বেঁধে দেওয়া সময়ে হস্তান্তর হয়নি মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০১:৫২, নভেম্বর ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৬, নভেম্বর ০৬, ২০১৮

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভাররাজধানীর মগবাজার-মৌচাক (সমন্বিত) ফ্লাইওভারটি বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেও হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাবেই ফ্লাইওভারটি এখনও অভিভাবকহীন অবস্থায় রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, ফ্লাইওভার হস্তান্তরের বিষয়ে তারা অনেক দূর এগিয়েছে। দুই এক সপ্তাহের মধ্যে অভিভাবক পাবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। সংস্থাটি স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুই সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে। গত ২২ অক্টোবর মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) মো. মাহবুব হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে দেয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রধান প্রকৌশলী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রধান প্রকৌশলী, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক। কমিটিকে ৫ নভেম্বরের মধ্যে ফ্লাইওভারটি দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কিন্তু বেঁধে দেওয়া এই সময়ের মধ্যেও কমিটি কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেনি। 

কমিটির সদস্য ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সালেহিন বলেন, ‘সোমবার (৫ নভেম্বর) বিকাল ৪টায় এলজিইডির সঙ্গে সিটি করপোরেশনের একটি সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। ফ্লাইওভারের নানা সমস্যা ও ত্রুটি নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই এটি হস্তান্তর করা হবে। তবে, কবে নাগাদ হতে পারে; এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

সোমবারের (৫ নভেম্বর) সভায় অংশ নেওয়া প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার জানান, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্প ২০১৭ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পরই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের উদ্যেগ নেওয়া হয়। কীভাবে ফ্লাইওভারটির রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফ্লাইওভারের ম্যানুয়্যাল তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব নথিও দেওয়া হয়েছে তাদের। কিন্তু, এখনো হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তিনি বলেন,‘মূলত ফ্লাইওভারটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর বাকি রয়েছে। এখন কবে, কীভাবে এটি হস্তান্তর হবে; এবিষয়ে আলোচনা চলছে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) মো. মাহবুব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফ্লাইওভার হস্তান্তরের কাজ চলছে। যেদিন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে, তার কয়েকদিন পর কমিটি করা হয়েছে। সে কারণে বেশি সময় না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা যায়নি। এখনও কাজ চলছে। কিছু এমওইউ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এগুলোতে স্বাক্ষর হওয়ার পর হস্তান্তর করা হবে। আর দুই এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে হয়ে যাবে।’

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফ্লাইওভারের ওপরে ও নিচে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করছি। অনেক সময় দেখা যায়, ফ্লাইওভারের ওপরে ধুলাবালিসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকে। ধুলায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলো অপসারণ করার জন্য কর্মী প্রয়োজন। এছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। আমরা প্রস্তুত রয়েছি। মন্ত্রণালয় যখনই দেবে, আমরা বুঝে নেবো।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের বাংলামোটর, মগবাজার, তেজগাঁও, মালিবাগ রেলগেট, রামপুরা অংশ পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায়। আর মৌচাক, মালিবাগ মোড়, রাজারবাগ ও শান্তিনগর অংশ পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)।

ডিএসসিসি সূত্র জানায়, এর আগে মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি পাওয়ার পর ফ্লাইওভারটির ত্রুটি খুঁজতে ডিএসসিসি আন্তঃবিভাগীয় সাতটি কমিটি গঠন করা হয়। এরমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, সম্পত্তি বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কমিটিগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে—পুরো ফ্লাইওভার পরিদর্শন করে এরমধ্যে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিবেদন আকারে সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা। এর আগে গত ২৩ জুলাই ডিএসসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলালের সভাপতিত্বে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

ফ্লাইওভারটি হস্তান্তরের দীর্ঘসূত্রিতার জন্য ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানিয়েছেন তার গাফিলতির কারণেই এখনও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই ফ্লাইওভারটি অভিভাবকহীন পড়ে রয়েছে। এ সংক্রান্ত কোনও কাজেই তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তার দফতরে গেলে তিনি ফ্লাইওভার নিয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিন স্তরবিশিষ্ট চার লেনের এই ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ হাজার ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর প্রতি মিটারে খরচ হয়েছে ১৩ লাখ টাকা। ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ করা হয়েছে তিন ভাগে। প্রথম অংশ সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত। এই অংশটি ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ফ্লাইওভারটির দ্বিতীয় অংশ হলো, বাংলামোটর-মগবাজার-মৌচাক-রাজারবাগ পর্যন্ত। এই অংশটি যান চলাচলের জন্য ২০১৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর উন্মুক্ত করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ফ্লাইওভারটির তৃতীয় অংশ রামপুরা চৌধুরীপাড়া-মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর অংশ গত ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

/এনআই/

লাইভ

টপ