নতুন প্রজন্মের প্রাথমিক বিদ্যালয় যেমন হতে পারে

Send
এস এম আববাস, পাবনা থেকে ফিরে
প্রকাশিত : ২২:১৫, এপ্রিল ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৯, এপ্রিল ২৫, ২০১৯

অ্যসেমব্লি শেষে বাজনার তালে তালে ক্লাসে ফিরছে শিক্ষার্থীরা

দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থীদের মানসিক গড়নের গাঁথুনি রচিত হয় এসময়। এজন্য প্রাথমিক পর্যায়েই যেন একজন শিক্ষার্থীর বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যেই ঢেলে সাজানো হয়েছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। পাবনার সদর উপজেলার বালিয়াহালট ক্লাস্টারের ২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি সরকারি শিশুকল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করা হচ্ছে, যেনো ‘একটি বিদ্যালয়ই একটি বাংলাদেশ’। 

এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত আধুনিক শিক্ষার ভিত তৈরি করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশপ্রেম, নন্দনবোধ ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ।  

এ ব্যাপারে ২০১৫ সালে পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক চকপৈলানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. আসলাম হোসাইনের উদ্যোগে বালিয়াহালট ক্লাস্টারের সব বিদ্যালয় এখন উন্নত। প্রতিটি বিদ্যালয়কে বাংলাদেশ হিসেবে উপস্থাপন করেছি, স্বপ্নের বিদ্যালয়ে যেনও শিক্ষার্থীর স্বপ্নও বড় হয়।’

নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেবেকা সুলতানা বলেন, ‘বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই একটি শিশু নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে নিজের দেশ ও বিশ্বকে নিয়ে। এজন্য শিশুর জ্ঞান অর্জনের পথ যেন বিদ্যালয়ে উন্মুক্ত থাকে। শিক্ষকরাও যেন বিদ্যালয়কে আপন করে নিতে পারেন, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

আমার বিদ্যালয়, আমার স্বপ্ন

প্রতিটি বিদ্যালয়কে শিশুদের স্বপ্নচাষের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। তাই এই স্লোগানটি সামনে রেখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানসপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনাকে একটি দেশের আদলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা দায়িত্ববোধ ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সদর উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আসলাম হোসাইন বলেন, ‘শিশুটি কত বড় হবে, তা নির্ভর করে তার স্বপ্ন দেখার ওপর। স্বপ্ন দেখতে না শিখলে সে তো বড় হতে শিখবে না। তাই এই স্লোগানটি সামনে রেখে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মানসপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।’

প্রাক প্রাথমিকের ক্লাসরুম

গুগল কক্ষ

বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন প্রক্রিয়াকে আধুনিকীকরণ করতে যত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম  হলো ‘গুগল কক্ষ’। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘গুগল কক্ষ’ নামে একটি কক্ষ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কক্ষটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য তথ্য জাদুঘর হিসেবে কাজ করবে। দেশ-বিদেশের কোনও ঐতিহাসিক স্থান শিক্ষার্থীদের দেখানো এবং নতুন কোনও তথ্য জানতে গুগলের সহায়তা নিতে কক্ষটি খোলা হচ্ছে।

সম্প্রতি নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘গুগল কক্ষ’ উদ্বোধন করা হয়। ক্লাস্টারের অন্য বিদ্যালয়গুলোতেও ‘গুগল কক্ষ’ চালু করা হবে বলে জানান সহকারী শিক্ষা অফিসার মো. আসলাম হোসাইন।  

মুক্তিযুদ্ধ কর্নার

ক্লাস্টারের ২২টি বিদ্যালয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের সব তথ্যের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ও ঐতিহাসিক ছবি রাখা হয়েছে জাদুঘরে।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধ

বিদ্যালয়গুলোতে কাঠের তৈরি জাতীয় স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের সুবিধাজক স্থানে রাখা হয়েছে এসব রেপ্লিকা। তবে অনেক বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নারেও রাখা হয়েছে কাঠের তৈরি এই সৌধ। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে এই উপকরণটি ব্যবহার করা হচ্ছে। 

আলোকচিত্র ফলক

ক্লাস্টারের প্রতিটি বিদ্যালয়ে করা হয়েছে আলোকচিত্র ফলক। এই ফলকে স্থান পেয়েছে স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আলোকচিত্র। বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ছবি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ছবি এবং শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদযাপনের ছবি দিয়ে এটি সাজানো হয়েছে।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে ফুলের বাগান

বালিয়াহালট ক্লাস্টারের প্রতিটি বিদ্যালয়ে করা হয়েছে ফুলের বাগান। কোনও বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়, আবার কোনও বিদ্যালয়ের ছাদে রয়েছে এই বাগান। শিক্ষার্থীরা এসব বাগান নিজেরাই পরিচর্যা করেন।  

ইছামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলিয়া মাদ্রাসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদে ফুলের বাগান করা হয়েছে। 

ইছামতি বিদ্যালয়ে নিজেদের ফুলগাছের পরিচর্যায় শিক্ষার্থীরা

প্রাথমিকেই অ্যালামনাই

বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়ে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সাবেকদের সহযোগিতা ও তাদের মাধ্যমে শিশুদের অনুপ্রাণিক করার জন্য এই অ্যাসোসিয়েশন করা হচ্ছে।

ইছামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা গত বছর বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক আইন প্রশিক্ষণ

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যালয়গুলোতে কাব গঠন, হলদে পাখি কার্যক্রমসহ সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অগ্নি নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতার কর্মসূচি চালু রয়েছে।

এ ব্যাপারে সহকারী শিক্ষা অফিসার মো. আসলাম হোসাইন বলেন, ‘বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় সড়কের সঙ্গে অবস্থিত, এজন্য শিক্ষার্থীদের সড়ক পার হওয়া এবং অন্যকে সড়ক পার করানোর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।’

সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মির্জ্জা গোলাম মহম্মদ বেগ বলেন, ‘‘শিশু শিক্ষার্থীরা তাদের মতো করে বিদ্যালয়কে দেখবে। একইভাবে শিক্ষকরাও আপন করে দেখবে তার প্রতিষ্ঠানটিকে।  এ কারণে ‘আমার বিদ্যালয়, আমার স্বপ্ন’ স্লোগান ব্যবহার করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য, একটি বিদ্যালয়ে দেশের সব তথ্য থাকবে। শিশুরা দেশ ও বিশ্বকে জানবে তার বিদ্যালয় থেকেই।’’

পাবনার সদর উপজেলার বালিয়াহালট ক্লাস্টারে আধুনিক ও ব্যতিক্রমী এসব উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আসলাম হোসাইনের অনেকগুলো ভালো ইনোভেশন রয়েছে।’ এই উদ্যোগগুলো প্রাথমিকের শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনে দৃষ্টান্ত রাখবে  বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। 

 

/এএইচ/টিএন/

লাইভ

টপ