ঠিকানাবিহীন আসামি লিংকনের আসল নাম লিয়ন

Send
দীপু সারোয়ার
প্রকাশিত : ১০:০১, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০১, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯

প্রথম আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধার মামলা-পর্ব ০৪ (ইনফোগ্রাফ) ২০০৩ সালের ২৯ নভেম্বর কুড়িলে আর্জেস গ্রেনেডসহ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় যে ছয় ব্যক্তির নামে মামলা হয় তার একজনের পরিচয় আজও রহস্যাবৃত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি’র দেওয়া মামলাটির অভিযোগপত্রে সন্ত্রাসী হিসেবে পাঁচ জনের পরিচয় উল্লেখ করা হলেও অপর একজনের শুধু নাম উল্লেখ করা হয়েছে। লিংকন নামের এই সন্ত্রাসী কে তা সম্পর্কে আর কোনও তথ্য নেই সেখানে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আসামি রুবেলের কার্যবিধি ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, আলামত পর্যালোচনা ও পারিপার্শ্বিকতায় রুবেল, মানিক, জাহাঙ্গীর, মুকুল, নুরু ও লিংকনদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনের চার ধারায় অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত। এর মধ্যে আসামি লিংকনের নাম, ঠিকানা পাওয়া যায়নি। লিংকনের সঠিক নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।’

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা যায়, আসামি রুবেলের বরাত দিয়ে যে লিংকনের তথ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে তার প্রকৃত নাম লিয়ন। প্রায় ৯ বছর আগে কড়াইল টিঅ্যান্ডটি মাঠ থেকে উদ্ধার হয় লিয়নের লাশ। এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদ থেকে গ্রেফতার হয় সে। লিয়নের গ্রামে বাড়ি চট্টগ্রামে। মহাখালী, কড়াইল বস্তি, বাড্ডা, গুলশান ও বনানী এলাকায় পেশাদার খুনি হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। মামলার অন্যতম আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল এই লিয়ন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী মুকুলের কাছে কেন অস্ত্র-গ্রেনেড?

দেশে প্রথম আর্জেস গ্রেনেড ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ উদ্ধার মামলার অন্যতম আসামি মুকুল। বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা আর্জেস গ্রেনেড বা প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার করতো না। তারপরও মুকুল ও তার সঙ্গীদের কাছে কারা এসব পৌঁছে দিয়েছিল–এমন প্রশ্নের জবাবে মামলার ছায়া তদন্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেনেড, বিস্ফোরকের গন্তব্য ছিল উলফা ও হুজি। কুড়িল ছিল মূলত ট্রানজিট পয়েন্ট। সময়মতো হুজি ও উলফার কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো গ্রেনেড ও বিস্ফোরকগুলো। কিন্তু তার আগেই পুলিশের নজরে এলে তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীরা গ্রেনেড ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার না করলেও একে-৪৭ রাইফেল ও পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলবার ব্যবহার করে তারা। খুনোখুনি ও ভয়ভীতিতে রিভলবার ব্যবহার হলেও একে-৪৭ রাইফেল প্রকাশ্যে ব্যবহার করে না সন্ত্রাসীরা। তবে এই অস্ত্রটি নিজেদের কাছে রাখতে পছন্দ করে তারা। ক্ষমতা ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এই অস্ত্রটিকে মূল্যায়ন করে সন্ত্রাসীরা।5

অস্ত্র-বিস্ফোরক উদ্ধার মামলার আসামি মানিক কি আসলেই ঘটনায় জড়িত?

ক-৯৬, কুড়িল বিশ্বরোড, বারিধারা, বাড্ডায় ‘তুলির পরশ’ নামে সাইনবোর্ড লেখার দোকানটির মালিক মেহেদী হাসান ওরফে মানিক। অন্যতম আসামি সে। ‘তুলির পরশ’ দোকানটি এখন আর নেই। আর মানিকও এখন সাইনবোর্ড লেখেন না। কুড়িলে ছবিঘর নামে একটি ফটো স্টুডিও আছে তার। মানিক বাংলা ট্রিবিউনের কাছে দাবি করেছে, ঘটনার সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। আর আসামি রুবেলের জবানবন্দি ও অভিযোগপত্রে তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তার সবটাই সত্যের অপলাপ বলেও মন্তব্য তার। তবে কি ঘটনাচক্রে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে মানিককে?

‘৩০ নভেম্বর, ২০০৩। সকাল ৭টা কী সাড়ে ৭টা হবে তখন। ক-৯৬/১, কুড়িল, কাজী বাড়ি, বাড্ডা-এই ঠিকানায় ঘুমিয়ে ছিলাম। ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে যায়। দেখি পুলিশ। ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশের গাড়িতে তোলা হয় আমাকে। এরপর বাড্ডা থানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে। পরে পাঠানো হয় কারাগারে।’

দেশে প্রথম আর্জেস গ্রেনেড ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ উদ্ধার মামলার অন্যতম আসামি মেহেদী হাসান ওরফে মানিক বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এসব জানান। মামলায় আলোচিত সাইনবোর্ড লেখার দোকান ‘তুলির পরশ’র মালিক তিনি।

মানিক বলেন, ‘তুলির পরশ’ কোনও সুরক্ষিত দোকান ছিল না। একটা কালিঝুলি মাখা খোলামেলা জেনারেটরের ঘর ছিল। সেখানে বসেই সাইনবোর্ড লিখতাম আমি। আমার দোকানে অনেকেই আসা-যাওয়া করতো। তাদের সবাইকেই যে আমি চিনতাম তা না। থাকতাম ‘তুলির পরশ’-এর দু’বাড়ি পরে। গ্রেফতারের সময় কিছুই বুঝতে পারিনি। কেন, কার নির্দেশে আমাকে গ্রেফতার করা হলো তার কিছুই জানতাম না। কোনও অঘটনের সঙ্গে জড়িত থাকলে কি কেউ বাসায় এসে ঘুমিয়ে থাকতে পারে–প্রশ্ন রাখেন মানিক।’

মেহেদী হাসান ওরফে মানিক জানান, ‘কারাগারে একই সেলে আমাকে ও রুবেলকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমরা কেউই কাউকে চিনতাম না, জানতাম না সে আর আমি একই মামলার আসামি। ঘটনার এক দেড়মাস পর সিআইডি থেকে আমাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। সেখানেই জানতে পারি রুবেল আর আমি একই মামলার আসামি। সেখানে আমি অনেক কান্নাকাটি করি। বলি, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও তোমাদের কারণেই ফেঁসে গেছি আমি। রুবেল বলে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন এসব ভুলে যাওয়াই ভালো।’  

মানিক বলেন, ‘রুবেল, মুকুল, নুরু ও লিংকন-কারও সঙ্গে কখনোই আমার কোনও পরিচয় ছিল না। আমি শুধু জাহাঙ্গীরকে চিনতাম। সে রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী ছিল। রুবেল ও মুকুলের নাম জানতাম। মহাখালী, কুড়িল, কড়াইল বস্তি, টিঅ্যান্ডটি মাঠ, বাড্ডা-এসব এলাকায় মুকুল ও রুবেলের নাম কে না জানে। আমিও জানতাম। তবে সরাসরি পরিচয় ছিল না। জাহাঙ্গীরকে ছাড়া মামলার অন্য আসামিদের সঙ্গে আমার কোনও পরিচয় ছিল না।’2

‘কুড়িলে অস্ত্র-গ্রেনেড উদ্ধার মামলায় জড়িয়ে প্রায় ষোল বছর ধরে দুর্ভোগের মধ্যে আছি। প্রায় পাঁচ বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। আমি নিরাপরাধ হলেও পুলিশের তদন্ত আমাকে অপরাধী বানিয়ে ছেড়েছে–বলেন মনিক।’

মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও রুবেলের জবানবন্দিতে মানিকের নাম থাকলেও মানিক বলছেন, ঘটনাস্থল ‘তুলির পরশ’ তার দোকান হলেও অস্ত্র-গ্রেনেডের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। মানিক এখন সাইনবোর্ড লেখেন না। কুড়িলেই ছবিঘর নামে একটি ফটোস্টুডিও আছে তার। মানিকের দাবি দেশে প্রথম আর্জেস গ্রেনেড ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ উদ্ধার মামলার আসামি হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে কোন মামলাও ছিল না। আর মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় দুর্বিসহ যন্ত্রণার মধ্যে আছেন তিনি।

মানিকের দাবি যাই হোক না কেন মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আসামি মানিক ও রুবেলের গ্রামের বাড়ি একই জেলা। তাদের ঢাকার ঠিকানা কাছাকাছি। রুবেলের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার সুবিদপুর পাটোয়ারি বাড়ি। ঢাকার ঠিকানা মহাখালীর টিবি হাসপাতাল স্টাফ কোয়ার্টার (এম/৯, ০৫ নং ঘর)। আর মানিকের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব থানার নন্দলালপুরে। ঢাকার ঠিকানা বাড্ডার ক-৯৬/১, কুড়িল কাজী বাড়ী।

মামলা দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে আইনজীবীর বিশ্লেষণ:

অ্যাডভোকেট তুহিন হাওলাদার বলেন, কুড়িলে অস্ত্র- গ্রেনেড উদ্ধার মামলা তদন্তে ত্রুটি অনেক। এই মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও আসামির দেওয়া জবানবন্দিতে গড়মিল আছে। এই গড়মিলে সুবিধা পাবে আসামি পক্ষ। আবার দেখা যাচ্ছে মামলার সাক্ষী ২৭ জন। অথচ আদালতে মাত্র পাঁচজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই মামলা বিচারে আরও একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আদালত পরিবর্তন। ইতোমধ্যেই বেশ ক’বার আদালত পরিবর্তন হয়েছে। এক আদালতে যদি একটা বিষয়ে শুনানি নেওয়া হয় বা সাক্ষী নেওয়া হয়, জেরা করা হয় সেক্ষেত্রে আদালত পরিবর্তন বলে নতুন বিচারককে পুরনো বিষয়গুলো নতুন করে দেখতে হয়, সময় নিতে হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে অপরাধীরা এই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে ফায়দা নিতে পারে বা নিচ্ছে।

আরও পড়ুন- 

বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেও রুবেলের ছবি নেই পুলিশের কাছে


১৫ বছরেও শেষ হয়নি প্রথম আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধার মামলার বিচার

/টিএন/

লাইভ

টপ