পুলিশ কর্মকর্তা মুশতাকের বিরুদ্ধে জমি দখলে সহায়তার অভিযোগ!

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:০৬, অক্টোবর ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১২, অক্টোবর ১৩, ২০১৮

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মুশতাক আহমেদ

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে জমি দখলে সহয়তা করার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার সরকারি দলের সংসদ সদস্য রহমতউল্ল্যার ব্যক্তিগত সচিব এহসানুর রহমান সুমন এই অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি উল্লেখ করে গত ৯ অক্টোবর মুশতাক আহমেদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ সদর দফতরের ‘আইজিপি’স কমপ্লেইন্ট মনিটরিং সেল’-এ (নম্বর এস-৬৫৪) অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

এ অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করা হলে গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মুশতাক আহমেদ বলেন, ‘একজন ব্যক্তি আমাদের থানায় অভিযোগ করেন যে তাকে তার জমিতে কাজ করতে দিচ্ছে না। এর প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় থানা পুলিশ দুই পক্ষকেই শান্তিতে থাকতে বলেছে। যেহেতু বেরাইদে আগে একটা মার্ডার হয়েছে, সেহেতু আমরা দুই পক্ষকেই শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে বলেছি। এটা বলার কারণেই সে একটা কমপ্লেইন করেছে।’ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে মামলার ভয়ভীতি দেখানো এবং হেনস্থার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন।

পুলিশ সদর দফতরে আইজিপির কাছে করা অভিযোগে এহসানুর রহমান সুমন বলেছেন, বাড্ডা থানাধীন বেরাইদ এলাকায় তার স্থায়ী আবাস। বেরাইদ মৌজায় তার বাবার নামে কিছু জমি আছে। সেই জমির মধ্যে ১৫৯১ দাগের ৩০ শতক জমি নিয়ে পার্শ্ববর্তী জনৈক শাহাদত হোসেন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিবাদ রয়েছে। এ ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকার দ্বিতীয় জজ আদালতে একটি বাটোয়ারা মামলা (নম্বর ৪১৮-১৪) বিচারাধীন রয়েছে।

অভিযোগে এহসানুর রহমান সুমন বলেন, ‘২০০৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট নালিশি সম্পত্তিতে শাহাদত হোসেনের কোনও স্বত্ব নেই মর্মে একটি আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের ওই আদেশের পরও ডিএমপির উপ-কমিশনার (গুলশান বিভাগ) মুশতাক আহমেদ নালিশি সম্পত্তিতে শাহাদত হোসেনের স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সেখানে দেওয়াল নির্মাণের জন্য বান্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম পুলিশ বাহিনী নিয়ে গত ৮ অক্টোবর ওই নালিশি সম্পত্তিতে জোরপূর্বক দেওয়াল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করেন।’

অভিযোগে বলা হয়, “এর আগে এ ঘটনার জের ধরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার দিকে গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মুশতাক আহমেদ বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার আশরাফ সাহেবকে দিয়ে এহসানুর রহমান সুমনকে তার গুলশান অফিসে ডেকে পাঠায়। সুমন গুলশান ডিসি অফিসে উপস্থিত হয়ে প্রতিপক্ষ শাহাদত হোসেনসহ চার-পাঁচজনকে উপস্থিত দেখতে পান। পরে পুলিশের উপ-কমিশনার মুশতাক আহমেদ তাকে তার অফিস কক্ষে ডেকে নেন। কক্ষে প্রবেশ করার পর পুলিশ কর্মকর্তা মুশতাক আহমেদ উচ্চ স্বরে সুমনকে বলেন, ‘আপনি ভূমিদস্যু, ক্ষমতা অপব্যবহার করছেন। শাহাদত সাহেবের সঙ্গে আপনি কেন জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেছেন? উনি নালিশি সম্পত্তিতে বাউন্ডারি ওয়াল করবেন, তাতে আপনার কী?’”

এহসানুর রহমান সুমন বলেন, ‘আমি উপ-কমিশনারকে বিনয়ের সঙ্গে জানাই, আমার প্রতিবেশী শাহাদত সাহেবের সঙ্গে জমি নিয়ে একটি বাটোয়ারা মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আমার বাবা চিকিৎসা করার জন্য ভারতে রয়েছেন। তিনি মামলার প্রতিপক্ষ, আমি নই। তিনি দেশে ফিরে আসলে তার সঙ্গে কথা বলুন।’

সুমন বলেন, “আমি উপ-কমিশনার মুশতাক আহমেদকে জানাই যে এ ব্যাপারে আমি কোনও কথা বলতে রাজি নই। তিনি আমার বক্তব্য আমলে না নিয়ে কোনও অভিযোগ ছাড়াই আমার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখান। তিনি আমাকে বলেন, ‘আপনার বিরুদ্ধে মামলা হলে কেউ আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।’ একপর্যায়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার এমপি রহমতউল্লাহ সাহেব কেন আমাকে ফোন করেছিলেন?’ আমি তাকে বিনীতভাবে জানাই, ‘উনি কেন আপনাকে ফোন করেছিলেন তা আপনি মাননীয় এমপি মহোদয়কে জিজ্ঞাসা করুন। আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’ এরপর উপ কমিশনার মুশতাক আহমেদ আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন, ‘বর্তমান কর্মস্থলে আমার সাড়ে তিন বছর হয়ে গেছে। এখানে আমার না থাকলেও চলবে। আমি বিষয়টির শেষ দেখে ছাড়বো।’ এ ঘটনার কিছু সময় পর আমি বাসায় ফিরে আসি।”

আইজিপির কাছে দায়ের করা অভিযোগে কয়েকটি প্রশ্ন তুলেছেন এহসানুর রহমান সুমন। সুমনের ভাষ্য, জমিজমা বা দেওয়ানি বিষয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপের এখতিয়ার রয়েছে কিনা, উপ-কমিশনার পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা এভাবে আমাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এরকম আচরণ করতে পারেন কিনা, নালিশি জমি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার সংরক্ষণ করেন কিনা? জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে পুলিশের হস্তক্ষেপের ব্যাপারে হাইকোর্টের একটি রুলিং ও ডিএমপি সদর দফতরের একটি আদেশ রয়েছে। ওইসব আদেশে পুলিশকে জমিজমার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু উপ-কমিশনার মুশতাক আহমেদ উচ্চ আদালত ও ডিএমপি সদর দফতরের আদেশ অমান্য করে একটি পক্ষের হয়ে জমিতে দখল প্রতিষ্ঠার যে কাজটি করেছেন তা আদালত অবমাননার শামিল কিনা, নালিশি জমির সঙ্গে সম্পর্কিত নন এমন ব্যক্তিকে বিনা অভিযোগে মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে হেনস্থা করা যায় কিনা?

অভিযোগে বলা হয়, উপ-কমিশনার মুশতাক আহমেদ তার (সুমন) সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, তা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। উনি সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন যা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তার এ ধরনের দম্ভোক্তি, আচরণ পুলিশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সুমনের অভিযোগ, তার সঙ্গে কথা বলার সময় উপ-পুলিশ কমিশনার মুশতাক আহমেদ নালিশি সম্পত্তির প্রতিপক্ষ শাহাদত হোসেনের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক বিষয় টেনেছেন, উচ্চস্বরে হুমকি দিয়েছেন যেগুলো তার পদমর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনও অভিযোগ ছাড়াই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি এবং কোনও প্রমাণ ছাড়াই একজন নাগরিককে ‘ভূমিদস্যু’ ও ‘ক্ষমতার অপব্যবহারকারী’ বলে অপবাদ দেওয়াটা নিঃসন্দেহে আইনবহির্ভূত আচরণ বলে তার কাছে মনে হয়েছে।

আবেদনে সুমন বিষয়টি তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে আইজিপির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

যোগাযোগ করা হলে বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জমির বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই গ্যাঞ্জাম চলছে। সেই সূত্র ধরে ডিসির বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ দিয়েছে। পুলিশ সদর দফতর বিষয়টির সত্য-মিথ্যা তদন্ত করে দেখবে।’

পুলিশি সহায়তায় জমি দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মিথ্যা কথা। আমাদের কারো জমি দখল করতে যাওয়ার সময় নেই। এ ঘটনায় একাধিক জিডি আছে থানায়। কোথাও কোনও আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আমাদের যেতে হয়। কারণ, খুন-খারাবি হলে তার দায় নেবে কে?’

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ