বাকস্বাধীনতার শঙ্কা নিয়েই শুরু হলো ঢাকা লিট ফেস্টের অষ্টম আসর

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১১:৫৩, নভেম্বর ০৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৭, নভেম্বর ০৮, ২০১৮

‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮-এর অনাড়ম্বর সূচনা ঘোষণা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরশাস্ত্রীয় সংগীতের মূর্ছনায় কত্থক নৃত্যের তালে শুরু হলো ঢাকা লিট ফেস্টের অষ্টম আসর। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আজ বৃহস্পতিবারসহ তিন দিন বইবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সাহিত্যের জোয়ার। সেই জোয়ারে গা ভাসাতে আসছেন ১৫ দেশের দুই শতাধিক সাহিত্যিক, অভিনেতা, রাজনীতিক, গবেষক এবং বাংলাদেশের প্রায় দেড়শ’ লেখক, অনুবাদক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।

তবে এই আনন্দ আয়োজন যেন ঘিরে ধরেছে শঙ্কার আবহ। সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এ আয়োজনের পরিচালকরা।

বৃহস্পতিবার ( ৮ নভেম্বর) বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮-এর অনাড়ম্বর সূচনা ঘোষণা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ এবং আহসান আকবার।



কাজী আনিস আহমেদসংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, “স্পিকার, লেখক এবং বিদেশি অতিথিদের শুভেচ্ছা জানাই। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ একটি সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানালে তিনি অগ্রাহ্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিকদের এই মিলনমেলায় আমি কীভাবে যাই।’ এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করলে তিনি একটি শর্ত দেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে কবি জসীমউদদীন, চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও প্রফেসর আব্দুল মতিন চৌধুরীকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু ক্রিয়েটিভিটি এবং জ্ঞানের ওপর বিশ্বাস করেন। ঠিক এমনটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি সব সময় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ঢাকা লিট ফেস্টের অংশ হতে পেরে গর্বিত। আমি ঢাকা লিট ফেস্টের সাফল্য কামনা করি।”

এরপর ফিতা কেটে আসরের উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক, অভিনেত্রী নন্দিতা দাস এবং পুলিৎজার বিজয়ী লেখক এডাম জনসন তার সঙ্গে ছিলেন।

নন্দিতা দাসঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক এবং বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কারণে বাকস্বাধীনতা ঝুঁকিতে পড়ছে। ঢাকা লিট ফেস্ট সব সময় মুক্তচিন্তা এবং বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ঢাকা লিট ফেস্ট বরাবরই নারী, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে। সংস্কৃতির প্রতি বাংলাদেশ সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে আমরা অষ্টমবারের মতো এই আয়োজন করতে পারছি। ঢাকা লিট ফেস্টের কেউ কথা বলতে বাধার সম্মুখীন হয় না। এটা একটি মুক্ত জায়গা, খোলামেলা আলোচনা করার জন্য।’ এ সময় তিনি ঢাকা লিট ফেস্টকে পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানান।

অভিনেত্রী নন্দিতা দাস বলেন, ‘আমার অনুরোধ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালককে, আপনারা ভারতে আসুন এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলুন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম কারাগারে আছেন। তার জন্য আমাদের সবার একসঙ্গে আওয়াজ তোলা উচিত বলে আমি মনে করি। আমি অনুরোধ করবো এখানে উপস্থিত সংস্কৃতিমন্ত্রীকে বিষয়টি ভাবার জন্য। একজন শিল্পীর যেকোনও কিছু প্রকাশ করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। তিনি (শহিদুল আলম) শুধু উপমহাদেশে নয়, সারাবিশ্বে সুপরিচিত। বাকস্বাধীনতা শুধুমাত্র একটি দেশের বিষয় না, পুরো বিশ্বজুড়ে আমরা সবাই সংকটে আছি।’

ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্ বলেন, ‘২০১১ সাল থেকে আমরা বিশ্বের নামিদামি শিল্পীদের বাংলাদেশে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। এই বছর ৯০টিরও বেশি সেশন নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের আয়োজন। যেখানে বিশ্বের সব জায়গায় মুক্তচিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে, সেখানে এরকম আয়োজন করতে গেলে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ ধরনের আয়োজনে আমরা যেসব বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করবো তা বিশ্বের কোথাও হয়তো একত্রে করা সম্ভব নয়। নারী ইস্যু, হ্যাশট্যাগ মি টু, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা বিষয়ে আলোচনায় উঠে আসবে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা। ঢাকা লিট ফেস্টের ধারণাটি অনেক শক্তিশালী বলে আমি মনে করি। আমরা যা বলতে চাই, তা বলে যাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

সাদাফ সায্ঢাকা লিট ফেস্টের অপর পরিচালক আহসান আকবার বলেন, ‘ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবার বলেন, সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই এ বছরের আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য। অনেকেই দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, তাদেরও ধন্যবাদ জানাই। পুলিৎজার, অস্কার, কমনওয়েলথের মতো নামিদামি পুরস্কার বিজয়ীরা এবার এসেছেন, যাদের নাম নিয়ে আমি শেষ করতে পারবো না। বাংলাদেশকে বিশ্বের সাহিত্যের বাজারে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’
উল্লেখ্য, এবারের লিট ফেস্টে আলোচনা, পারফরম্যান্স চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে শতাধিক সেশন থাকছে। আরও আছে আনপ্লাগড মিউজিক কনসার্ট। সম্ভাব্য সেশনের আনুষ্ঠানিক তালিকা ইতোমধ্যেই লিট ফেস্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। www.dhakalitfest.com-এ পাওয়া যাবে প্রোগ্রাম তালিকা।

আহসান আকবারএবার লিট ফেস্টে বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে থাকছেন ভারতীয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অতুলনীয়। ঢাকা লিট ফেস্টের শেষ দিনে তিনি যোগ দেবেন এই আয়োজনে, কথা বলবেন বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের সঙ্গে।

বিদেশি অতিথিদের মধ্যে এবার অংশ নেবেন পুলিৎজার জয়ী মার্কিন সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ অ্যাডাম জনসন, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক ও কলামিস্ট মোহাম্মদ হানিফ, ব্রিটিশ উপন্যাসিক ফিলিপ হেনশের, বুকার বিজয়ী ব্রিটিশ উপন্যাসিক জেমস মিক, ভারতীয় জনপ্রিয় লেখিকা জয়শ্রী মিশরা, লন্ডন ন্যাশনাল একাডেমি অব রাইটিংয়ের পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক রিচার্ড বেয়ার্ড, ভারতীয় লেখিকা হিমাঞ্জলি শংকর, শিশুতোষ লেখিকা মিতালি বোস পারকিন্স, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এশিয়ার প্রধান হুগো রেস্টল, মার্কিন সাংবাদিক প্যাট্রিক উইন, লেখক ও সাংবাদিক নিশিদ হাজারি।

দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা লিট ফেস্টে আসছেন অস্কার জয়ী অভিনেত্রী টিলডা সুইন্টন। এবারও আসছেন তিনি নিজের লেখালেখি নিয়ে কথা বলতে। তারকাদের তালিকায় এবার যুক্ত হচ্ছেন বলিউড কাঁপানো অভিনেত্রী মনীষা কৈরালা। লিট ফেস্টে তিনি আসছেন নিজের আত্মজীবনী নিয়ে কথা বলতে। আসছেন অভিনেত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট নন্দিতা দাস। কথা বলবেন তিনি নারী অধিকার, অভিনয় জীবন ও বহুল আলোচিত হ্যাশট্যাগ মি টু আন্দোলন নিয়ে।

কত্থক নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরাবাংলাদেশের প্রায় দেড়শ’ লেখক, অনুবাদক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ এ আয়োজনে যোগ দেবেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ড. আনিসুজ্জামান, আফসান চৌধুরী, আসাদুজ্জামান নূর, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কামাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, ফখরুল আলম, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, আলী যাকের, সেলিনা হোসেন, শামসুজ্জামান খান, আনিসুল হক, কায়সার হক, খাদেমুল ইসলাম, অমিতাভ রেজা, মুন্নী সাহা, শাহনাজ মুন্নী ও নবনীতা চৌধুরীসহ অনেকে।

বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে স্বনামধন্য ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার’ লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার ঘোষণা করা হবে। একই দিনে লঞ্চ করা হবে ক্যামব্রিজ শর্ট স্টোরি প্রাইজ।

তিন দিনের এই সাহিত্য উৎসব চলবে আগামী শনিবার (১০ নভেম্বর) পর্যন্ত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা একাডেমির আয়োজনে এই উৎসব পরিচালনা করছেন কথাসাহিত্যিক এবং বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ, কবি সাদাফ সায্ সিদ্দিকী ও কবি আহসান আকবার। ঢাকা লিট ফেস্টের টাইটেল স্পন্সর হিসেবে থাকছে বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন, কি-স্পন্সর হিসেবে থাকছে ব্র্যাক ব্যাংক। গোল্ড স্পন্সর এনার্জিস, স্ট্রাটেজিক পার্টনার ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং পুরো আয়োজন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে যাত্রিক।

ঢাকা লিট ফেস্টে অংশগ্রহণের জন্য রেজিস্ট্রেশন চলছে এই ঠিকানায়- https://www.dhakalitfest.com/register/। উৎসবের শেষ দিন পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন চলবে।

আরও পড়ুন...



স্পর্শের সীমানায় বিশ্বসাহিত্য

 

 

 

/এসও/এইচআই/এমওএফ/

লাইভ

টপ