দগ্ধ নারীদের ৯০ ভাগই রান্নার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন

Send
তাসকিনা ইয়াসমিন
প্রকাশিত : ১০:০৯, মার্চ ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৬, মার্চ ১৪, ২০১৯

চুলার আগুনে দগ্ধ রোকেয়া বেগম

হাত আর  বুকের ওপরের অংশ পুরোটাই আগুনে পুড়ে গেছে রোকেয়া বেগমের। ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকার নবাবগঞ্জের এই গৃহবধূ। তিনি জানান, ‘ভাত রান্না করতে গিয়ে কিভাবে যে চুলার ওপরে পড়ে গেছি, বলতে পারছি না। হাতের ওপর গরম তরকারি পড়েছে। সামনেই চুলা। চুলার তাপে পুড়ে গেছি।’

শুধু রোকেয়াই নয়, সারা দেশে প্রতিদিনই কোনও না কোনও নারী রান্না করতে গিয়ে অসাবধানতার কারণে চুলার আগুনে দগ্ধ হন। চিকিৎসকরা বলছেন, এত বেশি নারী চুলার আগুনে দগ্ধ হয়ে আসেন, যা ভাবা যায় না। খুবই দুঃখজনক। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ অবস্থার পরিবর্তনে সবার সচেতনতা দরকার।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি  ইউনিটের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে ২০৯০ ব্যক্তি সাধারণ চুলা বা গ্যাসের চুলার আগুনে দগ্ধ হয়ে ঢামেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে কেবল ডিসেম্বর মাসেই দগ্ধ হয়েছেন ৬৫৫ জন। দগ্ধদের মধ্যে ৯০ ভাগই নারী ও শিশু।

আগুনে দগ্ধ রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেটা পেশায় ইলেট্রিশিয়ান। কাজ বাদ দিয়ে সে এখন আমার সঙ্গে হাসপাতালে। কী যে হবে বুঝতে পারছি না।’ দুর্ঘটনাটি কিভাবে ঘটলো জানতে চাইলে রোকেয়া বলেন,  ‘কিভাবে যে চুলার ওপরে পড়ে গেলাম, মনে পড়ছে না। হাত আর বুকের ওপরের অংশ পুরোটাই পুড়ে গেছে।’ তিনি বলেন,  ‘আমার ছেলের বউ নাইওরে গেছে। বাড়িতে একাই আছিলাম। এরপর কিভাবে কী হঘটলো নিজেও জানি না। কবে অপারেশন হবে. কবে আমি বাড়ি যাবো, সেই চিন্তায় আছি।’

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক  ডা. সামন্ত  লাল সেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে আউটডোরে নারী ও শিশু রোগীদের সংখ্যা খুব বেশি। আবার এদের মধ্যে রান্নার সময় চুলার আগুনে পুড়ে যাওয়াদের সংখ্যাই বেশি।’

ডা. সেন বলেন,  ‘আমরা একবিংশ যুগে আছি। এখনও গ্রামে-গঞ্জে মানুষ কুপি জ্বালিয়ে সেঁক দেয়। সেখান থেকেও আগুন লাগে। এটাতো একটা মধ্যযুগীয় কালচার। অথচ এখন চাইলেই হট-ওয়াটার ব্যাগ পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে, যতই আমরা ১২ তলা ১৪ তলা হাসপাতাল বানাই না কেন, কোনও লাভ হবে না। মানুষ যেন আর  আগুনে দগ্ধ না হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সবাই মিলে সচেতনতার কাজ করতে হবে।’

ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সাবেক অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ খন্দকার বলেন, ‘আগুনে পোড়া যেসব রোগী আমাদের কাছে আসেন, তার মধ্যে ৩০ ভাগ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়,  পাঁচ ভাগ রোগী অবজারভেশনে রেখে পরে ছেড়ে দিই। আর  কিছু রোগী আউটডোরে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। রান্না করতে গিয়ে দগ্ধ হন—  নারী রোগীদের মধ্যে এদের সংখ্যাই বেশি।’

তিনি বলেন, ‘নারী  রোগীদের মধ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে আগুনে দগ্ধ হন একভাগ। বাকিরা দুর্ঘটনার শিকার। আবার কেউ কেউ আত্মহত্যা করার লক্ষ্যেও শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন। তবে এসংখ্যা খুবই কম। মাঝে-মধ্যে  হঠাৎ করে এরকম দু-একটা ঘটনা পাওয়া যায়।’  

ডা. সাজ্জাদ খন্দকার বলেন, ‘নারীদের আগুনে পোড়ার ঘটনা ৯০ ভাগ ঘটছে রান্নার চুলা থেকে। আবার ৯০ ভাগই ঘটে অসাবধানতা থেকে। দ্বিতীয়ত, শহরের বাসাবাড়িতে রান্নাঘরগুলো খুবই ছোট। এত ছোট যে, একদিকে দাঁড়ালে অন্যদিকে ঘোরা যায় না। গ্রামে-গঞ্জে অবশ্য ফ্লোর কুকিং, মাটিতে চুলা থাকে। এটাও সমস্যা। বসতে হয়, আবার উঠতে হয়। দেখা যায়, ১২-১৩ হাত লম্বা শাড়ি আর লম্বা ওড়না, এটাও আগুন লাগার বড় ফ্যাক্টর। ওড়না পেছন দিকে ঝুলতে থাকে, তখন আগুন লেগে যায়। শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে ঝুলতে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা— রান্নাঘর ছোট হওয়ার কারণে মসলা রাখার জন্য ওয়াল কেবিনেট লাগানো হয়। একদিকে চুলা অন্যদিকে ওয়াল কেবিনেট। দেখা গেলো, চুলায় রান্না চলছে, ওই অবস্থায় নারীরা পেছন ঘুরে কেবিনেট থেকে কিছু নামাতে গেলেন। তার ওড়না বা আঁচল গিয়ে পড়লো চুলার ওপরে। তখনই কাপড়ে আগুন ধরে যায়। আমাদের দেশে কিচেন ড্রেস বলে কিছু নেই। নন  ফ্লেমাবল কিচেন ড্রেস দরকার। গ্যাস, লিকেজ সিলিন্ডার ব্লাস্ট— এগুলো হচ্ছে অসাবধানতার বাইরের কারণ। রান্না চড়িয়ে দিয়ে সন্তান কাঁদছে তাকে দেখতে বেডরুমে গেলেন। এদিকে, ডাল-চাল পুড়ে আগুন ধরে যায়।’

ডা. খন্দকার আরও  বলেন, ‘অনেক বাড়িতে চুলার গ্যাসের লো- প্রেসার থাকে। আগুন চোখে দেখা যায় না। অনেকে মনে করেন হয়তো গ্যাস বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সুইচ বন্ধ করেন না। একটা সময় পরে গ্যাসের চাপ বাড়ে। এরপর গ্যাস এসেছে কিনা তা চেক করার জন্য আগুন জ্বালাতে গিয়ে অনেকে দুর্ঘটনার শিকার হন। গ্যাসের চাপ ওঠানামা করায়  অনেকে আবার  চুলা বন্ধ করতে ভুলে যান। আর এ কারণে অনেক বেশি ক্ষতি হয়।’

রান্না করতে গিয়ে আগুনে পোড়া সব নারী কি চিকিৎসার সুযোগ পান? জানতে চাইলে ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, ‘আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসা দীর্ঘ মেয়াদের। ফলে দেখা যায়, হয়তো রোগীর চিকিৎসা শুরু করা হলো। একটু ভালো হলেই চলে যান। পরে আর আসেন না। অর্থাৎ, ফলোআপ হয় না। কারণ, এসব নারীরা তাদের স্বামী বা অভিভাবকদের ওপরে নির্ভরশীল। তারা বিষয়টি কম গুরুত্ব দেন। একারণে বলবো, সব নারী চিকিৎসা পান না, বেশিরভাগই  চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।’

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ