সেই ১৪ হাসপাতাল যেমন

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ২৩:৫০, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:২৯, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

বন্ধের নির্দেশ পাওয়া কয়েকটি হাসপাতালের রাতের চিত্র

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বন্ধের নির্দেশ পাওয়া লাইসেন্সবিহীন ১৪টি হাসপাতালের বেশিরভাগই মঙ্গলবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতেও খোলা ছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতর বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কেউ এখনও তাদের কাছে আসেনি। তবে আদালতের নির্দেশ এরই মধ্যে জেনে গেছেন এসব  হাসপাতালের কর্মীরা। তাদের চোখে-মুখে দেখা গেছে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। চাকরি হারানোর বয়ের মধ্যেই তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, এই আদেশ তাদের মালিকরা মানবেন কিনা তা তারা জানেন না। এ বিষয়ে হাসপাতালগুলোর মালিকপক্ষ তাদের এখনও কিছু জানাননি।

জনসেবা নার্সিং হোম অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বন্ধের তালিকায় থাকা ১৪ হাসপাতালের মধ্যে আছে এই প্রতিষ্ঠানের নামও।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিপরীতে বাবর রোড ও খিলজি রোডে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লাইসেন্স ছাড়াই দিব্যি চলছে এই ১৪টি হাসপাতাল। এগুলো হচ্ছে বিডিএম হাসপাতাল, সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল, জনসেবা নার্সিং হোম, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, রয়্যাল মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল, নবাব সিরাজউদ্দোলা মেন্টাল হাসপাতাল,  মনমিতা মেন্টাল হাসপাতাল,  প্লাজমা মেডিক্যাল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, শেফা হাসপাতাল,  ইসলামিয়া মেন্টাল হাসপাতাল,  মক্কা মদীনা জেনারেল হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল ও  বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হাসপাতাল। 

এগুলোর কোনওটি ছোট্ট বাড়িতে কোনটি আবার বহুতল ভবনে অবস্থিত। হাসপাতাল নাম হলেও কোনও কোনটির আয়তন এত ছোট যে কোনও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার ভেবে ভুল করতে পারেন যে কেউ। সম্প্রতি এসব হাসপাতালের ওপর একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের সূত্র ধরে আদালতে রিট আবেদন করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সেই রিট আবেদনের শুনানি শেষে লাইসেন্সবিহীন তথাকথিত এই ১৪টি হাসপাতাল অবিলম্বে বন্ধের আদেশ দেন বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তারা। তবে এদিন রাত আটটার পরেও কোনও কর্তৃপক্ষকে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বেশকিছু হাসপাতালের মালিক ও কর্মীরা জানিয়েছেন, আদালতের বন্ধ ঘোষণার আদেশটি তারা টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখেছেন। তবে এ নিয়ে কোনও কর্তৃপক্ষ এখনও তাদের কিছু জানায়নি। তবে নোটিশ পেলে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন কয়েকটি হাসপাতালের মালিকরা।

রয়্যাল মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতাল

মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর বাবর ও খিলজি রোড ঘুরে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ১৪টি হাসপাতালের দুটি বন্ধ, বাকিগুলো খোলা রয়েছে। হাসপাতালগুলোর প্রায় প্রতিটির সামনে ঝুলছে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নামখচিত বোর্ড। তবে কোনও হাসপাতালে গিয়ে বিশেষজ্ঞ কোনও চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। হাসপাতালের কর্মীরা জানান, রোগী আসার খবর দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসে রোগী দেখে যান। কয়েকটি হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে দেখা যায় ঝকঝকে রিসেপশন। সেখানে রিসেপশনিস্ট এবং অন্য কর্মীদের দেখা মেলে।  একটি হাসপাতালে দেখা যায়,  হুইল চেয়ারে করে একজন বয়স্ক রোগী নিয়ে এসে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছেন রোগীর আত্মীয়।  

রয়েল মাল্টিস্পেশালিস্ট হাসপাতালে ঢুকে এই প্রতিবেদকের  কথা হয় রিসেপশনিস্ট মানসুরা আক্তারের সঙ্গে। তিনি  বলেন, আমরা টিভিতে খবরটি দেখেছি। আমাদের হাসপাতালটি দোতলা বাড়ি। এখানে আমরা শিফটে ডিউটি করি। নিয়মিত চিকিৎসক আছেন ৬/৭ জন। আর ডাকলে আসেন এমন চিকিৎসক আছেন ১০ জন। আমাদের এখানে সব ধরনের অস্ত্রোপচার হয়।

তিনি দাবি করেন, এই হাসপাতালে ২০ শয্যার অনুমোদন আছে। তবে, এখন শয্যা আছে ১০টি। ভিআইপি কেবিন আছে ২টি এবং সিঙ্গেল কেবিন আছে ২টি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান স্যার ডা. আরিফ হোসেন হজে গেছেন। তিনি ১৪ তারিখ দেশে ফিরবেন। তিনি দেশে ফিরে আসার  পর সিদ্ধান্ত নেবেন এই রায়ের ব্যাপারে কী করা যায়।’

ল্যাব টেকনোলজিস্ট মো. সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে রক্তের সব ধরনের পরীক্ষা হয় শুধু ক্রস ম্যাচিংটা ছাড়া। কারণ এটির অনুমতি নেই।

মক্কা মদীনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বন্ধের তালিকায় আছে এই হাসপাতালটির নামও।

মক্কা মদীনা জেনারেল হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট ফয়সাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এই হাসপাতাল গত ২ ফেব্রুয়ারি ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো. সরোয়ার আলম ১ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং সিলগালা করে দেয়। গতকাল (সোমবার) আমাদের কর্তৃপক্ষ কোর্ট থেকে স্থিতিবস্থা নিয়ে আসার পর আজ আমরা হাসপাতালের তালা খুলেছি। এরপর পরিষ্কার করেছি। এখন বিকাল থেকে সাংবাদিকরা এসে জানতে চাইছে দেখে আমি আর আমার কলিগ  মো. রায়হান রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।

লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম

লাইফ কেয়ার নার্সিং হোমের সিস্টার ইনচার্জ জবা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা খবরটা টিভিতে শুনেছি। আমরা এখনও মানতে পারি না যে, আমাদের হাসপাতালটা কোর্ট থেকে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বাবর রোডে তো আরও হাসপাতাল আছে। অন্যগুলো তো সরকার বন্ধ করেনি! এটি দোতলা হাসপাতাল। প্রথমে ১৬-১৭ জন স্টাফ ছিলাম। এখন অনেকেই চলে গেছে। এখন ১ জন রোগী ভর্তি আছে। এটির মালিক সিস্টার বিভা বিশ্বাস। এখানে একজন রোগী ভর্তি আছে। চিকিৎসককে খবর দিলে তিনি এসে রোগী দেখে যান।’

সিস্টার মুক্তি বলেন, ‘আমি গতমাসে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসে এখানে জয়েন করেছি। ঢাকা সম্পর্কে আমার তেমন কোনও ধারণা নেই। পাস করার পর বেকার বসেছিলাম তাই একজন চিকিৎসক আমাকে এখানে চাকরি দিয়েছে। কিন্তু এটা বন্ধ হয়ে যাবে শুনে অবাক হচ্ছি!’

জনসেবা নার্সিং হোমের ম্যানেজার মাহমুদ আলম বলেন, গত ৩০ বছর ধরে আমাদের এই হাসপাতালটি চলছে। ৬ তলা এই ভবনে আমরা ৪০ জন স্টাফ আছি। এটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখন ১২ জন রোগী ভর্তি আছে। মূলত অর্থোপেডিক চিকিৎসার রোগীরা এখানে বেশি আসে। এই হাসপাতালের মালিক তাহেরা বেগম।

তিনি দাবি করে বলেন, ‘৬ মাসে আগে আমরা হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন করেছি।’

তিনি বলেন, ডা. আরিফ আনোয়ার, ডা. হুমায়ন ফজলে বারী, ডা. মো. আলাউদ্দীন এখানে রোগী দেখেন। ডা. নুর মোহাম্মদ  এখানে অস্ত্রোপচার করেন।

সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়গনস্টিক সেন্টার

সেবিকা জেনারেল হাসপাতালের সত্ত্বাধিকারী এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, টিভিতে এই সংবাদটি দেখেছি। ১৪ টি হাসপাতালের কথা বলেছে। আর বলেছে, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আশেপাশে কিন্তু নাম উল্লেখ নেই। ২০১৬ সালে আমাদের এভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলেছিল। এরপর সংশোধনী দেয়। আমরা সেগুলো পূরণ করার পর চালাই। এখন আবার কেন নিষেধ করল বুঝতে পারছি না। ২০১৮ সালের লাইসেন্স এখনও রিভিউ করা হয়নি। ১০ বেডের হাসপাতাল এটা। মূলত জেনারেল গাইনি, সার্জারি, অর্থোপেডিকস এর রোগী আমাদের এখানে বেশি আসে।

তিনি বলেন, আমি প্রথমে সেবিকা ক্লিনিক এক বন্ধুর পরামর্শে কিনি। এরপর এটিকে হাসপাতাল বানাই। এই ব্যবসায় এসে ভালোই ধরা খেয়েছি। প্রায় ১৮ বছর আমি এই পেশায় আছি।

শেফা হসপিটাল। বন্ধের তালিকায় আছে এই হাসপাতালের নামও

শেফা হসপিটালের দুইজন মালিক আলমগীর হোসেন ও রফিকুল ইসলাম। তারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০১৩ সাল থেকে এই হাসপাতালটা চালাই। ৫ তলা হাসপাতালটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখানে স্টাফ আছে ৪৩ জন। বর্তমানে ১১ জন রোগী ভর্তি আছে। খবরটি আমরা শুনেছি। এখনও কোনও কিছু করছি না। নোটিশ আসার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।

বিডিএম হসপিটালে গিয়ে দেখা যায়, রিসেপশনে রোগীদের বেশ ভিড়। এখানকার রিসেপশনিস্ট নিজে কিছু বলতে পারবেন না জানিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলার জন্য বলেন। 

বিডিএম হাসপাতাল। বন্ধের নির্দেশ পাওয়া ১৪ হাসপাতালের মধ্যে এটিও রয়েছে।

বিডিএম হাসপাতালের ম্যানেজার মো. সাইদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট। আমরা ২০-২২ বছর ধরে রাজধানীতে এই হাসপাতাল পরিচালনা করছি। যদি কোন খুঁত থাকতো তাহলে এতদিন এই হাসপাতাল পরিচালনা করতে পারতাম না। আমাদের এখানে বড় বড় হাসপাতালের নামি চিকিৎসকরা এসে চিকিৎসা করেন। মূলত অর্থোপেডিক রোগীর চিকিৎসা এখানে বেশি করা হয়। ৮ তলা এই হাসপাতালটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট। ১৫০ জন স্টাফ আছেন। ২০ জন চিকিৎসক আছেন। আমরা যতদূর সম্ভব ক্লিনভাবে এই হাসপাতাল চালাই। এই প্রথমবার রিটের মুখোমুখি হলাম। আমরা আইনিভাবেই এটার জবাব দেবো।

নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল

সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতাল, নবাব সিরাজউদ্দৌলা মেন্টাল হাসপাতাল দুটি। তবে বন্ধ ঘোষণার তালিকায় থাকা লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, মনমিতা মেন্টাল হসপিটাল,  প্লাজমা মেডিক্যাল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, ইসলামিয়া মেন্টাল হসপিটাল  ও  বাংলাদেশ ট্রমা স্পেশালাইজড হসপিটালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

ছবি : সাজ্জাদ হোসেন।

/টিওয়াই/টিএন/

লাইভ

টপ