রাজধানীর ৬টি ট্রাফিক সিগন্যাল দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০২:৪৮, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০৩, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

ট্রাফিকরাজধানীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রিমোট কন্ট্রোল্ড ব্যবস্থা চালু করতে আপাতত ৬টি সিগন্যাল বাতি মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক ডিভিশনের কাছে হস্তান্তর করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরমধ্যে গতকাল বুধবার (৫ ডিসেম্বর) দুটি সিগন্যাল বাতি হস্তান্তরের কথা থাকলেও একটি করা হয়েছে। হস্তান্তর হওয়া ওই বাতিটি হচ্ছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সিগন্যাল। অন্যটির কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় তা হস্তান্তর করা যায়নি। ফলে বাকি থাকা ৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি আজ বৃহস্পতিবার (৬ ডিসেম্বর) হস্তান্তরের কথা রয়েছে। বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনকারী প্রকল্পের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের পরিচালক ও ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম।

এর আগে গত ৪ নভেম্বর প্রকল্প পরিচালক ও ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম নগরীর ৬টি ট্রাফিক সিগন্যাল রিমোট কন্ট্রোল পরিচালনার জন্য বুঝে নিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনারকে (ট্রাফিক) চিঠি দেন। ওই স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ইন্টারসেকশন, কদম চত্বর ইন্টারসেকশন, মৎস্য ভবন ইন্টারসেকশন, কাকরাইল মসজিদ ইন্টারসেকশন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ইন্টারসেকশন ও শাহবাগ ইন্টারসেকশন। এর মধ্যে বুধবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ইন্টারসেকশন সিগন্যাল ও কাকরাইল মসজিদ সিগন্যাল হস্তান্তরের কথা থাকলেও শুধু
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ইন্টারসেকশন মোডের সিগন্যাল বাতি হস্তান্তর করতে পেরেছে ডিএসসিসি। কাকরাইল মসজিদ মোডের বাতিগুলোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত বাতিগুলো হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বুধবার (৫ ডিসেম্বর) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শুরুতে যে ছয়টি স্থান বুঝে নেওয়ার জন্য ডিএমপিকে চিঠি দিয়েছি সেগুলোর মধ্যে আজ (বুধবার) দুটি স্থান পুলিশকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু একটি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের সরেজমিন পরিচালনায় যাতে কোনও সমস্যা না হয় সেজন্য প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। অন্য আরও একটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বাকি থাকা ৫টি সিগন্যাল বাতি আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

তিনি জানান, বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে করা হচ্ছে না, সবগুলো চালু হলে একযোগে আনুষ্ঠানিকতা করা হবে।

রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত দুইটি বিষয় ঘটবে, তা হচ্ছে সময় ও বাতি নিয়ন্ত্রণ। গাড়ির চাপ অনুযায়ী দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিগন্যালের সময় ডিজিটাল ডিসপ্লেতে দেখানো হবে। ফলে চালকরা বুঝতে পারবেন কতক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটি হলো, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থাতেই সিগন্যালের বাতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতোদিন পর্যন্ত এগুলো যেভাবে সেট করে দেওয়া হতো সেভাবেই চলতো।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকার পর রাজধানীর সিগন্যাল বাতিগুলো মেরামত করে পুরো সিগন্যালিং ব্যবস্থাটি রিমোটের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে যানবাহন চালানোর উদ্যোগ নেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এজন্য পুলিশ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে কারণে সংস্থা দুটি কাজও শুরু করেছে। এর আগে কয়েকটি পয়েন্টে পরীক্ষামূলক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতিতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা সফলতার মুখ দেখেনি।

তবে এবার যন্ত্রের মাধ্যমে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের জন্য এরই মধ্যে কন্ট্রোলারের ডায়াগ্রামের পরিবর্তন আনা হয়েছে। রিমোট সিস্টেমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডায়াগ্রামের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ জন্য বিদেশ থেকে ইতোমধ্যেই সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৪টি রিমোট কেনা হয়েছে। প্রতিটি ইন্টারসেকশনের জন্য থাকছে দুটি রিমোট। কয়েকটি যন্ত্রও পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম-কমিশনার, ট্রাফিক (দক্ষিণ) মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিএসসিসি ৬টি সিগন্যাল বাতি বুঝে নেওয়ার জন্য আমাদের চিঠি দিয়েছেন। আমরা সেগুলো বুঝে নেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কমিটি মাঠপর্যায়ে বিষয়গুলো বুঝে নিতে কাজ করছে।'

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যানজট নিরসনে ২০০১-২০০২ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৮টি সড়ক মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের মাধ্যমে সিগন্যাল বাতিগুলো স্থাপন করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু নানা ধরনের ত্রুটির কারণে নির্মাণ শেষে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এতে যে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া ছিল তার সঙ্গে বাস্তব যানবাহনের পরিসংখ্যানের কোনও সামঞ্জস্য ছিল না। সে কারণে বেশ কয়েকবার পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাফিক বাতি চালু করা হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি।

২০০৮ সালের শেষের দিকে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়। সে সময় উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। শহরে দেখা দেয় ভয়াবহ যানজট। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারায় পরে কাউন্টডাউন বন্ধ করে আগের মতো হাত দিয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থায় ফিরে যায় ট্রাফিক পুলিশ। পরে ২০১০ সাল থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির দ্বিতীয় দফায় অর্থায়ন করা হয়। মেয়াদ শেষ হয় ২০১৪ সালের জুনে। কিন্তু প্রকল্পটির সুফল পায়নি নগরবাসী। পরে তৃতীয় দফায় মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের নির্দেশে রাজধানীর সিগন্যালবাতিগুলো চালু করার উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। তবে এতে সময়ের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ট্রাফিক পুলিশের কাছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রিমোটের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এজন্য সিগন্যালগুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনের ৬২টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনের ৮৮টি সিগন্যাল রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনায় আনার কাজ চলছে।
গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের ‘ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ সংক্রান্ত এক সভায় সিটি করপোরেশন কর্তৃক বাস্তবায়িত ট্রাফিক সিগন্যালে স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা পুলিশকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত হয়। সভার রেজ্যুলেশন অনুযায়ী, শহরের ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে রিমোট কন্ট্রোল অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল চালু করতে হবে। এজন্য পরবর্তী ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের মধ্যে সংস্থা দুটি বিষয়টি কার্যকর করতে পারেনি। পুরো ব্যবস্থাপনাটি একটি প্রকল্পের আওতায় থাকায় প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশ থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করতে সময় লেগে যায় বলে জানায় ডিএসসিসি।

 

/আইএ/

লাইভ

টপ