আলোচনায় যে টি-শার্ট

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৩:৩১, এপ্রিল ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৩, এপ্রিল ০৭, ২০১৯




যৌন হয়রানির প্রতিবাদে তৈরি টি-শার্ট

গণপরিবহনে যৌন হয়রানি না করার স্লোগান সম্বলিত টি-শার্ট গায়ে দিয়ে অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছেন নারীরা। ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি-শার্টের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়ার পর তা আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। এ বিষয়ে একদল বলছেন, অভিনব এই ক্যাম্পেইন নিপীড়কদের সতর্ক করবে। আরেকদল বলছেন, এই স্লোগান নারীকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। সমালোচকদের বক্তব্য, বাসে-ট্রামে-ফুটপাতে নারীরা পুরুষের নানারকম যৌন হয়রানির শিকার হন সত্যি, কিন্তু এর সমাধান করতে গিয়ে নারী তার শরীরকে ‘বিশেষিত’ করে ফেললে উল্টো ফল দেবে।

এই বিতর্ক নিয়ে নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, টি-শার্টে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ কথাটা পুরুষকে উদ্দেশ করে না বলার পরেও, কেবল তারাই কেন গায়ে মাখলেন তা ভাবতে হবে। আর এতে এটাই প্রতীয়মান হয়, নারী বিষয়ে পুরুষের আদিম চিন্তা ও মানসিকতার পরিবর্তন আসেনি।

নুসরাত জিশা ও জিনাত জাহান নিশা তাদের অনলাইনভিত্তিক ফ্যাশন হাউজ ‘বিজেন্স’-এর টি-শার্টে তুলে এনেছেন আলোচিত-সমালোচিত এই প্রতিবাদের ভাষা। গত বছর খোঁপার কাঁটায় ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লিখে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তারা। এবার একই স্লোগানে টি-শার্ট করেছেন তারা।

টি-শার্ট নিয়ে উদ্যোক্তার ফেসবুক পোস্ট

এ বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিশা লিখেছেন, ‘এই টি-শার্ট পরলেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে না।’ তবু তার বিশ্বাস, ‘আমাদের সোচ্চার আওয়াজই পারে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো নির্মূল করতে।’

টি-শার্টে প্রতিবাদের ভাষা বিষয়ে উদ্যোক্তা জিনাত জাহান নিশা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বছরখানেক আগে আমি বাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলাম। সেদিন বাসে আমি ছাড়া আর কেউ কোনও প্রতিবাদ তো করেইনি, উল্টো আমাকে চুপ করতে বলা হয়েছিল। সে রাতে আমি কাঁদতে কাঁদতে আমার কাজের মাধ্যমে ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ থেকে খোঁপার কাঁটায় এঁকেছিলাম ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’। পরে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে আমার এ প্রতিবাদ আমার কাজের জায়গায় দিয়েছিলাম। চেয়েছিলাম আর কেউ যাতে নীরব দর্শক হয়ে একটা মেয়ের হ্যারাসমেন্ট না দেখেন, সবার আগে মেয়েটি যেন প্রতিবাদ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘খোঁপার কাঁটা বা টি-শার্ট পরলেই কেউ আর কোনও হ্যারাসমেন্টের শিকার হবেন না এরকমটা আমরা একবারও বলিনি। বরং বলেছি এই কাঁটাটি কিনে নয়, এই কাঁটাতে লেখা প্রতিবাদী লাইনটি যেন পচে যাওয়া মানসিকতায় একটু হলেও ধাক্কা দিতে পারে।’

টি-শার্টের উদ্যোক্তারা গত বছর এমন চুলের কাঁটা তৈরি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন

নিশা বলেন, ‘‘অনেক হিজাবি আপু এ লেখা দিয়ে ‘হিজাব পিন’ হিসেবে গয়না তৈরি করে দিতে বলেছেন। আমরা তাদের বিনামূল্যে তা সরবরাহ করবো। কারণ, কোনও হিজাবি আপু যখন হিজাবের নিচেও নিরাপদ নন, ওনারা যখন করুণভাবে ওনাদের কোনও সুরাহা দিতে বলেন, তখন ভাবি এ দেশের ম্যাক্সিমাম মানুষ সাজেস্ট করেছেন হিজাব-বোরকা পরলে নাকি আর মেয়েরা হ্যারাস হয় না। তাহলে এই আপুগুলো কেন আমাদের কাছে এ লেখনী খুঁজছেন। এই অসুস্থতা দূর করতে লেখনী, আঁকা, টি-শার্ট, খোঁপার কাঁটা, হিজাব পিন কোনও সমাধান নয়। বাসের ভিড়ে ধাক্কা ও টাচ লাগবেই। সব পুরুষের টাচে খারাপ ইনটেনশন থাকে না। অনেক পুরুষ আছেন যারা ভীষণ সাপোর্টিভ ব্যবহার করেন। কিন্তু যারা বাসের ভিড়ে অযাচিত সুযোগ নেন তাদের জন্যই এ বার্তা।’

এ বিষয়ে সাংবাদিক সন্দীপন বসু ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শরীর নিয়ে এমন ট্যাবু কি নারীদের পুরুষদের সঙ্গে চলাফেরাকে অবাধ করবে? ... বাসে-ট্রামে-ফুটপাতে নারীরা পুরুষের নানা রকম যৌন হায়রানির শিকার হন সত্যি। কিন্তু এর সমাধান করতে গিয়ে নারী তার শরীরকে ‘বিশেষিত’ করে ফেললে উল্টো ফল দেবে। ভিড়ে নারী-পুরুষ গা ঘেঁষেই দাঁড়াবে। ঠেলাঠেলি করে মাছের বাজারে দরদাম করবে। তবেই না লিঙ্গ বৈষম্য উঠে যাবে। মনে রাখা দরকার নারীর শরীরকে ‘সতীত্ব’ জাতীয় ধারণা দিয়ে নারীকে-পুরুষের অধীনস্থ সম্পত্তি করে তোলা হয়েছে। নারী যখন ঘর ছেড়ে সমাজে আর দশটা ভূমিকা নিতে যায়, তখন সবার আগে তাকে দমন করতে তার শরীরের ওপরই আঘাত আসে। বাসে গা ঘেঁষে যৌন স্পর্শ, বুকে হাত দেওয়া, আরও যত অসভ্যতা আছে সবই করা হয়। পথ চলার এই প্রতিবন্ধকতাকে কিছুতেই পুরুষতান্ত্রিক ট্যাবুকে সামনে এনে মোকাবিলা করা ঠিক হবে না। এই সুযোগে ‘উদার পুরুষতান্ত্রিক’ দাবি করে বসবে, মেয়েদের জন্য আলাদা বাস, আলাদা অফিস, আলাদা বাজার, শপিংসেন্টার চাই...।’

টি-শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা

টি-শার্টে প্রতিবাদী স্লোগান বিষয়ে নারী অধিকার কর্মী ফারহানা হাফিজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টি-শার্টের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল- বাজার অর্থনীতিতে কতকিছুই তো বিক্রি হয়, এটাও হোক। তাও যদি কারও কারও মগজে একটু ধাক্কা দেয়া যায়। তবে আজকে যখন টি-শার্টের বার্তার বিপরীতে বিকৃত বিপরীত বার্তা ট্রল করা হলো, তখন ভাবছি, ভালোই হলো। পুরুষের যে হীন মানসিকতা তা আরও প্রকাশিত হোক।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরুষ সমালোচনা করবে কারণ পরিবার ও সমাজ তো তাকে এই আধুনিক নারীর সঙ্গে বসবাস করার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলেনি। তাই পুরুষের নারী সম্পর্কিত আদিম চিন্তা ও মানসিকতার কোনও পরিবর্তন হয়নি, তার বহিঃপ্রকাশ হবেই। আরও বেশি করে তা হোক। লড়াইটা এখন ক্রমশই দৃশ্যমান। নারীকে অপ্রতিরোধ্য হতে হবে। পুরুষকেও মানবিক হতে হবে। একটা উইন-উইন অবস্থান ছাড়া পরিবর্তন আসবে না।

 

/ইউআই/টিটি/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ