পুলিশের সমস্যা: শেষ পর্ব ট্রাফিক পুলিশের যত কষ্ট

Send
জামাল উদ্দিন
প্রকাশিত : ১২:৩৬, এপ্রিল ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৭, এপ্রিল ১৮, ২০১৯

রাস্তায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ (ছবি- সংগৃহীত)

রোদ-বৃষ্টি, ধুলো-বালি আর শব্দ দূষণ ট্রাফিক পুলিশের নিত্যসঙ্গী। দিন-রাত রাস্তায় থাকার কারণে নানা রোগে ভুগছেন তারা। এরমধ্যে সাইনোসাইটিস, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা লেগে থাকে সারাবছরই। যানবাহনের তীব্র হর্নের কারণে শ্রবণ সমস্যায়ও ভোগেন অনেকে। ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেও আছে নানা বিড়ম্বনা। গাড়িচালক ও পথচারীদের বেশিরভাগেরই রয়েছে আইন না মানার প্রবণতা। আইন মানাতে গেলেই নানা ধরনের হুমকি-ধমকির মুখোমুখি হতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। তারপরও এসব সামাল দিয়েই দায়িত্ব পালন করেন তারা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের দুঃখ-কষ্টের নানা কথা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাফিক পুলিশের কয়েকজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কনস্টেবল ও সার্জেন্টরা দিনে আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করলেও ইন্সপেক্টর থেকে ওপরের কর্মকর্তারা ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন। তারা আরও জানান, ট্রাফিক পুলিশের কোনও ছুটি নেই। কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি নেই। শুধু কি তাই? দিন-রাত পরিশ্রমের পরও তাদের জন্য কোনও ধন্যবাদও নেই।

দুর্ঘটনাসহ নানা ঝুঁকির মধ্যে ব্যস্ততম সড়কে কাজ করেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। এরপরও তাদেরকেই যানজটের জন্য নিত্য সাধারণ মানুষের গালমন্দ শুনতে হয়। সড়কে যানজট না থাকলে সেই কৃতিত্ব আর তাদের ভাগ্যে জোটে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তারা ঝুঁকি ভাতা পেলেও ট্রাফিক (নিরস্ত্র) বিভাগের কর্মকর্তারা তা পান না।

রাজধানীতে দায়িত্বরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সার্জেন্ট বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ২০০১ সালের ব্যাচে সার্জেন্ট হিসেবে যোগ দিয়ে এখনও তিনি সেই পদেই বহাল আছেন। একই ব্যাচে যোগ দেওয়া একজন এএসআই এক সময় তাকে স্যার বলে ডাকতেন। ওই এএসআই পরে এসআই হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে তাকে (সাজেন্টকে) ভাই ডাকা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হন। এখন তাকেই বরং সেই এএসআইকে (ইন্সপেক্টর) স্যার সম্বোধন করতে হচ্ছে। এই হলো ট্রাফিক পুলিশে কর্মরতদের বাস্তব অবস্থা। কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি না পেলে দায়িত্ব পালনেও উৎসাহ কমে যায়। পেশার প্রতি শ্রদ্ধাও থাকে না— বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘ দিনের কষ্টের কথা জানালেন এই সার্জেন্ট।

রাস্তায় দায়িত্ব পালনের সময় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেই নানা ধরনের হুমকি-ধমকির শিকার হতে হয়। কাগজপত্রসহ নানা কারণে যানবাহন আটকালে শুরু হয়ে যায় তদবির। প্রভাবশালীরা আইনকানুনের তোয়াক্কা করেন কমই। অনেকে আবার চাকরি খাওয়ারও হুমকি দেন। নানা ধরনের অপবাদও দেওয়া হয়। মামলা করলে বলা হয় ‘ঘুষ’ না দেওয়ায় মামলা দেওয়া হয়েছে। আবার মামলা না করলে বলা হয় ‘ঘুষ’ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কাগজপত্র দেখাতেও অনীহা চালক ও মালিকদের। অকারণে ট্রাফিক পুলিশকে গালমন্দ করা নিত্যদিনের ব্যাপার— রাজধানীতে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা।

রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ

 

৩৩ বছর ধরে ট্রাফিক পুলিশে কর্মরত আছেন কনস্টেবল মো. মোস্তফা। শুরুতে ঢাকার বাইরে কাজ করলেও গত ২৯ বছর ঢাকাতেই আছেন তিনি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। সোমবার (১৫ এপ্রিল) রাজধানীর আবদুল গনি রোডে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাফিক পুলিশের এই সদস্য বলেন, ‘ট্রাফিক আইন অমান্য করার ক্ষেত্রে বাধা দিলেই নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে প্রভাবশালী নেতা, ছাত্র ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ রয়েছেন।

মোস্তফা জানান, বছরের পর বছর রাস্তায় ডিউটি করার কারণে এখন তিনি কানে ভালো করে শুনতে পান না। তিনি মনে করেন— সারাক্ষণ গাড়ির হর্ন, আর রাস্তায় নানান ধরনের শব্দের কারণেই তার কানের এই অবস্থা।

তিনি বলেন, ‘অবৈধ পার্কিংয়ে সরকারি, বেসরকারি সব গাড়িই রাখা হয়। এটা আরেকটা বড় সমস্যা। এতে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। বিভিন্ন জায়গায় ট্রাফিক বক্স করা হয়েছে। অথচ, এসব বক্সে ওয়াশ রুম করা হয়নি।’ আশেপাশের অফিস বা মার্কেটে গিয়ে তাদেরকে বাথরুম সেরে আসতে হয় বলে তিনি জানান।

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেন কনস্টেবল মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘টানা আট থেকে ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে হয়। বসার সময়টুকুও পাই না। আজকাল কোমর ও মেরুদণ্ডে খুব ব্যথা হয়। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছেন। কিন্তু চাকরি করলে কি আর বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ আছে?’ তিনি বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টির দিনেও ডিউটি করতে হয়। রাস্তার ধুলো-বালিতে শুধু পোশাকই মলিন হয় না— রোদ, গরম, গাড়ির ধোঁয়া, গাড়ির হর্ন ইত্যাদি কারণে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভোগেন ট্রাফিক পুলিশরা।’

রাজারবাগে ট্রাফিক পুলিশের ব্যারাকে থাকেন কনস্টেবল আল আমিন। তিনি বলেন, ‘যারা ব্যারাকে থাকেন, তাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট। দিনভর ধুলো-ধোঁয়া ও শব্দের মধ্যে ডিউটি শেষে ব্যারাকে ফিরে প্রশান্তি ও বিশ্রামের কোনও সুযোগ নেই। দিন শেষে শান্তিতে একটু ঘুমানোরও সুযোগ নেই। অল্প জায়গার মধ্যে অনেককে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। একসঙ্গে অনেক মানুষ থাকলে নিজের মতো করে বিশ্রাম নেওয়া যায় না।’

ট্রাফিক কনস্টেবল মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কষ্টের কি শেষ আছে? একটু পানি খাওয়ার জন্যও সরতে পারি না। একটু সরলেই রাস্তায় গাড়ির জট লেগে যায়। গায়ে পুলিশের পোশাক, কিন্তু ধুলোবালির কারণে বেশিরভাগ সময়েই তা অপরিষ্কার ময়লা থাকে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে সরকারিভাবে বেশি পোশাকও দেওয়া হয় না। ফলে ময়লা পোশাক পরেই ডিউটি করতে হয়।’
ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) প্রবীর কুমার রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা ডিউটি করি— এটা ঠিক। কিন্তু পুলিশে যখন ঢুকেছি, তখন তো এগুলো জেনেশুনেই ঢুকেছি। মানুষের জন্য কাজ করবো। প্রয়োজনে সারাদিনই কাজ করবো। মূল সমস্যা হচ্ছে— রাস্তায় কেউই আইন মানতে চায় না। সবাই যদি আইন মেনে চলে, তাহলে রাস্তার পরিবেশ ভালো থাকবে। ট্রাফিক পুলিশের ভোগান্তিও কমে আসবে।’

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (উত্তর) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের অনেক সমস্যা আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। তাছাড়া, বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলছে। মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের কারণে ভিআইপি রোড ছোট হয়ে গেছে। আবার এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ের কাজ চলছে। এসব কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে। এখন ট্রাফিকে যে লোকজন আছে, তাতে মোটামুটি ঠিক আছে। স্ট্রাকচারাল সুবিধা না থাকলে লোকবল বাড়িয়েও লাভ নেই। কুড়িল বিশ্বরোডকে রিকশামুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ওই সড়কে বিআরটিসির বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রাস্তায় যারা কাজ করেন, তাদের বিড়ম্বনা আরও বেশি। বাথরুম, ওয়াশরুম সমস্যা রয়েছে। এগুলো বাড়ানো দরকার। ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা প্রায় সবারই। তবে সমস্যা থাকবেই, এক্ষেত্রে আমাদেরকে প্রফেশনালি কাজ করে যেতে হবে।’

আরও পড়ুন:

আবাসন-যানবাহন সংকট ও বিরতিহীন দায়িত্ব পালন

পুলিশে রেশনের চাল নিয়ে যত অভিযোগ

 

 

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ