চাহিদা থাকায় আসছে মাদক!

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:২৬, নভেম্বর ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০১, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরমাদকের বিরুদ্ধে আইন হয়েছে। বিশেষ অভিযান চলছে। প্রায় প্রতিদিনই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ীরা মারা যাচ্ছে। কক্সবাজারের কাউন্সিলর একরামসহ এপর্যন্ত তিন শতাধিক  ‘মাদক ব্যবসায়ী’ বন্দুকযুদ্ধে  মারা গেছে। মাদকপাচার বন্ধে স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠনসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এরপরও মাদকপাচার বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। প্রশ্ন উঠেছে, কী কারণে বন্ধ হচ্ছে না মাদকপাচার ? জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, চাহিদা থাকায় মাদক আসছে। মূলত এ কারণে মাদকপাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবে আগের মতো এখন আর মাদক আসছে না, অনেক কমেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মাদকপাচার বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো তাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।  মাদকের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারকে ঘিরেও অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢেলে সাজানো হচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে।  তারই অংশ হিসেবে কক্সবাজারে নৌ ইউনিটসহ মাদক অধিদফতরের একটি বিশেষ জোন স্থাপনের কাজ চলছে। নতুন আইন পাস হয়েছে সংসদে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাদকের আগ্রাসন রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি স্ট্র্যাটেজিক কমিটি করা হয়েছে। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করা হয়েছে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ে সুরক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধানদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে এনফোর্সমেন্ট কমিটি।  এই কমিটি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এছাড়া, তাৎক্ষণিক ও আকস্মিক অভিযান চালাতে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। রাজধানীর জেনেভা ক্যাম্প ও কাওরান বাজার বস্তিসহ মাদকপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স। টেকনাফেও গঠন করা হয়েছে স্পেশাল টাস্কফোর্স। ইয়াবার অনুপ্রবেশ রোধে আকস্মিক অভিযান পরিচালনার জন্য টেকনাফে স্পেশাল টাস্কফোর্স নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নতুন প্রস্তাবিত জনবল অনুমোদিত না হওয়া পর্যন্ত অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি জেলায় ১০ জন ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০ জন করে অঙ্গিভূত আনসার নিয়োগের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে বিবেচনাধীন আছে। নৌ ইউনিটসহ ৯৪ জনবল বিশিষ্ট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি বিশেষ জোন কক্সবাজার জেলায় স্থাপনের কাজ চলছে। মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্তে অভিযান চালাতে বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস স্থাপনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ২০১৭ সালে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৩২ হাজার ৮৯৩ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে। এসব মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এক লাখ ছয় হাজার ৫৪৬টি। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬২ হাজার ৪৪৭টি মামলায় ৮৩ হাজার ৩২৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত আগস্ট মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত সাত হাজার ৭৭০টি অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে তিন হাজার ৮৬২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

র‌্যাব থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত ৪ নভেম্বর (২০১৮) পর্যন্ত মাদক সংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৭ হাজার ৬১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ৪ মে থেকে চালানো বিশেষ অভিযানে ৪ নভেম্বর (২০১৮) পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে সাত জাহার ৩৯৩ জনকে। একই সময়ে চালানো র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ৯ হাজার ৮৮২ জনকে গ্রেফতার করে সাজা দিয়েছে। এসময়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৮৪ জন নিহত হয়েছে।

গত জানুয়ারি থেকে ৪ নভেম্বর (২০১৮) পর্যন্ত  ২৯ কেজি হেরোইন, ৮৫ লাখ দুই হাজার ১০৪ পিস ইয়াবা, একলাখ ১৭ হাজার ৯৮৩ বোতল ফেনসিডিল, ৪৪ লাখ ৮৯ হাজার ৩২৮ কেজি গাঁজা, বিদেশি মদ নয় হাজার এক বোতল, ১৭ লাখ ৫০ হাজার ৬৮ লিটার দেশি মদ, বিয়ার ৩৪ হাজার ৫৩২ ক্যান, নেশা জাতীয় ইনজেকশন ১৩ হাজার ২৩ পিস, আফিম সাত কেজি ও ভায়াগ্রা ট্যাবলেট ১০ হাজার পিস উদ্ধার করে র‌্যাব।

পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, গত জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগে সারাদেশে ৭৮ হাজার ৬৭৪টি মামলা করেছে পুলিশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর করেছে পাঁচ হাজার ১৯টি মামলা। বিজিবি একহাজার ২২টি ও কোস্টগার্ড ১৩টি মামলা দায়ের করেছে। পুলিশসহ সবগুলো সংস্থার হাতে গ্রেফতার হয়েছে একলাখ ১৭ হাজার ৬৪ জন। হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে ৩২৩ কেজি। পুরিয়া উদ্ধার করা হয়েছে একলাখ ৮৫ হাজার ৬১০টি। দুই লাখ ৮৫ হাজার ৫৭ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে দুই কোটি ৮৫ লাখ ৮৯ হাজার ৬৬৭ পিস।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদকের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি— এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনই সরকারও মাদকপাচার প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে মাদকের সরবরাহ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা কঠিন কাজ। তবে আমাদের অপারেশনগুলো চলছে। একইসঙ্গে মানুষকে সচেতন করার কাজও চালাচ্ছি। আশা করছি, মানুষ এটা প্রতিরোধ করবে। ’

মাদক তথা ইয়াবা পাচার প্রতিরোধে নানা উদ্যোগের পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের বিশেষ জোন গঠনের উদ্যোগের কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের মাদক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আতিকুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় নৌ ইউনিটসহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি বিশেষ জোন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে। একইসঙ্গে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন, আলোচনা সভা ও সেমিনার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পোস্টার, লিফলেট, স্টিকার, স্যুভেনির প্রকাশ ও বিতরণের কাজও অব্যাহত আছে।’

নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও মাদক পাচার বন্ধ হচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যবসা ভালো, চাহিদা আছে। সেই কারণেই মাদক আসছে। তবে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের কারণে মাদকের সরবরাহ এখন আগের তুলনায় অনেক কমেছে।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মাদকপাচারের সঙ্গে জড়িত কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা বলছেন কেন, মাদকপাচারের সঙ্গে অনেকেই জড়িত। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সবার বিরুদ্ধেই আমরা ব্যবস্থা নেবো।’   

/জেইউ/এপিএইচ/

লাইভ

টপ