ধর্ষকের ঘর করার গ্লানি

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:১৭, এপ্রিল ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫০, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

ধর্ষণ

দুই সন্তানের জননী রাহেলা বেগম (ছদ্মনাম) ১৮ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হন। প্রতিবেশী যুবক প্রভাবশালী পরিবারের হওয়ায় স্থানীয়দের চাপে মামলা করতে পারেননি রাহেলা ও তার বাবা। স্থানীয় নেতারা বসে ‍দুই পরিবারের সম্মতিতে রাহেলার বিয়ে দেন ধর্ষক রাশেদের সঙ্গে। এরপরের চার বছর রাহেলার ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। রাহেলার ভাষায়, ‘ধর্ষিতা পরিচয় মুছলো বটে, সম্মান জুটলো না’। এরপর তালাক দিয়ে রাশেদ আবারও বিয়ে করে। আর রাহেলা? দুই সন্তান নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এখন সেখানেও তাকে সইতে হচ্ছে নানা ধরনের অপবাদ।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরেও ধর্ষকের সঙ্গে লাঞ্ছিত নারীকে বিয়ে দেওয়ার এমন পরিণতি শুধু রাহেলা নন, দেশের অসংখ্য নারীই বয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয়রা প্রভাবশালী বা সম্পদশালী হলে কিংবা রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হলে অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন ভবিতব্য মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কখনও প্রভাবশালীদের ভয়, কখনও স্থানীয়দের চাপ আবার নিজের পরিবারের মানসম্মান নষ্ট হওয়ার কথা ভেবে ধর্ষকের সঙ্গেই ঘর করতে বাধ্য হচ্ছেন অসংখ্য নারী।

এমনই আরেক ভুক্তভোগী বগুড়ার কিশোরী সাহানা (ছদ্মনাম)। ধর্ষকের ঘর করতে হচ্ছে তাকেও। তার ক্ষেত্রে যে অমানবিক ঘটনাটি ঘটে তা হচ্ছে ধর্ষণের ভিডিও চিত্র সেলফোনে ধারণ করে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মামলাও করেছিলেন তারা, কিন্তু সেটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর ধর্ষণের শিকার সাহানার বাবাকে ডেকে নিয়ে ধর্ষকের বাবা সমঝোতার প্রস্তাব দেন। কী সমঝোতা হতে পারে, জানতে চাইলে ধর্ষকের বাবা বলেন, হয় টাকা না হলে বিয়ে। সাহানার বাবা বিয়েকেই সমঝোতার পথ হিসেবে বেছে নেন। সেই থেকে সাহানা ধর্ষকেরই ঘর করছেন। তবে এখন যেন মানিয়ে নিয়েছেন নিজেকে। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনার স্ত্রী হিসেবে সমাজে পরিচয় না পেলে আমার আর আমার পরিবারকে অসম্মানের জীবন যাপন করতে হতো। এখন বেশ ভালো আছি। আমার আর কোনও অভিযোগ নেই।’

ধর্ষণ একটা অপরাধ, সেটার বিচার হওয়া উচিত মনে করেন কি না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘উনি আমাকে বিয়ে করেছেন, আমাকে অসম্মানের জীবন দিয়ে বিয়ে না করলেও পারতেন। সে কারণে আমি অন্যায় মনে করি না।’

সাহানা আরও বলেন, ‘তবে বিচার কেউ চাইলে চাইতে পারে। কিন্তু তাকে (ধর্ষণের শিকার নারী) সমাজের কটূক্তি থেকে রক্ষা করবে কে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে।’

তবে বিচার না চেয়ে অপরাধীর সঙ্গে ঘর করার বিষয়ে নারীনেত্রীরা বলছেন, ধর্ষণের শিকার নারীর পুনর্বাসনই যেহেতু সবচেয়ে বড় সমস্যা তাই আগে দেখাতে হবে সমাজ এমন নারীদের পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। আর ধর্ষণের শিকার হলে নারীটির প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে না। এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলেই কেবল ধর্ষকের ঘর করার গ্লানি থেকে রক্ষা করা যাবে এসব নারীকে। এক্ষেত্রে পূর্ণিমার উদাহরণকে সামনে দেখিয়েছেন তারা। পাবনায় নির্বাচনি ঘটনার জের ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের সময় ধর্ষণের শিকার হওয়া পূর্ণিমা এখন নিজেই নিজের মতো করে দাঁড়িয়েছেন। তিনি নিজেই এখন নারীনেত্রী হিসেবে সমাজে কাজ করছেন। এই উদাহরণগুলো সামনে আসতে হবে।

গত দুই বছরে ধর্ষণের ঘটনায় সংবাদ হয়েছে এরকম বেশ কয়েকটি ঘটনার মামলার অগ্রগতি বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, দায়ের করা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে। কেন মামলা তুলে নিয়েছেন প্রশ্নে মামলার বাদীরা সরাসরি কিছু বলতে চান না। ধর্ষক এখন এলাকায় আছে কি না বা পরবর্তী সময়ে কোনও হয়রানি করেছে কি না প্রশ্ন করে জানা গেছে, ধর্ষক-ভিকটিম সংসার করছে।

উন্নয়নকর্মী ও নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন ফারহানা হাফিজ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রথমত, ধর্ষণ আইনত অপরাধ। তাই ধর্ষক একজন অপরাধী। কোনও অপরাধীর সঙ্গে তো বিয়ে হতে পারে না। আর যেখানে অপরাধটা ওই নারীর প্রতি করা হয়, সেখানে ওই নারীর বিয়ে কী করে অপরাধীর সঙ্গে সম্ভব? দ্বিতীয়ত, ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সমাজের যে মনঃস্তত্ত্ব কাজ করে তা হলো, মেয়েটির সতীত্বকে ঘিরে পারিবারিক সম্মান রক্ষার প্রচলিত যে ধারণা আছে, তাকে সমুন্নত রাখা। সমাজের এই ধারণাটি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি নারীকে বোঝাতে হবে যে ধর্ষণের শিকার হলে কারও সম্মানহানি হয় না। সম্মান বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন যদি হয়, তাহলে তা ধর্ষকের। কিন্তু আমরা এখনও নারীটির সম্মানহানি হয়েছে এমন ধারণা পোষণ করে ওই নারীটির প্রতি আরেকটি সামাজিক অপরাধ করি।

উই ক্যান বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ধর্ষণের শিকার হওয়া পর ভিকটিমকে ঘটনার প্রভাব থেকে বের করে আনা সবচেয়ে জরুরি। কেননা সমাজ তাকে স্পেস দেয় না। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে সমাজের প্রভাবশালী মোড়লরা। নির্যাতিতা নারীর পাশে দাঁড়ানোর ভান করে ও তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার নামে প্রথমে মেয়েটির পরিবারকে তারা ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে এবং ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। পরিবারকে তারা বোঝায়, ‘সমাজের চোখে ধর্ষণের শিকার মেয়েটি এখন খারাপ মেয়ে, তার সম্মান নেই। মেয়েটির কারণে পরিবারেরও সম্মান নেই। তাই এমন জীবনের চেয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ের মাধ্যমে সামজিক স্বীকৃতি পাওয়াটাই ভালো।’ বাধ্য হয়ে সমাজের মোড়লদের দেখানো পথটিই বেছে নিতে বাধ্য হয় ভিকটিমের পরিবার। আর পরিবারের চাপে ধর্ষককেই বিয়ে করতে বাধ্য হয় শিকার হওয়া মেয়েটি।

তবে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার নামে একদিকে যেমন অপরাধের শাস্তি পাওয়া থেকে অপরাধীকে বাঁচিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আরেকদিকে নারীকে আরেক দফা অপমান করা হচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার হতে হবে। আর এই বিচার হওয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধপ্রবণতা কমবে। তা না করে যদি অপরাধীকে এ ধরনের সমঝোতা করার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে কোনোভাবেই ভালো হবে না। এমন হলে ধর্ষক তার অপরাধের বিষয়টি অনুধাবনই করতে পারবে না। যারা এ ধরনের সমঝোতা করতে বাধ্য করে তাদের বরং শাস্তির ব্যবস্থা হওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন: 
ধর্ষণ মামলায় কেন আপসে বাধ্য হয় বাদীপক্ষ

ধর্ষণের বিচার পাওয়া যায় না যেসব কারণে

 

 

/ইউআই/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ