সংসদে আমাদের কথা শুনতে হবে, মানতে হবে: জিএম কাদের

Send
সালমান তারেক শাকিল
প্রকাশিত : ২১:৪৫, জানুয়ারি ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৫, জানুয়ারি ২২, ২০১৯

 

সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরজাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেছেন, ‘জাতীয় সংসদে সরকারি দলের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। আমাদের কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। আমাদের কথা শুনতে হবে, মানতে হবে এবং বিবেচনা করতে হবে। তাহলে সংসদটা শুধু প্রাণবন্ত হবে না, কার্যকরও হবে।’



সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে জিএম কাদের এসব কথা বলেন। এই কথোপকথনে তিনি জাতীয় পার্টির সংগঠন, ভবিষ্যতের কার্যক্রম, গঠনতন্ত্র সংশোধন সম্পর্কে কথা বলেন।
জিএম কাদের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে অষ্টম, নবম এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিএম কাদের।
গত ১৮ জানুয়ারি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০১ক ধারার ক্ষমতাবলে জিএম কাদেরকে নিজের অবর্তমানে বা চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকাকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করেন। এর আগে ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জাতীয় পার্টির কর্মী সম্মেলনে প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন এরশাদ। এ নিয়ে দলের ভেতর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হলে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন জাপা চেয়ারম্যান। এই মুহূর্তে দলে এসব নিয়ে আর কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই বলে দাবি করেন জিএম কাদের।
বাংলা ট্রিবিউন: সংসদে জাতীয় পার্টির ভূমিকা কেমন হবে?
জিএম কাদের: আমরা সরকারে বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবো। বিরোধী দল মানে হলো, পৃথিবীর সব দেশেই বিরোধী দল সরকারের সহায়ক শক্তি। সরকারকে তাদের কাজের যদি কোনও ভুল-ত্রুটি থাকে সেগুলোকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। জনগণের পক্ষ থেকে যেগুলো বলতে চাওয়া হয়, সেগুলো বিরোধী দলের মুখ থেকেই আসে। সরকারকে জানিয়ে দেয় জনগণ এটা বলছে খারাপ, এটা ভালো। তাদের নিজেদের কাছে যদি কোনও কাজ থাকে, যেটি ক্ষতি করতে পারে দেশের জন্য বা জনগণের জন্য, সেগুলো সরকারের সামনে তুলে ধরা।
বাংলা ট্রিবিউন: এ ক্ষেত্রে তো সরকারি দলের মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ…
জিএম কাদের: সরকার যখন একটি পজিটিভ রেসপন্স করবে, ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে’, তাহলে তখন সংসদ কার্যকর হয়। ওখানেও সরকারি দলের ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। আমাদের কেউ কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। এটাকে শুনতে হবে, মানতে হবে এবং বিবেচনা করতে হবে। তাহলে সংসদটা শুধু প্রাণবন্ত হবে না, কার্যকরও হবে। যদি কথা বলতে না দেওয়া হয় তবে সংসদটা কার্যকর হয় না। দুইটা জিনিস দরকার, সরকারকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে তাহলে সংসদ প্রাণবন্ত হবে। আর দুই নম্বর বিষয় হলো সংসদে কথাগুলোকে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: দলের গঠনতন্ত্র নিয়ে আপনি সংস্কারের কথা বলেছেন।
জিএম কাদের: গঠনতন্ত্রটা যেভাবে করা হয়েছে তারপরও দেখা যাচ্ছে অনেক সময় বেশি সদস্য প্রেসিডিয়ামে যুক্ত হচ্ছেন।

বাংলা ট্রিবিউন: এখন প্রেসিডিয়াম সদস্য কত জন?
জিএম কাদের: আমাদের গঠনতন্ত্রে ৪১ জন করে, এখন সদস্য তার চেয়ে বেশি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো দায়িত্বে এসেছেন, সে ক্ষেত্রে কি নতুন কিছু ঘটতে পারে আর প্রেসিডিয়ামের সংখ্যা ৪১ থেকে থেকে কি কমতে পারে?
জিএম কাদের: আমরা চাচ্ছি, সবাই যদি রাজি হয়। ডিপেন্ডস অন দ্য প্রেসিডিয়াম। এজন্য একটা কমিটি করবো, কমিটি একটি প্রস্তাব তৈরি করবে, তারপর সেটি প্রেসিডিয়ামে পাস হবে। এরপর এটি কাউন্সিলিংয়ে নিয়ে পাস হবে। একই ব্যক্তি হয়তো ৩-৪টা পোস্ট নিয়ে আছে, সেন্ট্রাল একটি, জেলায় একটি পোস্ট। আমার ইচ্ছা আছে এগুলোকে ঢেলে সাজানোর। একটা ডিসিপ্লিন আনা উচিত। শৃঙ্খলার একটু ঘাটতি আছে আমাদের। অনেক কিছুই অনেকেই করে যাচ্ছে পরবর্তীতে এটি সাংগঠনিকভাবে দ্বৈততা তৈরি করে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনাদের কাউন্সিলের সময়সীমা কবে?

জিএম কাদের: শেষ কাউন্সিল হয়েছে তিন বছর আগে এপ্রিল মাসে। এবার এপ্রিলে শেষ হয়ে যাবে তিন বছর। যদি সময়মতো করতে হয় তবে এপ্রিল-মে এরকম সময়ে করতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: এবার কি মনে হয় সময়মতো কাউন্সিল করতে পারবেন?
জিএম কাদের: এবার তো ইলেকশনটা হয়ে গেলো। আমার মনে হয়, একটা স্ট্যাবল পজিশনে চলে আসতে পেরেছি। এখন রাজনীতির এমন একটা স্তরে চলে আসছে, আমাদের মনে হয়, এটা খুব বেশি একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
বাংলা ট্রিবিউন: দলের মধ্যে নতুন কোনও কার্যক্রম শুরু করার ইচ্ছা আছে আপনার?
জিএম কাদের: ইলেকশন হয়ে গেছে। এরই মধ্যে আমাদের বড় ধরনের কোনও কর্মকাণ্ড নেই, এই মুহূর্তে নেই বা ৩-৪ মাসের মধ্যে কোনও সম্ভাবনা দেখি না। নরমাল রুটিন হিসেবে মনে হয় এটি করা যাবে।
বাংলা ট্রিবিউন: এই সপ্তাহে কি কোনও মিটিং ডাকবেন?
জিএম কাদের: আমি চাচ্ছি যে, সাংগঠনিক কাজ শুরু করতে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি আসলেই কোন জায়গাটা ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন, এই বিষয় নিয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে চাই পাঠকদের।
জিএম কাদের: সংগঠনকে সুশৃঙ্খল করা, এ জন্য গঠনতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রস্তাব করা। গঠনতন্ত্র মোতাবেক যেন পার্টি চলে, সে হিসেবে কাজ করা। স্পেশাল পাওয়ার কম ব্যবহার করা।
বাংলা ট্রিবিউন: রওশন এরশাদকে নিয়ে একটি বলয়ের কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে চালু আছে। এবার তো দেখলাম দলের চেয়ারম্যান বিরোধী দলের নেতা, আপনাকে উপনেতা বানালেন, সেই জায়গায় আমরা বলয় বলে যাকে চিহ্নিত করি, সেখানে কি কোনও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে? আপনি কি কোনও চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
জিএম কাদের: রওশন ভাবিকে (রওশন এরশাদ) নিয়ে অনেকেই ২০১৪ সালে নির্বাচনের সময় নানা কিছু করেছেন। এখন তো আমরা সবাই মোটামুটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। নির্বাচিত হয়ে এসেছি। তিনি নিজেও বিভিন্ন জায়গায় অনেক ঘোষণা দিয়েছেন, প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে কাজ করবেন। এমনিতেও তিনি দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে রেফারেন্স করেছেন আমাকে। তাকে ব্যবহার করে কিছু লোক অনেক সময় কিছু করতে চায়। তবে সেই হিসেবে আমি এটাকে বড় কোনও চ্যালেঞ্জ মনে করছি না।
বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে ২-৩ মাসের মধ্যে আপনি কার্যক্রমগুলো গুছিয়ে আনার চেষ্টা করবেন?
বড় ভাই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে জিএম কাদেরজিএম কাদের: আমার সংগঠনের জন্য, জাতীয় পার্টির জন্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে গুছিয়ে আনা এবং শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।
বাংলা ট্রিবিউন: সংসদ প্রসঙ্গে জানতে চাই, দলীয় সাংসদদের কথা বলার বিষয়টি কি সমন্বিতভাবে করা হবে? সংখ্যায় তো বিরোধী দলের প্রতিনিধি অনেক কম
জিএম কাদের: সংসদকে প্রাণবন্ত করতে হলে সুযোগ দিতে হবে কথা বলার, কার্যকর করতে গেলে তাদের কথা সরকারকে শুনতে হবে। এ দুইটি জিনিস যদি হয়, তাহলে সংখ্যাটা বড় কথা নয়, এই সমস্ত বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো, যেগুলো মনে করছি সরকারের স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে না। বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: এটার ক্ষেত্রে তো নিশ্চয় একটা সমন্বয়তা নিয়ে আসবেন, কোন বিষয়ে কে কীভাবে কথা বলবে?
জিএম কাদের: অনেক সময় দেখা যায় একটা বিষয়ের ওপরে ২০টির বেশি পয়েন্ট আছে, যার সবগুলোই তোলা উচিত। এটা বলা উচিত সাংবাদিকদের অসুবিধা হচ্ছে। এটা বলতে গেলে একজনকে তো আর ২০টি পয়েন্ট বলার সময় দেবে না। একজনকে ৫ মিনিট বা ৭ মিনিট সময় দেবে। তখন আমরা বলি যে, ‘তিনজন, চারজন, পাঁচজন আপনি এই কয়েকটা পয়েন্ট তোলেন,’ আমি এই কয়েকটা পয়েন্ট তুলি, এভাবে কাভার করা হয়। এটার জন্য আগে থেকে প্ল্যান করার কিছু নেই। সরকারের পক্ষ থেকে কোনও প্রস্তাব আসলে সেটা জনগণের কোনও কথা আছে কিনা, আমাদের পক্ষ থেকে কোনও কথা আছে কিনা, এই কাজটি জনগণের জন্য ক্ষতিকারক হবে কিনা, সেই কথাগুলো আমরা তুলে ধরবো।
বাংলা ট্রিবিউন: এরই মধ্যে আপনার দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা ১৪ দলের শরিকদের আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলের আসনে বসার জন্য, তাদের কাছ থেকে কি কোনও সাড়া পাচ্ছেন?
জিএম কাদের: না, সাড়া দেওয়ার কিছু নেই। সংসদে কিন্তু ক্যাবিনেট মিনিস্টার ছাড়া আর বাকিদের বলা হয় ‘প্রাইভেট মেম্বার’। তারা সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। অন্যান্য দেশে সরকারের বিরুদ্ধে ভোটও দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের দেশে পারেন না।
বাংলা ট্রিবিউন: জাপা চেয়ারম্যান তো ২০ জানুয়ারি থেকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার অনুপস্থিতিতে আপনার দল পরিচালনায় কোনও সমস্যা হতে পারে, আপনি কি কারও অসহযোগিতার আশঙ্কা করছেন?
জিএম কাদের: আমি মনে করি না। অসুবিধার কিছু নেই। পার্লামেন্টের কথা বললে, যে কেউ কথা বলতে পারেন। ভেতরের কাজের মধ্যে, আমাদের পার্টির যে কাজ, সেটা তো চলবেই।
বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপি নিয়ে কিছু বলবেন কিনা পার্লামেন্টে আসার ব্যাপারে?
জিএম কাদের: অন্য দল নিয়ে কথা বলতে চাই না। তারা যেটা ভালো মনে করবে, সেটাই করবে।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে ধন্যবাদ।
জিএম কাদের: বাংলা ট্রিবিউনকেও অশেষ ধন্যবাদ।

/এইচআই/

লাইভ

টপ