এক কাঠা জমির মূল্যে একটি ‘প্রাইভেট কবর’!

শাহেদ শফিক
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৫:৫৬আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ২০:২২

পূর্বাচলে ‘রাওজাতুল জান্নাত’ নামে প্রাইভেট কবরস্থানে ঢোকার পথে সাইন বোর্ড

রাজধানীর প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য সরকারিভাবে কবরস্থান রয়েছে মাত্র ছয়টি। এসব কবরস্থানে অস্থায়ীভাবে লাশ দাফন করা গেলেও স্থায়ীভাবে কবর সংরক্ষণের খুব বেশি সুযোগ নেই। আর এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রাইভেট কবরস্থান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এই কবরস্থানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাওজাতুল জান্নাহ’। তবে কবর বিক্রির প্রচারণার ধরন দেখে অনেকের মনে যেমন কৌতূহল জেগেছে, তেমনই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত দামে কবরের জায়গা বিক্রির অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

আধ্যাত্মিক স্লোগান ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কথা বলে পূর্বাচলের ৩০ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার পানজোড়া মৌজায়  এই কবরস্থান গড়ে তোলার কাজ করছে এমআইএস হোল্ডিংস লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। 

চলছে কবরস্থান তৈরির কাজ সরেজমিন দেখা গেছে, মাত্র তিন বিঘা জমিতে সাইন বোর্ড লাগিয়ে ২০০ বিঘা জামিতে ৮০ হাজার মানুষের দাফন ব্যবস্থার প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কবরস্থানটির চারদিকে বাউন্ডারি দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।  কবরস্থানের পূর্ব-উত্তর কোণে টিনের ছাউনির একতলা একটি মসজিদের নির্মাণকাজ চলছে। পুরো জায়গাটিতে রয়েছে অনেক সরু রাস্তা। আর রাস্তার দুই পাশে কবরের জন্য নির্ধারিত ছোট ছোট  খণ্ডের জায়গাগুলোতে ইটের গাঁথুনি দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পুরো জায়গাটির আয়তন তিন বিঘার বেশি হবে না। কিন্তু কবরস্থানটি ২০০ বিঘা জমির ওপরে নির্মাণ করা হচ্ছে বলে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে এমআইএস হোল্ডিংস। বিজ্ঞাপনে তারা দাবি করছে—পুরো কবরস্থানটিকে আটটি সেক্টরে ভাগ করা হবে। এতে ৮০ হাজার মানুষের দাফনের ব্যবস্থা থাকেবে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের এমন দাবির সঙ্গে একমত হতে পারছেন না স্থানীয়রা।

‘রাওজাতুল জান্নাহ’ কবরস্থানের পাশেই বাড়ি আরাফাত হোসেনের। চাকরি করেন টিঅ্যান্ডটিতে। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও এই জমিটা অনেক নিচু ছিল। ঢাকায় অনুষ্ঠিত আবাসন মেলাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করেই কবরস্থানের কাজে হাত দিয়েছে উদ্যোক্তারা। কবরের চারপাশে বাড়িঘর রয়েছে। তবে তারা বিছিন্নভাবে আরও কিছু জমি কিনেছে। কিন্তু এ এলাকায় ২০০ বিঘা জমি তারা কোথায় পাবে? মানুষ তো তাদের বাড়িঘর দিয়ে দেবে না। বর্তমানে যে কবরস্থান তৈরি করা হয়েছে, তার আয়তন তিন বিঘার বেশি হবে না। এতে সর্বোচ্চ ৪০০টি কবর করা যাবে।’ 

কবরস্থানের ভেতরে নির্মাণাধীন টিনসেড মসজিদ দেখা গেছে, ২০০ বিঘা জমির ওপর কবরস্থান তৈরির প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে ওই এলাকায় এখনও স্থানীয়দের ঘরবাড়ি রয়েছে।  ফেসবুক ছাড়াও গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত রিহ্যাবের আবাসন মেলায় অংশ নিয়ে এরইমধ্যে ২০০টি কবরের জায়গা বিক্রি করা হয়েছে বলে দাবি করছে এমআইএস হোল্ডিংস লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি কবরের জন্য ক্রেতাকে সাড়ে তিন ফুট প্রশস্ত এবং সাত ফুট দৈর্ঘ্যের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হবে। অর্থাৎ প্রতিটি কবরের আয়তন  প্রায় সাড়ে ২৪ বর্গফুট। প্রতিটি কবরের জায়গার জন্য ক্রেতাকে এককালীন বুকিং মানি হিসেবে ১৫ হাজার ও সার্ভিস চার্জ বাবদ ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে।  প্রতিটি কবরের মোট মূল্য হচ্ছে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা। পুরো টাকা এককালীন বা কিস্তিতেও পরিশোধ করা যাবে।

কবরের জন্য এখানকার জমি কিনতে আগ্রহীরা বলছেন, একটি কবরের জায়গার জন্য যে পরিমাণ টাকা নেওয়া হচ্ছে তা দিয়ে ওই এলাকায় ৭২০ বর্গফুট আয়তনের এক কাঠা জমি পাওয়া যায়। এতে প্রায় ৩০টি কবর তৈরি করা সম্ভব। জানা গেছে, পূর্বাচলের বিভিন্ন সেক্টরে প্রতি কাঠা জমির বর্তমান বাজার মূল্য সাড়ে তিন লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা।

প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কথা হয় আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। আবাসন মেলায় এমআইএস হোল্ডিংসের স্টল থেকে তিনি এই কবরস্থানের কথা জানতে পেরেছেন। পরে নিজের আগ্রহ থেকে এলাকাটি  দেখতে এসেছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘মেলায় প্রদর্শিত কবরস্থানটির প্রকল্পের ডিজাউনে যা বলা হয়েছে, বাস্তবে তার কোনও মিলই দেখছি না। কোম্পানির ব্রুশিয়ারে দেখেছি বহুতলবিশিষ্ট মসজিদ। কিন্তু এখানে এসে আমি হতাশ। যেখানে ৮০ হাজার কবরের কথা বলা হয়েছে, সেখানে ৫০০ কবরের জায়গাও দেখছি না।’

নির্মাণাধীন কবরস্থানের ভেতরের চিত্র জানতে চাইলে ‘রাওজাতুল জান্নাহ’র প্রকল্প পরিচালক হুমায়ুন আজাদ সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজধানীতে সরকারি কবরস্থান  আছে  মাত্র   ছয়টি, যেগুলো ৫০-এর দশকে তৈরি। নগরীর প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। সেই হিসেবে এই কবরস্থানগুলো যথেষ্ট নয়। আবার এগুলোতে বর্তমানে কবরের জন্য স্থায়ীভাবে কোনও জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এসব চিন্তাভাবনা থেকেই আমরা প্রাইভেট কবরস্থান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের এখানে কবরের জায়গা ক্রেতার নামে স্থায়ীভাবে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ক্রেতা চাইলে ওই জায়গায় একজনের মরদেহ দাফন করতে পারবেন বা  পুনঃব্যবহারও করতে পারবেন। এছাড়া, কোনও ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তার স্বজনেরা যদি আমাদের জানায়, তবে আমার গিয়ে লাশ এনে গোসল থেকে দাফন পর্যন্ত পুরো কাজটিই সম্পন্ন করে দেবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই কবরস্থানে আটটি সেক্টর রয়েছে। এরমধ্যে একটি সেক্টরে ১৫০০ কবরের জায়গা প্রায় প্রস্তুত রয়েছে। এখনই কোনও লাশ আসলে তাকে দাফন করা যাবে।’

হুমায়ুন  আজাদ বলেন,  ‘পর্যায়ক্রমে আরও জমি কেনা হচ্ছে। এছাড়া, কবরস্থানের পাশে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, একটি  অনাথ আশ্রম, একটি বৃদ্ধাশ্রম এবং একটি শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এতে সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সমগ্র এলাকাটি সিসি টিভির নজরদারির আওতায় থাকবে। কবরের সামগ্রিক দায়িত্ব খাদেমদের মাধ্যমে দেখভাল করা হবে।’

নির্মাণাধীন কবরস্থানের ভেতরের চিত্র রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ছয়টি কবরস্থান রয়েছে। এগুলো হচ্ছে—মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, মোহাম্মদপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, আজিমপুর কবরস্থান, জুরাইন কবরস্থান, বনানী কবরস্থান ও  রায়েরবাজর  কবরস্থান।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  এসব কবরস্থানে জায়গা সংকট রয়েছে। ফলে এখন আর স্থায়ীভাবে কবরের জন্য কোনও জায়গা বরাদ্দ দেওয়া  হচ্ছে না। 

কবরস্থানগুলোতে জায়গা কম থাকায় মৃত ব্যক্তির দাফন নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনকে। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রাইভেট কবরস্থান তৈরিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সিটি করপোরেশন।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কবরস্থানগুলোতে জায়গা ফুরিয়ে গেছে। এরপরেও প্রতিদিন শতাধিক মানুষের কবরের ব্যবস্থা করতে হয়। বর্তমানে জায়গা না থাকায় কোনও কবর সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। এখন যদি ব্যক্তিমালিকানায় কবরস্থান গড়ে ওঠে, আর ধর্মীয় রীতিনীতি ও আইন অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে তা অবশ্যই ভালো।’

/টিটি/এপিএইচ/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিদুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি