নিয়োগ ছাড়াই প্রধান শিক্ষক!

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ২১:১২, মার্চ ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৪, মার্চ ২১, ২০১৯

অভিযোগ ও মাউশির চিঠিনিয়োগ ছাড়াই প্রধান শিক্ষক হয়ে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন একজন সহকারী শিক্ষক। আরেকজন বিএড এর জাল সনদ দিয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জাল সনদ দিয়ে নিয়োগ নিয়ে সরকারি বেতন-ভাতাও নিচ্ছেন তিনি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

সূত্রমতে, গাইবন্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ফলগাছা গ্রামের ফলগাছা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছাইদার রহমান মণ্ডল ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগ ছাড়াই নিজে নিজে পদোন্নতি নিয়ে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত ৬ মার্চ মাউশির মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছে।

আর বিএড এর জাল সনদ দাখিল করে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. আ. কুদ্দুস জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পাঠানপাড়া দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নেওয়ার পর সহকারী শিক্ষক হিসেবে গোপনে সরকারি বেতন-ভাতাও উত্তোলন করছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) সহকারী পরিচালক (সেসিপ) মো. সবুজ আলম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক নিজ হাতে রেজুলেশন লিখে প্রধান শিক্ষক হয়েছেন’ এই অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তদন্তে অভিযোগের সতত্যা নিশ্চিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর জাল সনদ দিয়ে প্রধান শিক্ষক হওয়া এবং সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত বেতন উঠানোর ঘটনা প্রমাণ হলে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জয়পুরহাট জেলা শিক্ষা অফিসারকে।’  

নিয়োগ ছাড়া যেভাবে প্রধান শিক্ষক

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ফলগাছা গ্রামের ফলগাছা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছাইদার রহমান মণ্ডল ২০০৩ সালের আগে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার শ্বশুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক আলী মিয়া অবসরে গেলে ম্যানেজিং কমিটিকে না জানিয়ে প্রথমে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজ হাতে রেজুলেশন লিখে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নেন। এই ঘটনায় বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির ওই সময়ের সভাপতি আব্দুল গফুর সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন। কিন্তু, বিষয়টির কোনও সুরাহা হয়নি।

প্রধান শিক্ষক হয়ে নতুন করে দুর্নীতিতে জড়ান

প্রধান শিক্ষক হয়ে পরবর্তী সময় আরও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন ছাইদার রহমান। অভিযোগ মতে,কর্মরত কৃষি শিক্ষক সায়মা বেগমকে বাদ দিতে কৃষি শিক্ষকের ভুয়া প্যাটার্ন তৈরি করে মো. ফারুক হোসেনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর ভুয়া প্যাটার্নে নিয়োগ দেওয়া এই শিক্ষককের জন্য এমপিওভুক্তির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কর্মরত মোশররফ হোসেন এমপিওভুক্ত হলেও তাকে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক দেখিয়ে লাইব্রেরিয়ান পদে সাইফুল ইসলাম নামের আরেক জনকে নিয়োগ দেন। একইভাবে অফিস সহকারী নুরজাহান কর্মরত থাকলেও মাইদুল ইসলাম নামের আরেক জনকে একই পদে নিয়োগ দিয়ে তার এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করেন। এসব বিষয় নিয়ে এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দিলে ফলগাছা গ্রামের নুরুল আলম আকন্দ, আব্দুর রহমান মিয়া ও দুলা সরকারসহ স্থানীয় লোকজন পুরো ঘটনা তুলে ধরে প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল চেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন। অভিযোগে প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল ছাড়াও বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

ফলগাছা গ্রামের নুরুল আলম আকন্দ ও আব্দুর রহমান মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক তার শ্বশুর থাকার কারণে তিনি নিজে নিজেই প্রধান শিক্ষক হয়ে যান। রেজুলেশন নিজের হাতে লিখে প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ নেন পরে।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক ছাইদার রহমান বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির চাপে অনেক কিছুই করতে হচ্ছে।’ তবে নিয়োগ ছাড়া প্রধান শিক্ষক সেজে দায়িত্ব পালন করার বিষয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি। আর কৃষি শিক্ষক পদে আগে একজন নিয়োগ থাকলেও আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। একইভাবে অফিস সহকারী থাকার পরও আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন। তবে লাইব্রেরিয়ান পদের কর্মরত মোশররফ হোসেন চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগ পাওয়ার পর সাইফুল ইসলামকে বিধি মোতোকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে দাবি করেন। এসব অনিয়মের সঙ্গে ম্যানেজিং কমিটির জড়িত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে  ছাইদার রহমান বলেন,‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। চাপে অনেক কিছুই করতে হয়েছে।’ 

প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে জাল সনদ

অন্য এক ঘটনায় জানা গেছে, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পাঠানপাড়া দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আ. কুদ্দুস প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নিয়ে ২০০৮ সালে প্রথম এমপিওভুক্তির আবেদন করেন। কিন্তু দারুল ইহসানের সনদের ফল কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় ওই সময় এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। এরপর ২০১১ সালে ফল কাঙ্ক্ষিত থাকলেও দারুল ইহসানের সনদে এমপিও দেওয়ার সিদ্ধান্ত না থাকায় মাউশি এমপিওভুক্ত করেনি। এরপর ২০১৭ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আহমেদ টিচার্স টেনিং কলেজের সনদ জমা দেন। তবে এমপিওভুক্তির সময় তার এই সনদ যাচাই করা হলে জাল বলে প্রমাণ হয়।

প্রধান শিক্ষক হয়েও বেতন নেন সহকারী শিক্ষকের

মো. আ. কুদ্দুস প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর বিএড সনদ না থাকায় এমপিভুক্ত হতে না পেরে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে থাকেন। বিষয়টি মাউশির তদন্তে বেরিয়ে এলে তার এমপিও এবং নিয়োগ বাতিল করে ফৌজদারি আইনে মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার (১৯ মার্চ) জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে চিঠি পাঠায় মাউশি। মাউশির সহকারী পরিচালক মো. সবুজ আলম (সেসিপ) স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করার পরও সহকারী শিক্ষক হিসেবে বেতন-ভাতা উত্তোলন করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

 

/এনআই/

লাইভ

টপ