মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা ‘অগ্নিসংযোগকারীদের পরনে ছিল বোরকা, হাতমোজা ও কালো চশমা’

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ০২:২৯, এপ্রিল ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৪, এপ্রিল ০৭, ২০১৯

দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলার বাদী ও ফেনীর সোনাগাজীর আলিম পরীক্ষার্থী নূসরাত জাহান রাফির (১৮) গায়ে অগ্নিসংযোগকারীদের পরনে ছিল কালো বোরকা, হাতে ছিল হাতমোজা এবং চোখে কালো চশমা। চারজন নূসরাত জাহান রাফিকে ধরে প্রথমে গ্লাস থেকে তরল পদার্থ গায়ে ছুড়ে মারে, এরপর আগুন দেওয়া হয়।

শনিবার (৬ এপ্রিল) সকালে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে অগ্নিদগ্ধের শিকারের পর গুরুতর আহত অবস্থায় নূসরাত জাহান রাফি তার ভাইদের কাছে ঘটনার এভাবে বর্ণনা দেন। তার বক্তব্য মোবাইলে রেকর্ড করে রেখেছেন বড়ভাই মাহমুদুল নোমান। নূসরাতের দুটি বক্তব্যের রেকর্ড তাদের কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান জানান, শনিবার সকালে আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা ছিল নূসরাতের। নোমান তাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যান। তবে কেন্দ্রের প্রধান ফটকে নোমানকে নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা আটকে দেন। এরপর নূসরাত একাই হেঁটে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। নোমান বোনকে দিয়ে কেন্দ্রের কিছু দূরে চলে আসেন। এর ১৫-২০ মিনিট পরই নোমানের মোবাইলে বোনের অগ্নিদগ্ধের ঘটনার ফোন আসে। এরপর তিনি ফের কেন্দ্রে ছুটে যান। গিয়ে বোনকে দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পান।

নূসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। পরে ফেনী সদর হাসপাতালে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

পথে নূসরাতের কাছে তার ভাইয়েরা ঘটনার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় গাড়িতে বসে নূসরাত ঘটনার বর্ণনা দেন। তা মোবাইলে রেকর্ড করেন তার ভাইয়েরা।

নূসরাতের বক্তব্যের বর্ণনা দিয়ে তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নূসরাত পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে তার সিটে প্রবেশপত্র রাখেন। এ সময় বোরকা পরা এক ছাত্রী নূসরাতকে জানায়, ‘নূসরাতের বান্ধবী নিশাতকে পাশের সাইক্লোন সেন্টারে মারধর করা হচ্ছে। এ কথা শুনে নূসরাত সেখানে যাওয়ার পর চারজন বোরকা পরা মানুষ তার হাত ধরে ফেলে। তাদের পরনে হাতমোজা এবং চোখে কালো চশমা ছিল। তারা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা নূসরাতের যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে বলে। হুজুরের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা বলতে বলে। নূসরাত এ কথার বিরোধিতা করার সঙ্গে সঙ্গে তারা নূসরাতের হাত ধরে গ্লাসে থাকা তরল পদার্থ গায়ে ছুড়ে মারে। এরপর আগুন ধরিয়ে দেয়। নূসরাতের শরীরে আগুন ধরে গেলে সে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে চিৎকার করে নিচে নেমে আসে। এ সময় শিক্ষার্থী, কেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মীরা পানি ও মাটি দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে।’

এরপর নূসরাতকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কপপ্লেক্স, ফেনী সদর হাসপাতাল হয়ে বিকালে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় বলে জানান মোহাম্মদ আলী।

তিনি বলেন, ‘গাড়ি নিয়ে আসার সময় নূসরাত চারজন বোরকা পরা লোকের কথা বলেছে। তবে হাতমোজা ও চোখে চশমা থাকায় সে কাউকে চিনতে পারেনি।’

ঘটনার পর ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহেল পারভেজ, সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইকুল আহমদ ভুঁইয়া মাদ্রাসায় পৌঁছে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন।

সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইকুল আহমদ ভুঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নূসরাত জাহান রাফি সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যায়। সে যে কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে, সেই কক্ষে ওই সময় ২৪ শিক্ষার্থী ছিল। নাসরিন জাহান তার প্রবেশপত্র ও ফাইল নিজের সিটে রেখে পাশের মেয়েদের বলে, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। এরপর সে কক্ষ থেকে বের হয়ে পাশের একটি সাইক্লোন সেন্টারের (কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়) ওপরে ওঠে, সেখানে মেয়েদের জন্য ওয়াশরুম রয়েছে। সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে দোতলায় চলে আসে। এ সময় তার গায়ে আগুন জ্বলছিল। তখন স্কুলের পিয়ন ও অন্যান্য শিক্ষার্থী মাটি-পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। আগুন নেভানোর পর তাকে দ্রুত ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় পুলিশ তার সঙ্গে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা চলছিল, সেখানে বাইরের কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না। কারা বা কীভাবে মেয়েটির গায়ে আগুন লাগালো তা স্পষ্ট না। মেয়েটি কথা বলতে পারছে না। তবে ছাত্রীটি নাকি চারজন বোরকা পরা লোক দেখেছিল বলে ফেনী হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বলেছে।’

ঘটনার পর পুলিশ নূসরাতের বান্ধবী নিশাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাকে কেউ মারধর করেনি বলে জানিয়েছেন তিনি। কারা নূসরাতকে খবর দিয়েছিল, তাও তিনি জানাতে পারেননি।

নূসরাতের সঙ্গে তার মা শিরিন আক্তার, বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও মেজো ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রয়েছেন। তার মা মেয়ের জন্য হাসপাতালের মেঝেতে বসে বিলাপ করলে স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেয়। আগুনে নূসরাত জাহানের শরীরের ৭৫ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক পার্থ শঙ্কর পাল।

তিনি জানান, নূসরাত আশঙ্কামুক্ত নন। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

নূসরাতের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘চিকিৎসক আমাদের কোনও আশ্বাস দিতে পারেনি। আমাদের আল্লাহকে ডাকতে বলছেন। আমরা সবাই অসহায়। আমরা ওই অধ্যক্ষের বিষয়টি এলাকার চেয়ারম্যান, এমপি সবাইকে জানিয়েছিলাম। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম। আমাদের বিভিন্নভাবে মামলা তুলে নেওয়ার চাপ দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যেই নূসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হলো।’

প্রসঙ্গত, নূসরাত সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরছান্দিয়া গ্রামের মাওলানা মুচা মিয়ার মেয়ে। গত ২৭ মার্চ নূসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় নূসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে মামলা করেন সোনাগাজী থানায়। ওই মামলায় অধ্যক্ষ ফেনী কারাগারে আছেন।

/এআরআর/টিটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ