চাকরি পাওয়ার জন্য বই বের করেছিলেন সেলিনা হোসেন!

Send
জনি হক
প্রকাশিত : ১৯:০০, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৭, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

বাংলা ট্রিবিউন ফেসবুক লাইভে বন্যা মির্জা ও সেলিনা হোসেনকথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এখন দেশের স্বনামধন্য লেখক। তবে লেখক হওয়ার জন্য বই বের করেননি তিনি। বরং তার লক্ষ্য ছিল চাকরি পাওয়া! সোমবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বাংলা ট্রিবিউন ফেসবুক লাইভে স্মৃতি হাতড়ে একথা বলেন তিনি। এই আয়োজন উপস্থাপনা করেন অভিনেত্রী বন্যা মির্জা। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করছে পাঠক সমাবেশ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী থাকাকালে বেশকিছু গল্প লিখেছিলেন সেলিনা হোসেন। সেগুলোর সংকলন নিয়ে বের হয় তার প্রথম গ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’। তবে লেখক হওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না তার, “আমার শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হাফিজ। তিনি একদিন বললেন, ‘তোমার যত গল্প আছে সেগুলো নিয়ে একটি বই বের করো। তাতে তোমার চাকরি পেতে সুবিধা হবে।’ আমিও ভাবলাম, বই থাকলে সিভিতে আলাদা মাত্রা যোগ করবে। কিন্তু আমার বই বের করবেন কে? আমি তখন সবে লিখছি। স্যার ধমক দিয়ে বললেন, ‘কেউ বের করবে না। যাও বাবার কাছে যাও, টাকা আনো।’ তারপর বাবার কাছে গেলাম। বাবা-মা দু’জনই বললেন, একটা চাকরির জন্য বই, তাহলে তো ভালোই। হোক একটা বই।”

লেখক হিসেবে সেলিনা হোসেনের শুরুটা ১৯৬৪ সালে। তখন তিনি এইচএসসির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ওই বছর রাজশাহী শহরের বিভাগীয় কমিশনার একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। এতে তার লেখা গল্প প্রথম হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘লেখালেখি আমার গভীর সাধনার ব্যাপার। শৈশব-কৈশোরে একটি অসাধারণ সোনালি ভুবন পেয়েছিলাম। বাবার চাকরির সূত্রে বগুড়ার করতোয়া নদীর ধারে বেড়ে উঠেছি। অবাধ প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে বসবাস করতাম। গাছপালা, নদী, খাল-বিল, মাছ ধরা পাখি দেখাসহ কত কিছু দেখেছি। মনে হলো, এতকিছু নিয়ে আমি বসে থাকবো কেন, একটু লিখি তো!’

১৯৭০ সালে ঢাকায় এসে বিজ্ঞাপন দেখে দুই জায়গায় চাকরির আবেদন করেন সেলিনা হোসেন। দুটো চাকরিই হলো। বইটি থাকায় সত্যিই সুবিধা হয়েছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে তিনি দেখেন বোর্ডে বসে আছেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, “সেখানেই তাকে দেখেছিলাম, আর কোনোদিন দেখা হয়নি। তিনি আমাকে বললেন, তোমার স্যার আমাকে তোমার বইটা দিয়েছিলেন। আমি সেটি টেলিভিশনে রিভিউ করেছি।’ বইয়ের সুবাদেই পরিচিতি পেয়েছিলাম সেখানে।”

বাংলা একাডেমিতে ১৯৭০ সালে চাকরিতে যোগ দেন সেলিনা হোসেন। সেখানে ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক কবির চৌধুরী, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. আবদুল্লাহ আল মতি শরফুদ্দিন। তাদের সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পাত্তাই পায়নি, ‘তবে বইটা সহায়ক হয়েছে। আমি লেখক, এটা সবাই বিবেচনা করেছেন।’

তখনকার বইমেলা আর এখনকার বইমেলার পরিসর প্রসঙ্গে সেলিনা হোসেন বলেন, ‘তখন মুক্তধারার প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির মাঠে মাদুর বিছিয়ে বই দেখাতেন। স্বল্প পরিসরে তিনি শুরুটা করেছিলেন। আমরা ঘাসের ওপর উবু হয়ে বই দেখতাম। এখন এর পরিসর এত বেড়েছে যে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে যেতে হয়েছে মেলা। প্রকাশক যেমন বেড়েছে, লেখক-পাঠকের সংখ্যাও বেড়েছে। বইমেলা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। আমি মনে করি, একুশের শহীদদের স্মরণে সাংস্কৃতিক বোধের জায়গা ধরে রাখতে এই আয়োজন।’

এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বেরিয়েছে সেলিনা হোসেনের দুটি উপন্যাস, একটি গল্পসংকলন ও রচনাবলী। উপন্যাস দুটি হলো ‘বিষণ্ন শহরের দহন’ ও ‘সময়ের ফুলে বিষপিঁপড়া’। গল্প সংকলনটির নাম ‘রক্তফুলের বরণ ডালা’।

‘বিষণ্ন শহরের দহন’ উপন্যাসে পিলখানা বিদ্রোহের আলোকে একটি পরিবারের দহনকে তুলে ধরেছেন সেলিনা হোসেন। আর ‘সময়ের ফুলে বিষপিঁপড়া’কে একটি প্রেমের উপন্যাস হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার কথায়, ‘জীবনে একটু বাধাগ্রস্ত হলেই যে সেটা বেঁচে থাকার সত্যকে অস্বীকার করে কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে তা নয়। প্রতিবন্ধকতার মুখেও ভালোবাসার ভেতর জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করা যায়।’

সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ ও আখতারুজ্জামানের পরিচালনায় ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ ছবি দুটি তৈরি হয়েছে। এছাড়া ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ নিয়ে নাটক হয়েছে।

একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কারসহ অনেক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন সেলিনা হোসেন। এত প্রাপ্তির পর কী পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে? তার উত্তর, ‘একটি ভালো বই লেখার আকাঙ্ক্ষা আছে। আমার মনে হয়, আরেকটা নতুন কিছু করার জন্য তৈরি হচ্ছি। আরেকটা কিছু করার স্বপ্ন তো থাকতেই পারে। ভালো বই লিখে ফেলেছি এটা মৃত্যু পর্যন্ত বলবো না।’

/জেএইচ/

লাইভ

টপ