বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার প্রতিনিধিত্বের সুযোগ তৈরির পরামর্শ

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:২১, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৫৩, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

single pic template-1 copyবাংলা ভাষা নিজ দেশেই অবহেলিত। পাশাপাশি বিদেশি ভাষাও এখানে ভালোভাবে শেখানো হয় না। নানা কারণে বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য এখনও বিদেশিদের কাছে পৌঁছায়নি। বাংলা ভাষাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিদেশে বাংলা ভাষাকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আর সেজন্য মানসম্পন্ন অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে বিদেশে বেশি করে পরিচিত করানোকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন আলোচকরা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

2বৈঠকিতে জাতীয় অধ্যাপক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষে ভাষা কমিশন অবশ্যই স্থাপন করতে হবে। এটি শুধু বাংলা ভাষার জন্য নয়। আমাদের দেশে কোনও ভাষাই ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে না। ইংরেজি ভাষা কি ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে? নাকি মাদ্রাসাগুলোতে আরবি ভাষা ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে?

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেদের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না। সেখানে আমাদের আশেপাশে অন্যান্য জাতিসত্তার লোক আছে, তাদের ভাষাকে কীভাবে গুরুত্ব দেবো? আমরা কি সাঁওতাল ভাষাকে গুরুত্ব দেবো? অথচ সাঁওতালরা এদেশের আদি সন্তান। একথা আমরা ভুলে যাই। তাদেরকে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখি, সেটি করা মোটেও উচিত নয়। আমরা যদি মনে করি, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠালেই আমার সন্তানেরা মানুষ হবে, গুণী হবে, জ্ঞানী হবে– তাহলে আমরা মূর্খের স্বর্গে বাস করি। আমাদের সমাজ ভাষা সম্পর্কে সচেতন নয়, তাদের বাধ্য করতে হবে ভাষা সম্পর্কে সচেতন হতে। শিক্ষার্থীদের যদি ভাষা সম্পর্কে সচেতন না করেন তাহলে ভাষা কখনও উন্নতির পথে যাবে না।’

1ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের উৎসাহ কম। কিন্তু ফরাসি, ল্যাটিন ভাষা নিয়ে আমাদের উৎসাহ বেশি। আমি মনে করি, আমাদের সাহিত্য বিশ্বের মানে খুব একটা পিছিয়ে নেই। যদি আমরা শক্তিশালী অনুবাদের মাধ্যমে এই সাহিত্যকে তুলে ধরতে পারতাম, তাহলে পৃথিবীর বড় বড় প্রকাশকরা বাংলাদেশি সাহিত্যকে ইংরেজি, স্প্যানিশ কিংবা আরবি তর্জমায় প্রকাশ করতে উৎসাহিত হতো।’

এ সময় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘হয়তো আরও পাঁচ বছর পর এই কথাগুলো আমি আরও শক্তি নিয়ে বলতে পারবো যদি আমাদের অর্থনীতি একটি অবস্থানে পৌঁছে যায়, পৃথিবী আমাদের গণ্য করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত হিসেবে। যেমন– আমরা এখন দুর্নীতির তলানিতে আছি। যদি দুর্নীতির সূচকে আমরা উপরে উঠে উন্নত অবস্থানে যাই, আমাদের নারীদের অধিকার আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ অনেক সুনাম কুড়িয়েছে। যদি এভাবে আমাদের সক্ষমতাগুলো স্থানান্তর করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের একটা মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হবে। আমাদের শান্তিরক্ষা বাহিনীর কারণে সেনেগালে বাংলা ভাষার একটি মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্তঃসম্পর্কগুলো অনেক বিস্তৃত করতে হবে। আমাদের কর্মকাণ্ডগুলো আরও বিস্তৃত করতে হবে। আমাদের সাহিত্যের অঞ্চলটিকে অনেক শক্তিশালী করতে হবে। বাংলা একাডেমি যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তার একটি ছিল, তর্জমার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দেওয়া। সেই কাজটি আমরা হাতে নিতে পারিনি। সেই কাজটি যদি করতে পারি, তাহলে আমি মনে করি বাংলা সাহিত্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’      

3ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমরা রক্ত দিয়েছি। সেখানে অনেকগুলো ঘটনা জড়িত ছিল। আজকে আমরা বুঝতে পারছি না, দাঁত থাকতে নাকি দাঁতের মর্যাদা বোঝা যায় না। আমরা জাতীয় স্বাধীনতা একটা পেয়েছি, এটাকে মর্যাদা না দিয়ে অবহেলা করা যাবে না। চীনের মানুষরা যেমন টাকা খরচ করে চীনা ভাষা সমৃদ্ধ করার জন্য। আমিও একটা প্রস্তাব দিই। সেটি হলো, জার্মানিতে “গেটে ইনস্টিটিউট” বলে একটা প্রতিষ্ঠান আছে। সেটা জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ঢাকায় তাদের একটা অফিস আছে। সেখানে তারা জার্মান ভাষা বাণিজ্যিকভাবে শেখাচ্ছে। জার্মানিতে যারা যেতে চায় তাদের সেখান থেকে শিখতে হয়। এমনকি কোরিয়ানরা সেদেশের ভাষা শেখানোর চেষ্টা করছে। আমাদেরও এমন কিছু করা দরকার।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের কি উদ্যোগ নেওয়ার সময় আসেনি? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য মিশন করুন। শুধু বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে নয়, আলাদা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা যায়। সেই সামর্থ্য বাংলাদেশের ধীরে ধীরে হবে। আমাদের প্রথম দরকার, বিদেশের কাছে নিজেদের নৈতিকভাবে তুলে ধরা।’      

7লেখক ও গবেষক অদিতি ফাল্গুনী বলেন, ‘তুরস্ক, জাপানের সাহিত্য ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। কারণ, জাপানের অর্থনীতি শক্তিশালী। অন্যদিকে, তুরস্ক কিংবা আফগানিস্তানের নারীদের কবিতা অনূদিত হওয়ার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বসহ নানা ধরনের বিষয় আছে। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অনুবাদে সক্ষম ব্যক্তিদের মূল্য দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘হয়তো আমাদের বিদেশে বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য কেন্দ্র খোলার মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এখনও হয়নি। একটি বিষয়ে জুলফিকার রাসেল ভালো বলেছেন– আমরা যখন বেড়ে উঠেছি, তখন ওপার বাংলার সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষের সিনেমাগুলোতে সাব টাইটেল দেখতাম। তখন ভালো লাগতো যে, বাংলা ভাষা সাব টাইটেলে যাচ্ছে। আজকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো চলচ্চিত্র কয়টি আছে?’

5প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাযহারুল ইসলাম বলেন, ‘কেন আমরা শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই এই আলোচনাগুলো করি? বাকি ১১ মাস বাংলা ভাষা কিংবা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি না? শুধু মেলাকেন্দ্রিক নয়, ফেব্রুয়ারি মাসের বাইরে আমরা আমাদের প্রকাশনাকে নিয়ে যেতে চাই। মেলার বাইরে আমরা সারাবছর দুটি অনুষ্ঠান করি। একইভাবে আমার অনুরোধ, টিভি চ্যানেল ও পত্রিকাগুলোর প্রতি। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন। তাহলে যারা এটা বাস্তবায়ন করবেন তাদের কাছে বিষয়টি বারবার যাবে। এর ফলে এটি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে।’

4বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হলে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিদেশে পরিচিত করাতে হবে। এতে তারা আমাদের দেশের শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে। তখন তারা উৎসাহী হয়ে খোঁজ করবে, এখানে আরও কী কী আছে। যেমন– চলচ্চিত্র বা সাহিত্য। তারা এগুলো আস্বাদন করার জন্য আমাদের বাংলা ভাষা শিখতে আগ্রহী হবে।’

ঢাকা লিট ফেস্টে ইংরেজি ভাষাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়– অদিতি ফাল্গুনীর এমন মন্তব্যের জবাবে জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘ঢাকা লিট ফেস্টে যারা একটু বেশি ইংরেজি জানেন তাদের একটু বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফেস্টে বিদেশি অতিথি যারা আসেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্যই মূলত ইংরেজিকে এই প্রাধান্য দেওয়া। কারণ, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত করতে এ ধরনের একটি আয়োজন আমাদের দরকার আছে। পাশাপাশি দেখবেন, লিট ফেস্টে বাংলা ভাষায় যে-কয়টি সেশন রয়েছে, পৃথিবীর আর কোনও দেশের কোনও ফেস্টে নিজের ভাষায় এতগুলো সেশন নেই।’ 

 

 

 

/এসও/এমএএ/

লাইভ

টপ