ঘষামাজা কে করেছে?

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ০১:০২, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৪, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজরাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষার ৬৯টি উত্তরপত্রে ঘষামাজা ও আরও কিছু খাতায় ভুল উত্তর রাবার দিয়ে মুছে শুদ্ধ উত্তর লিখে দেওয়া হয়েছে। তবে এই কাজের সঙ্গে কারা যুক্ত তা তদন্তে স্পষ্ট করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে সংবাদ প্রকাশের পর অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে সংরক্ষিত খাতায় কে বা কারা ঘষামাজা করেছে বা রাবার দিয়ে মুছে শুদ্ধ উত্তর লিখেছে তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারা লিখেছে তা বের করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুদককে দায়িত্ব দিলে তারা বের করে দিতে পারবে। প্রয়োজনে সরকার মামলা করে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করবে।’

মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) সালমা জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ ও অন্য অভিযুক্তদের হাতের লেখার সঙ্গে রাবার দিয়ে মুছে শুদ্ধ উত্তর লেখার মিল নেই। প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করা হলেও কে ঘটিয়েছে তা বলা হয়নি। তাই কারা এ কাজ করেছে তা বের করা জরুরি।’

উত্তরপত্রে ঘষামাজা নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনগত ৮ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিল ঢাকা জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন বলা হয়, ‘৬৯টি উত্তপত্রে ঘষামাজা ও ওভাররাইটিং থাকায় সেগুলো জব্দ করা হয়। কিছু খাতার উত্তর রাবার দিয়ে মুছে ঘষামাজা ও ওভাররাইটিং করা হয়েছে মর্মে সরেজমিন তদন্তে পরিলক্ষিত হয়েছে। কিছু কিছু খাতায় হাতের লেখায় অসামঞ্জস্যতা রয়েছে।’

তবে খাতার ঘষামাজার সঙ্গে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ ড. শাহানারা বেগম, সহকারি প্রধান শিক্ষক আ. ছালাম খান, তার ভাই, হিসাব সহকারী দীপা, প্রকৌশলী আতিকুর রহমান এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. কবির হোসেন ও আতিকুর রহমান লেখার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা অনুসন্ধানে তা স্পষ্ট করা হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, অভিভাবক ঐক্য ফোরামের নেতারা বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সংশ্লিষ্টদের দায় নিতে হবে। তারা দায় নিতে না চাইলে বুঝতে হবে তারাই এই কাজটি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

উত্তরপত্রে ঘষামাজা নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন২০১৮ সালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় উত্তপত্রে ঘষামাজা ও ভুল উত্তর রাবার দিয়ে মুছে সেই স্থানে শুদ্ধ উত্তর লিখে নম্বর দিয়ে ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীদের পাস করানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগমের বিরুদ্ধে। আর এ কাজে অধ্যক্ষকে সহযোগিতা করার অভিযোগ ছিল সহকারী প্রধান শিক্ষক আ. ছালাম খান, হিসাব সহকারী দীপা, প্রকৌশলী আতিকুর রহমান এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. কবির হোসেন ও আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।

গত ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে লিখিত এই অভিযোগ করেছিলেন, অভিভাবক শ্যামলী শিমু। তার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও, অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদনে। অভিভাবক শ্যামলী শিমু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ তাদের সহযোগীদের নিয়ে এই কাজ করেছেন। অধিকতর তদন্ত করলে কে বা কারা ঘষামাজা করেছে এবং কে বা কারা লিখেছে তা বেরিয়ে পড়বে।’

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এখন ইচ্ছা থাকলে অভিযুক্তকেও খুঁজে বের করা যাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘষামাজা ও হাতের লেখা পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠালেই বের হয়ে যাবে কারা এ কাজ করেছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অধ্যক্ষ অফিস সহকারী দীপাকে নিয়ে এ কাজ করেছেন একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সমন্বয়কারী সহকারী প্রধান শিক্ষক আ. ছালামের ভাই প্রকৌশলী আতিকুর রহমান। তারা নিজেরা লিখেছেন নাকি অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়েছেন তা এদের কাছ থেকেই সহজে বের করা যাবে। সরকার চাইলেই তা করা সম্ভব।’ দুলু আরও জানান, এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, এর আগে ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রায় ৫১৮ ছাত্র ভর্তির কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

উত্তরপত্রে ঘষামাজা নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনএদিকে, তদন্তের সময় তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া লিখিত জবাবে যেসব শিক্ষকরা খাতা মূল্যায়ন করেছেন তাদের দায়ী করেছেন অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম। ড. শাহান আরা বেগম তদন্ত কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানান, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার ভর্তি কার্যক্রম গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সব ব্রাঞ্চের সহকারী প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতায় এবং গভর্নিং বডির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। ভর্তি পরীক্ষার খাতা সহকারী শিক্ষকরা মূল্যায়ন করেন। যেসব পরীক্ষায় ভর্তি পরীক্ষা থাকে সেসব শ্রেণির এবং ব্রাঞ্চের সহকারী প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি ও কম্পিউটার অপারেটররা খাতার নম্বর পোস্টিং দেন এবং মেধা তালিকা তৈরি করেন। ওই শিক্ষকরা মেধা অনুযায়ী ফলাফল তৈরি করে সাক্ষর দিয়ে চূড়ান্ত সাক্ষরের জন্য অধ্যক্ষের কাছে উপস্থাপন করেন। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন এবং দুঃখজনক।

অভিযুক্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক আ. ছালাম তদন্ত কর্মকর্তাকে লিখিত জবাবে জানান, ২৫ বছর ধরে অত্র প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমার জানা মতে, অধ্যক্ষ কোনও অবৈধ কাজ করেননি এবং সহকর্মী হিসেবে আমাকে বলেননি কিংবা বল প্রয়োগ করেননি।

অফিস সহকারী দীপা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তার লিখিত জবাবে বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল তৈরিতে আমি কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করেছি। আমার সঙ্গে মো. মামুনু-উর-রশিদ ভূঞা ও মো. ছলিমুল আক্রাম কম্পিউটারে ফলাফল তৈরির কাজ করেছিলো। আমি কেবল খাতার প্রাপ্ত নম্বর কম্পিউটারে পোস্টিং দিয়েছিলাম। আমাকে অধ্যক্ষ ফলাফল পরিবর্তনের ব্যাপারে বলেননি কিংবা চাপ প্রয়োগ করেননি। অতএব আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।

 

/আইএ/

লাইভ

টপ