ফেনীর সেই মাদ্রাসাছাত্রী শঙ্কামুক্ত নয়

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১২:০৪, এপ্রিল ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৭, এপ্রিল ০৭, ২০১৯

চিকিৎসাধীন  সেই মাদ্রাসাছাত্রীঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ফেনী জেলার সোনাগাজীর সেই মাদ্রাসাছাত্রীর  (১৮) অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

রবিবার (৭ এপ্রিল) সকালে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, ‘মেয়েটির শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার অবস্থার আশঙ্কাজনক।  তার ব্যাপারে চিকিৎসকরা এখনও কিছু বলতে পারছে না।  মেয়েটির চিকিৎসা চলছে। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।’

অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘আজ (রবিবার) সকালে বোনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তখন তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেওয়া ছিল। সে পানি খেতে চেয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকের নিষেধ থাকায় পানি দেওয়া যায়নি। তার অবস্থা গতকালের মতোই আছে।’

তিনি জানান  শনিবার (৬ এপ্রিল) সকালে তার বোনের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল। তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যান তিনি। তবে কেন্দ্রের প্রধান ফটকে নোমানকে আটকে দেন নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা। এরপর তার বোন একাই হেঁটে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এসময় নোমান কেন্দ্রে থেকে একটু দূরে চলে আসেন। এর ১৫-২০ মিনিট পরই মোবাইলে তিনি তার বোনের অগ্নিদগ্ধের খবর পান।  ফের কেন্দ্রে ছুটে গিয়ে বোনকে দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পান নোমান।

আগুনে দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীকে  উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

ঢাকায় আসার পথে ওই ছাত্রীর কাছে তার ভাইয়েরা ঘটনা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় গাড়িতে বসে সে ঘটনার বর্ণনা দেয়। তা মোবাইলে রেকর্ড করেন তার ভাইয়েরা।
দগ্ধ ছাত্রীর  বরাত দিয়ে তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নূসরাত পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে তার সিটে প্রবেশপত্র রাখেন। এসময় বোরকা পরা একছাত্রী জানায়, ‘তার (আগুনে দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী) বান্ধবী নিশাতকে পাশের সাইক্লোন সেন্টারে মারধর করা হচ্ছে। এ কথা শুনে সেখানে যাওয়ার পর চারজন বোরকা পরা মানুষ ওই ছাত্রীর হাত ধরে ফেলে। তাদের পরনে হাতমোজা এবং চোখে কালো চশমা ছিল। তারা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে বলে। হুজুরের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা বলতে বলে। এ কথার বিরোধিতা করার সঙ্গে সঙ্গে তারা হাত ধরে গ্লাসে থাকা তরল পদার্থ ছাত্রীর গায়ে ছুড়ে মারে। এরপর আগুন ধরিয়ে দেয়।  শরীরে আগুন ধরে গেলে সে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে চিৎকার করে নিচে নেমে আসে। এ সময় শিক্ষার্থী, কেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মীরা পানি ও মাটি দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে।’

এরপর ওই ছাত্রীকে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কপপ্লেক্স, ফেনী সদর হাসপাতাল হয়ে বিকালে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় বলে জানান মোহাম্মদ আলী।

তিনি বলেন, ‘ঢাকায় নিয়ে আসার সময় গাড়িতে বসে তাদের বোন চারজন বোরকা পরা লোকের কথা বলেছে। তবে হাতমোজা ও চোখে চশমা থাকায় সে কাউকে চিনতে পারেনি।’

ঘটনার পর ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকে এনামুল করিম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহেল পারভেজ, সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইকুল আহমদ ভুঁইয়া ওই মাদ্রাসায়  গিয়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইকুল আহমদ ভুঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই ছাত্রী সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যায়। সে যে কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে, সেই কক্ষে ওই সময় ২৪ জন শিক্ষার্থী ছিল। ছাত্রীটি প্রবেশপত্র ও ফাইল নিজের সিটে রেখে পাশের মেয়েদের বলে, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। এরপর সে কক্ষ থেকে বের হয়ে পাশের একটি সাইক্লোন সেন্টারের (কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়) ওপরে ওঠে, সেখানে মেয়েদের জন্য ওয়াশরুম রয়েছে। সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে দোতলায় চলে আসে। এ সময় তার গায়ে আগুন জ্বলছিল। তখন স্কুলের পিয়ন ও অন্যান্য শিক্ষার্থী মাটি-পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। আগুন নেভানোর পর তাকে দ্রুত ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময় পুলিশ তার সঙ্গে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা চলছিল, সেখানে বাইরের কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না। কারা বা কীভাবে মেয়েটির গায়ে আগুন লাগালো তা স্পষ্ট না। মেয়েটি কথা বলতে পারছে না। তবে সে নাকি চারজন বোরকা পরা লোক দেখেছিল বলে ফেনী হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বলেছে।’

ঘটনার পর পুলিশ ভুক্তভোগী ছাত্রীর বান্ধবী নিশাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাকে কেউ মারধর করেনি বলে জানিয়েছেন তিনি। কারা মেয়েটিকে খবর দিয়েছিল, তাও তিনি জানাতে পারেননি।

হাসপাতালে দগ্ধ ছাত্রীর সঙ্গে তার মা শিরিন আক্তার, বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও মেজো ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রয়েছেন। তার মা মেয়ের জন্য হাসপাতালের মেঝেতে বসে বিলাপ করলে স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দের।

মেয়েটির চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘চিকিৎসকরা আমাদের কোনও আশ্বাস দিতে পারেননি। তারা আল্লাহকে ডাকতে বলছেন। আমরা সবাই অসহায়। আমরা ওই অধ্যক্ষের বিষয়টি এলাকার চেয়ারম্যান, এমপি সবাইকে জানিয়েছিলাম। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম। আমাদের বিভিন্নভাবে মামলা তুলে নেওয়ার চাপ দেওয়া হয়েছিল। এরমধ্যেই গায়ে আগুন দেওয়া হলো।’

প্রসঙ্গত, ঘটনার শিকার ছাত্রী সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরছান্দিয়া গ্রামের মাওলানা মুসা মিয়ার মেয়ে। গত ২৭ মার্চ নূসরাতকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় মেয়েটির মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। 

 

 

/টিওয়াই/এসএসএ/এপিএইচ/

লাইভ

টপ