হাতিরঝিলে ২৯ অবৈধ স্থাপনা

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১০:০০, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৬, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

হাতিরঝিলে অবৈধ দোকান

মাস্টার প্ল্যান অমান্য করে রাজধানীর হাতিরঝিলে প্রায় ২৯টি অবৈধ খাবার দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি দোকানই স্থায়ীভাবে গড়ে উঠেছে। বাকি ১৮টি দোকানের মধ্যে কয়েকটি অস্থায়ী ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।   অবৈধ এসব দোকানের অর্ধেকের বেশি গড়ে উঠেছে ঝিলের পাড় ঘেঁষে। সাত দিনের মধ্যে হাতিরঝিল থেকে এসব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিষয়টি নিয়ে বেকায়দায় থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বলছে, আদালতের আদেশ অনুযায়ী অবৈধ সব দোকান দ্রুতই উচ্ছেদ করা হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা হাতিরঝিলের উন্মুক্ত স্থান দখল করে পিকআপ ভ্যানে খাবারের দোকান পরিচালনা করছে। বরাদ্দপত্রে নির্দিষ্ট করে দেওয়া সীমানাও তারা মানছেন না। দোকানগুলো নির্ধারিত এলাকার বাইরেও বসছে। কেউ কেউ ফুটপাত কেটে খাবারের গাড়ি রাখার জন্য স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।  অনেকে আবার টিনের ছাউনি, কংক্রিট ও কাঠের পাটাতন, ত্রিপল-ছাতা আর চেয়ার-টেবিল দিয়ে বরাদ্দের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জায়গা দখলে নিয়ে দোকান করছে। এসব দোকানের কারণে ঝিলের সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে না।

হাতিরঝিলে অবৈধ দোকান

আদালতের নির্দেশের পর বিষয়টি নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে রাজউক। সংস্থাটি বলছে, বরাদ্দ পাওয়া দোকান মালিকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। অনেক মালিক অগ্রিম টাকাও  দিয়েছেন। কিন্তু দোকান বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে রাজউকের কাছ থেকে কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এসব অবৈধ স্থাপনা অপসারণের  জন্য এর আগেও  কয়েকবার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে রাজউক। বিষয়টি অবৈধ হলেও সংস্থাটি বলছে, বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার পর সবগুলো দোকান উচ্ছেদ করা হবে। এ জন্য দোকানিদের আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।

এখন সাত দিনের মধ্যে হাতিরঝিলের সব অবৈধ দোকান উচ্ছেদে আদালতের আদেশ আসায় রাজউক বলছে— আদেশটি তাদের জন্য ইতিবাচক। তারও চান হাতিরঝিল থেকে এসব অবৈধ দোকান অপসারণ হোক।

হাতিরঝিলে অবৈধ দোকান

জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিভাবে হাতিরঝিলে এই দোকানগুলো গড়ে উঠেছে, তা আমাদের জানা নেই। দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়ার সময় রাজউকের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। রাজউক হাতিরঝিলে দোকান বসানোর পক্ষে না।  আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে সব দোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যেহেতু আদালত রায় দিয়েছেন, এই আদেশ আমাদের জন্য ইতিবাচক। আমরা রায় মোতাবেক আগামী সাত দিনের মধ্যে সব দোকান উচ্ছেদ করবো। এখন আর কোনও অজুহাত শোনা হবে না। সব ভেঙে দেবো।  দোকান মালিকদের পাওনাও বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘গত ৮ জুলাই বিষয়টি নিয়ে আমরা বৈঠক করেছি। উচ্ছেদের বিষয়ে সেখানেও সিদ্ধান্ত হয়েছে। রবিবারও বৈঠক হয়েছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি, নকশা বহির্ভূত সব স্থাপনাই উচ্ছেদ হবে। তবে কিছু জটিলতা রয়েছে। শুনেছি, অনেক দোকানের মালিকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেকেই অ্যাডভান্সও দিয়েছেন। আমরা এসব দোকানের তালিকা চেয়েছি। বলে দিয়েছি— ডিসেম্বরের মধ্যে সব দোকান উচ্ছেদ হবে। যারাই এগুলো বরাদ্দ দিয়ে থাকুক, আমরা সেগুলো উচ্ছেদে বদ্ধ পরিকর।’

হাতিরঝিলে অবৈধ দোকান

সোমবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ঝিলের পানি ঘেঁষে ২৯টি অস্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে প্রায় ১১টি দোকান স্থায়ীভাবে জেঁকে বসেছে। এর মধ্যে গুলশান পুলিশ কনকর্ড প্লাজার বিপরীতে ‘তন্দুরি কাবাব’ নামের একটি রেস্তোরাঁ রয়েছে। এই রেস্তোরাঁটি সিমেন্টের খাম্বার ওপর তৈরি করা হয়েছে। বাড্ডার দিকে একটু এগোলেই ‘ঝিলমিল’ নামের আরেকটি রেস্তোরাঁ। এটিও ফুটপাত থেকে ঝিলের ভেতরের অংশে পড়েছে। আরেকটু এগিয়ে রামপুরা অংশে ‘ফুড মোবাইল’ নামের একটি ভ্রাম্যমাণ খাবারের ট্রাক। তবে ট্রাকটি মূল সড়কে থাকলেও  ক্রেতাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে স্থায়ী কাঠামোর মাধ্যমে। এই স্থানের মধ্যে অন্তত চারটি বিশাল আকারের দোকান স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, ঝিলের প্রতিটি ওভারব্রিজের নিচে স্থায়ীভাবে দোকান বসানো হয়েছে।

অন্যদিকে রামপুরা ব্রিজ সংলগ্ন উন্মুক্ত স্থান দখল করে গড়ে উঠেছে বড়ধরনের একটি দোকান। অথচ দোকানটির দখলে থাকা উন্মুক্ত স্থানে এক সময় দর্শনার্থীরা বেড়াতে এসে বসতো। এখন সেখানে কোনও উন্মুক্ত স্থান নেই। এই দোকানটির কারণে এখন আর ঝিলের সৌন্দর্য কিছুই দেখা যায় না। এই অংশের চক্রাকার বাস কাউন্টার থেকে একটু সামনে এগোলেই ঝিল ঘোঁষে নির্মাণ করা হয়েছে ‘ফুড মোবাইল অ্যান্ড চায়না গ্রিল’ নামে আরও একটি খাবারের দোকান। এই দোকানটিও সিমেন্টের খাম্বার ওপর স্থাপিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাস্টার প্ল্যানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এ ধরনের দোকান ঝিলের ন্যাচারাল সৌন্দর্য নষ্ট করেছে।

হাতিরঝিলে অবৈধ দোকান

এ বিষয়ে হাতিরঝিল প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মজিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাতিরঝিলের মাস্টার প্ল্যানে কোনও খাবার হোটেল বা দোকান ছিল না। তবে ২০১৩ সালের দিকে যখন দেখা গেল মানুষের সমাগম অনেক বেশি, তখন তাদের প্রয়োজনে কিছু  ফুড কোর্টের কথা বলা হয়েছে। তবে তা সংখ্যায় ৩-৪টির বেশি নয়। কিন্তু তাও  যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ, ঝিলের এমপি থিয়েটারে (উন্মুক্ত মঞ্চ) খাবার হোটেলের ব্যবস্থা থাকছে। ঝিলের উন্মুক্ত স্থানগুলোতে গণহারে দোকান অগ্রহণযোগ্য। এটা মূল পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরাদ্দ পাওয়া কয়েকজন দোকান মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই দোকানগুলো বরাদ্দ নেওয়ার সময় তারা একটি মহলকে ৫-৭ লাখ টাকা করে জমা দিয়েছেন। প্রতিমাসে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা করে ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। এখনও তাদের চালানের টাকাও ওঠেনি। খাবার বিক্রির লাভের অংশ দিয়েই দোকান পরিচালনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা নির্বাহ করতে হয়। তবে কর্তৃপক্ষ পাওনা টাকা বুঝিয়ে দিলে তারা এখান থেকে চলে যেতে রাজি আছেন।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ