‘সেদিন ট্রাফিক পুলিশ ব্যবস্থা নিলে পা হারাতে হতো না’

Send
বাহাউদ্দিন ইমরান
প্রকাশিত : ১৮:২১, এপ্রিল ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৬, এপ্রিল ০৪, ২০১৯

গ্রিন লাইন পরিবহনের চাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল

গত বছরের ২৮ এপ্রিল মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের চাপায় বাম পা হারিয়েছেন প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকার (২৩)। এরপর থেকে স্ত্রীর চাকরির ওপর নির্ভরশীল তিনি। ২ বছর ৯ মাস বয়সী সন্তান মিশু হাসানকে নিয়ে ঘরের মধ্যেই এখন দিন কাটে তার। ক্ষতিপূরণের টাকা দাবি করা মামলায় আদালতে হাজির হতেও ধার করতে হয়। নিজে পঙ্গু হয়ে যাওয়ায়, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য টাকা দরকার বলে জানিয়েছেন রাসেল। তবে তার মূল আফসোস অন্য জায়গায়। সেদিনের দুর্ঘটনার জন্য পরোক্ষভাবে ট্রাফিক পুলিশও দায়ী বলে জানিয়েছেন তিনি।   

তার ভাষ্যমতে, ‘আমার ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার আগে প্রাইভেটকারে ধাক্কা দিয়েছিল গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসটি। তখন সেখানকার ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্টের কাছে বিচার দিয়েও লাভ হয়নি। পরে বাসটি চলে যাওয়ার সময় আমি নিজে সামনে দাঁড়িয়ে থামতে বলি। তখন আমার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন যদি ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট ব্যবস্থা নিতো, তাহলে আমার পা হারাতে হতো না। ’

রাসেলের দাবি, ‘পরিবহনের নাম শোনার পর বিষয়টি এড়িয়ে যায় ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট।’

রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে গ্রিন লাইন পরিবহনকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত

বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল)  পা হারানো রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য গ্রিন লাইন পরিবহনকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এরপর একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব তথ্য জানিয়েছেন রাসেল।  

দুর্ঘটনার আগের ঘটনা সম্পর্কে রাসেল জানান, ঘটনার দিন আমি কাজ সেরে কেরানীগঞ্জ থেকে মালিকের প্রাইভেটকার চালিয়ে আসছিলাম। এরপর যাত্রাবাড়ী ট্রাফিক সিগন্যালের কিছু আগে গাড়ির গতি কমিয়ে আনি। তখন গ্রিন লাইন পরিবহন আমার কারের ডান পাশে ধাক্কা দেয়। এরপরই সেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে পরিবহনটি দাঁড়িয়ে যায়। ঘটনাটি আমার মালিককে জানিয়ে গ্রিন লাইন পরিবহনের ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলতে যাই। প্রথমে ড্রাইভার স্বীকার করেনি যে, সে প্রাইভেটকারে ধাক্কা দিয়েছে। তারপর আমি যাত্রাবাড়ীর ওই সিগন্যালের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কাছে গিয়ে ঘটনাটি জানাই। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ গ্রিন লাইন পরিবহনের নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে বলেন- ‘আমার হাতে সময় নেই।’ এরপর সেখানকার ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে যাই। কিন্তু এখানেও গ্রিন লাইনের কথা শুনে সার্জেন্ট বলেন, ‘আমি কাগজ নিয়ে ব্যস্ত আছি, যেতে সময় লাগবে।’

দুর্ঘটনার প্রসঙ্গে রাসেল আরও জানান, ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলার সময় গ্রিন লাইনের ড্রাইভার ধীরগতিতে গাড়ি টান দিতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে আমি পরিবহনটির সামনে চলে যাই। এরপর ড্রাইভারকে বলি- ‘আপনি গাড়ি থামান, নইলে যেতে দেবো না। আপনি আমার সঙ্গে আসেন, এসে আমার মালিকের সঙ্গে আগে কথা বলেন। মালিক যা বলবেন তাই হবে।’ কিন্তু সেই গ্রিন লাইনের ড্রাইভার বলেন, ‘আমার হাতে সময় নেই, আপনি গাড়িতে ওঠেন। আপনি রাজারবাগ কাউন্টারে আসেন। তারপর কথা বলছি। আপনি বাম পাশে এসে গাড়িতে ওঠেন।’

এরপর গাড়ির সামনে দিয়ে ডান পাশ থেকে বাম পাশে যাওয়ার সময় ড্রাইভার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয় এবং তার বাম পায়ের ওপর দিয়ে গাড়িটি চলে যায় বলেও জানান রাসেল।   

স্ত্রী-শিশুসহ আদালতে পা হারানো প্রাইভেটচালক রাসেল

সেদিনের ট্রাফিকের দায়িত্বে তাকা কর্মকর্তাদের নাম মনে নেই জানিয়ে রাসেল আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন সেখানকার দায়িত্বরতরা আমার অভিযোগ শোনার পর যদি প্রাথমিকভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন, তাহলে হয়তো আমাকে আর পা হারাতে হতো না।’

তবে এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এখনও কোনও চার্জশিট হয়নি জানিয়ে রাসেল বলেন, ‘ঘটনার পর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা করেছিলাম। এখনও চার্জসিট জমা হয়নি। তাছাড়া মামলার আসামি গত ১৪ জানুয়ারি আদালত থেকে জামিন নিয়েছে।’

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে কথা কাটাকাটির জেরে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচালক ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাইভেটকারচালকের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারের (২৩) বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পা হারানো রাসেল সরকারের বাবার নাম শফিকুল ইসলাম। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার জেলার পলাশবাড়িতে। ঢাকার আদাবর এলাকার সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় তার বাসা।

এই ঘটনায় তৎকালীন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম স্মৃতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১০ এপ্রিলের মধ্যে রাসেলকে ৫০ লাখ টাাক ক্ষতিপূরণ দিতে গ্রিন লাইন পরিবহনকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এই সংক্রান্ত আরও খবর:

ক্ষতিপূরণ না দিলে গ্রিন লাইনের টিকিট বিক্রি বন্ধ

ক্ষতিপূরণ না দিলে গ্রিন লাইনের সব গাড়ি নিলামে বিক্রি: হাইকোর্ট

 

 

 

 

/বিআই/এএইচ/

লাইভ

টপ