্যায়ে বোমা তৈরির জন্য সংগঠনে তার নামই হয়ে যায় বোমা মিজান। গ্রেফতারের পর র‌্যাবের কাছে দেওয়া ভাষ্যে মিজান বলেছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির জন্য এবং সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, কক্সবাজারে যাত্রাপালা, সিনেমা হল এবং আদালতে হামলার জন্য সে নিজেই বোমা বানিয়েছে।

যেসব অপারেশনে অংশ নিয়েছিল মিজান
নথিপত্র বলছে, শায়খ আব্দুর রহমানের উপস্থিতিতে ২০০২ সালের মার্চ মাসে দিনাজপুরের চাউলিয়া পট্টিতে জেএমবির অ্যাকশন টিম গঠন করা হয়। ১৪ জনের সমন্বয়ে গঠিত ওই এহসাবা টিমের সদস্য ছিল মিজান। এই টিমের দায়িত্বশীল বা প্রধান ছিল ছিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। তারা সেসময়েই দিনাজপুরের পার্বতীপুরে গ্রেফতার হওয়া আট সহযোগী জঙ্গিকে ঢাকায় নেওয়ার পথে একটি বেইলি ব্রিজ পয়েন্টে বোমা মেরে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এছাড়া, সেসময় তারা এনজিও’র ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের মালামাল লুট করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
মিজান বলেছে, ‘এই ঘটনার পর বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে আমি, ভাগ্নে শহীদ, ওসমান, গালিবসহ ১০-১২ জন জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি এলাকায় একটি ব্র্যাক অফিসে ডাকাতি করে সিলিং ফ্যান ও নগদ কয়েক হাজার টাকা লুট করি। এরপর আমি শায়খ রহমানের নির্দেশে খুলনায় হাফেজ মাহমুদের কাছে যাই। সেখানে একটি আস্তানায় অবস্থান করে ব্র্যাক অফিসে ডাকাতির প্রস্তুতি নেই।’
নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জেএমবি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এনজিও’র কার্যালয়গুলোতে ডাকাতি করে বেড়াতো। খুলনা, সাতক্ষীরা, জামালপুর, শেরপুর এলাকায় ব্র্যাক অফিসে তারা ডাকাতি করেছে। এসব অপারেশনে মিজান নিজেও অংশ নিয়েছে। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মিজান সাতক্ষীরায় গিয়ে সার্কাস মাঠে বোমা হামলা, ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে ময়মনসিংহে বিভিন্ন সিনেমা হলে এবং ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে শেরপুরের সার্কাস মাঠে বোমা হামলায় অংশ নেয় মিজান। তার ভাষ্য, ‘শায়খ আব্দুর রহমানের নির্দেশে ২০০২ সালে আমি সাতক্ষীরা যাই। তখন সাতক্ষীরা জেলার দায়িত্বশীল ছিল সাইফুল্লাহ। সাইফুল্লাহর তত্ত্বাবধানে সাঈদের সহায়তায় দুইটি টাইম বোমা তৈরি করি। ২৮ সেপ্টেম্বর (২০০২ সাল) সন্ধ্যাকালীন শো-তে আমি একটি বোমা নিয়ে রক্সি সিনেমা হলে প্রবেশ করি। অন্য বোমাটি নিয়ে লোকমান ওরফে শহীদুল্লাহ সার্কাস মাঠে যায়। আমি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বোমার টাইম ফিক্সড করে সিটের নিচে সেট করে বের হয়ে আসি। লোকমানও সাড়ে সাতটায় টাইম ফিক্সড করে সার্কাস প্যান্ডেলের ভেতরে বোমাটি ফিট করে আসে। যথাসময় বোমা দুটি বিস্ফোরিত হলে আমরা বাসযোগে খুলনা চলে যাই।’
মিজান জানিয়েছে, ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে জামালপুর জেলার দায়িত্বশীল তারেকের নির্দেশে ময়মনসিংহে যায় সে। সেখানে ময়মনসিংহের দায়িত্বশীল ফারুক তাকে পাওয়ার জেল আর ডেটোনেটর সংগ্রহ করে দেয়। মিজান নিজে চারটি টাইম বোমা তৈরি করে। ৭ ডিসেম্বর ভাগ্নে শহীদ, গালিব, লোকমান ও মিজান চারটি বোমা নিয়ে সন্ধ্যার শো-তে সিনেমা হলে ফিক্সড করে আসে। মিজান অলকা সিনেমা হলে, ভাগ্নে শহীদ ছায়াবিথী হলে, গালিব পূরবী সিনেমা হলে ঢুকে বোমা ফিক্সড করে। যথাসময়ে তা একযোগে বিস্ফোরিত হয়। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে মিজান প্লাস্টিক বডির একটি হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরি করে মোয়াজকে সঙ্গে নিয়ে শেরপুরের সার্কাস প্যান্ডেলে বিস্ফোরণ ঘটানোর কথাও জানায় সে।
মিজান সম্পর্কিত নথিপত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে মিজান ঢাকার বাসাবোতে কিছুদিন থাকার পর আবারও সাতক্ষীরা গিয়ে বর্ডার থেকে অস্ত্র, গুলি নিয়ে খুলনা আসার পথে ঝিকরগাছা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। ২২ মাস পর ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে জামিনে বের হয়ে আসে। মিজানের ভাষ্য— জেল থেকে বেড়িয়ে ঢাকার বাসাবো এলাকায় শায়খ রহমানের বাসায় থাকতে শুরু করে সে। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহ জেলার চেচুয়া বাজারে ব্র্যাক অফিসে আতাউর রহমান সানির নেতৃত্বে কাওসার, ভাগ্নে শহীদ, তারেক, সালাউদ্দিনসহ ১০-১২ জন ব্র্যাক অফিসে ডাকাতি করে দুটি মোটর সাইকেল লুট করে।

১৭ আগস্টের বোমা হামলায় অংশগ্রহণ
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে যে বোমা হামলা চালিয়েছিল জেএমবি, সেই হামলায় কক্সবাজার এলাকায় থেকে অংশ নিয়েছিল মিজান। মিজানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের জুন মাসে আতাউর রহমান সানির নির্দেশে কক্সবাজার জেলার দায়িত্ব পেয়ে সেখানে  যায় মিজান। সেখানকার চেচুয়া এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে অবস্থান করতে থাকে। তার সঙ্গে আনাস, মাসুম বিল্লাহ, আব্দুল্লাহ, হাফেজ জাফর ও দেলোয়ার ছিল। ওই বছরের ১৪ বা ১৫ আগস্ট ঢাকা থেকে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মোহাম্মদের কাছে ৪০টি বোমা পাঠানো হয়। মিজান চট্টগ্রাম থেকে ছয়টি বোমা নিয়ে কক্সাবাজার যায়। পূর্ব পরিকল্পনা মতো ১৭ আগস্ট সঙ্গীদের নিয়ে আদালতের বাইরে এবং মার্কেটের চারটি স্পটে চারটি বোমা ফিক্সড করে রাখে। সকাল সাড়ে ১০টায় সেসব বিস্ফোরিত হয়।

মিজান তার ভাষ্যে বলেছে, ‘আমি কক্সবাজারে বসে ৫/৭টি বোমা তৈরি করি। এরপর চট্টগ্রামে গিয়ে জাবেদ ইকবালের তত্ত্বাবধানে সিটি গেট এলাকায় দুটি বই বোমা, একটি ফ্ল্যাক্স বোমা ২-৩টি জ্যামিতি বক্স বোমা ও ১৪-১৫টি হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরি করি। আমার তৈরি করা বোমা দিয়ে ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর সাড়ে ১১টায় কোতোয়ালি থানা বাজার এলাকায় জাবেদ ও মাসু এবং দুপুর ১২টায় চট্টগ্রামের কোর্ট বিল্ডিং নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় জজ আদালতে আনাস ও মাসু বিস্ফোরণ ঘটায়। এছাড়া, ২৯ নভেম্বর সকাল ৯টার সময় চট্টগ্রাম জজ শিপ কর্মচারী কল্যাণ পরিষদ ক্যান্টিনের সামনে রাস্তায় জাবেদ বিস্ফোরণ ঘটায়।’

আগেও পালিয়ে ভারতে ছিল মিজান
২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার সবুজবাগে র‌্যাবের এক অভিযানে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর অন্যদের সঙ্গে দুটি মামলা হয় মিজানের বিরুদ্ধে। গ্রেফতারের ভয়ে ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে নওগাঁ হয়ে ভারতে চলে যায় মিজান। মিজানের ভাষ্য— নওগাঁর সাপাহারে গেলে সেলিম নামে একজন তাকে রিসিভ করে। রাতে সেখানে অবস্থান করার পরদিন তৎকালীন বিডিআর সদস্যদের অর্থ দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে রাতের বেলা ভারতীয় সীমান্ত পার হলে আরিফ নামে এক জেএমবি সদস্য তাকে রিসিভ করে মুর্শিদাবাদের মেসে নিয়ে যায়। সেখানে কাপড়ের ব্যবসা করে দিন যাপন করতো মিজান। ব্যবসার পাশাপাশি ২-৩ জন বাংলাদেশি ও ১৪-১৫ জন ভারতীয় নাগরিক মিলে তারা সেখানে সাংগঠনিক কার্যক্রমও করে।
মিজান সম্পর্কিত নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে একবার দেশে ফিরে এসে কোরবানির ঈদের পর কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে আবারও ভারতে প্রবেশ করে বোমা মিজান। এক সপ্তাহ পর তার স্ত্রী হালিমা নুসাইরও অবৈধপথে ভারতে প্রবেশ করে। সাইফ নামে এক সহযোগীর মাধ্যমে নদীয়া জেলার করিমপুর থানা এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে সে। ২০০৮ সালের মে মাস পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে বোমা মিজান।

বোমা তৈরিতে পারদর্শী ১০০ জঙ্গি
বোমা মিজানের দেওয়া ভাষ্য, ‘নাজমুল, শিবলু, সোহেল মাহফুজ বোমা তৈরিতে আমার সমপর্যায়ে  পারদর্শী। বর্তমানে (২০০৮-০৯) আমাদের সংগঠনে মোল্লা ওমরের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ২০ জন, আমার প্রশিক্ষণ দেওয়া ২৫ জন, সোহেল মাহফুজের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ১০ জন, ওসমানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ৪০ জনসহ মোট প্রায় ১০০ জনের মতো বোমা তৈরির বিশেষজ্ঞ রয়েছে।’
নথি বলছে, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার দিঘীধানগড়ার আব্দুল মজিদের মেয়ে মরিয়ম ওরফে মুক্তিকে বিয়ে করে মিজান। একমাস পর মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগ এবং মণিপুরে আলাদা দুটি বাসা ভাড়া নেয়। পীরেরবাগের বাসায়  প্রথম স্ত্রীসহ বসবাস ও মণিপুরের বাসায় বোমা তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করে। ২০০৯ সালের ১৫ মে ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে স্ত্রী হালিমাসহ বোমা মিজানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

প্রিজন ভ্যানে হামলার পর পালিয়ে আবার ভারতে
ঢাকার মিরপুর থেকে গ্রেফতারের পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে বোমা মিজানসহ তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয় জেএমবির নাসরুল্লাহ বিগ্রেড। ওই ঘটনার পরদিনই মিজানের দুই সহযোগীর একজন রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ পুলিশের হাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তখন থেকেই সালাউদ্দিন সালেহীন ও বোমা মিজান ভারতে আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল।
জঙ্গি নিয়ে কাজ করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন কর্মকর্তারা বলছেন, জেএমবি এখন আন্তর্জাতিক রূপ নিয়ে তাদের মূল দল করেছে জামাআতুল মুজাহিদীন। জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ এবং জামাআতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া বা জেএমআই হলো শাখা। জেএমআইয়ের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল বোমা মিজান। ভারতে আত্মগোপনে যাওয়ার পরপরই ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড়ের হামলায়  নাম আসে মিজানের। সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে বুদ্ধগয়ায় বৌদ্ধ ধর্মগুরু দালাইলামাকে হত্যা পরিকল্পনা এবং বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় বোমা মিজানের নাম পায় গোয়েন্দারা। সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়েই গত ৬ আগস্ট ব্যাঙ্গালুরু থেকে ভারতীয় দুই সহযোগীসহ বোমা মিজানকে গ্রেফতার করে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা- এনআইএ।

 

 

 

 

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ