ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থা: প্রস্তুত ছয় স্পট

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৫:০৭, নভেম্বর ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫১, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

ট্রাফিক সিগন্যালএবার রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। প্রাথমিক অবস্থায় ছয়টি ইন্টারসেকশন বা স্পট চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের কাছে ওই ইন্টারসেকশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব শিগগিরই হস্তান্তর করা হবে। ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত দুইটি বিষয় ঘটবে- সময় ও বাতি নিয়ন্ত্রণ। গাড়ির চাপ অনুযায়ী দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিগন্যালের সময় ডিজিটাল ডিসপ্লেতে দেখানো হবে।  ফলে চালকরা বুঝতে পারবেন কতক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটি হলো, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থাতেই সিগন্যালের বাতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতোদিন পর্যন্ত এগুলো সেভাবে সেট করে দেওয়া হতো সেভাবেই চলতো। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকার পর রাজধানীর সিগন্যাল বাতিগুলো মেরামত করে যানবাহন চালানোর উদ্যোগ নেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এজন্য পুলিশ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে কারণে সংস্থা দুটি কাজও শুরু করেছে। কয়েকটি পয়েন্টে পরীক্ষামূলক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা সফলতার মুখ দেখেনি।

এবার পুরো সিগন্যালিং ব্যবস্থাটি রিমোটের দ্বারা নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ছয়টি ইন্টারসেকশন চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তুত হওয়া ওই স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ইন্টারসেকশন, কদম চত্বর ইন্টারসেকশন, মৎস্য ভবন ইন্টারসেকশন, কাকরাইল মসজিদ ইন্টারসেকশন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ইন্টারসেকশন ও শাহবাগ ইন্টারসেকশন।

যন্ত্রের মাধ্যমে সময় নির্ধারণ রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশ বক্স থেকে সিগন্যালবাতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এজন্য কন্ট্রোলারের ডায়াগ্রামের পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। রিমোট সিস্টেমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডায়াগ্রামের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ জন্য বিদেশ থেকে ইতোমধ্যেই সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৪টি রিমোট কেনা হয়েছে। প্রতিটি ইন্টারসেকশনের জন্য থাকছে দু’টি রিমোট। কয়েকটি যন্ত্রও পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

বিষয়টি জানিয়ে সিগন্যাল বাতিগুলো বুঝে নেওয়ার জন্য গত ৪ নভেম্বর প্রকল্প পরিচালক ও ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারকে (ট্রাফিক) পত্র দিয়েছেন। জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব সিগন্যাল বাতি স্থাপন করা হয়েছে সেগুলোর সময়ের সঙ্গে বাস্তবতার কোনও সামঞ্জস্য নেই। পরবর্তীতে সিগন্যাল বাতিগুলোতে নির্ধারণ করে দেওয়া সময়কে রিমোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই মধ্যে অনেক সময় চলে গেছে। বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের সময় অনেকগুলো সিগন্যাল বাতির সংযোগ তার কাটা গেছে। সেকারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটু সময় লাগছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ছয়টি ইন্টারসেকশন চূড়ান্ত করেছি। পুলিশকে এ বিষয়ে আমরা পত্রও দিয়েছি। এখন পুলিশ সময় চূড়ান্ত করলে আমরা সে অনুযায়ী পুরো ব্যবস্থাটি তাদের কাছে হস্তান্তর করবো।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যানজট নিরসনে ২০০১-০২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৮টি সড়ক মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু নানা ধরনের ত্রুটির কারণে নির্মাণ শেষে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এতে যে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া ছিল তার সঙ্গে বাস্তব যানবাহনের পরিসংখ্যানের কোনও সামঞ্জস্য ছিল না। সে কারণে বেশ কয়েকবার পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাফিক বাতি চালু করা হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি।

২০০৮ সালের শেষের দিকে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। সে সময় উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। শহরে দেখা দেয় ভয়াবহ যানজট। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় পরে কাউন্টডাউন বন্ধ করে আগের মতো হাত দিয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থায় ফিরে যায় ট্রাফিক পুলিশ। পরে ২০১০ সাল থেকে পাঁচ বছর মেয়াদী প্রকল্পটির দ্বিতীয় দফায় অর্থায়ন করা হয়। মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালের জুনে। কিন্তু প্রকল্পটির সুফল পায়নি নগরবাসী। পরে তৃতীয় দফায় মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশে রাজধানীর সিগন্যালবাতিগুলো চালু করার উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। তবে এতে সময়ের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ট্রাফিক পুলিশের কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রিমোটের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এজন্য সিগন্যালগুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনের ৬২টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনের ৮৮টি সিগন্যাল রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনায় আনার কাজ চলছে।

গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের ‘ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ সংক্রান্ত এক সভায় সিটি করপোরেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত ট্রাফিক সিগন্যালে স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা পুলিশকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত হয়। সভার রেজ্যুলেশন অনুযায়ী, শহরের ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে রিমোট কন্ট্রোল অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল চালু করতে হবে। এজন্য পরবর্তী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের মধ্যে সংস্থা দু’টি বিষয়টি কার্যকর করতে পারেনি। পুরো ব্যবস্থাপনাটি একটি প্রকল্পের আওতায় থাকায় প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশ থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করতে সময় লেগে যায় বলে জানায় ডিএসসিসি।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ ও কেইস প্রকল্পের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পুরো ব্যবস্থাপনাটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে যাচ্ছি। এরই মধ্যে ছয়টি ইন্টারসেকশন চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে পত্র দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সময় দিলেই এগুলো হস্তান্তর করা হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম-কমিশনার ট্রাফিক (দক্ষিণ) মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিগন্যালগুলো চালু আছে। এখন যেগুলোতে রিমোট সিস্টেম যুক্ত করা হবে সেগুলো রিমোটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অল্প সময়ের মধ্যে এর দায়িত্ব বুঝে নেবো। আশা করি তখন একটা পরিবর্তন আসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরে গাড়ির সংখ্যা অনেক বেশি। ছুটির দিনে এক রকম, আর অন্যদিনে আরেক রকম। অনেক সময় দেখা গেছে যানবাহনের এতই চাপ তখন সিগন্যালের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তখন হাতের ইশারায় নিয়ন্ত্রণ করতে হয়ে। দীর্ঘদিন ধরে সিগন্যাল সিস্টেমটি বন্ধ থাকায় মানুষের অভ্যাস নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে অভ্যস্ত করতে।’ 

/টিটি/এফএস/

লাইভ

টপ