আবরার হত্যা: দৈনিক ১ হাজার ৩০ টাকায় চলতো সুপ্রভাত বাসটি

Send
তোফায়েল হোছাইন
প্রকাশিত : ০৩:৫৫, এপ্রিল ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৪:০৩, এপ্রিল ২৬, ২০১৯

সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসবেপরোয়া বাসের ধাক্কায় শিক্ষার্থী আবরার চৌধুরী নিহতের ঘটনায় জড়িত সুপ্রভাত বাসটির ঢাকা মহাখালী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত রুট পারমিট থাকলেও বাসটি চলতো সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্ক টু গাজীপুর রুটে। বিনিময়ে সুপ্রভাত পরিবহনের সভাপতি ও সেক্রেটারির নিয়োজিত ব্যক্তিকে দৈনিক ১ হাজার ৩০ টাকা করে দিতে হতো। বাসটি ৪৫ আসনের হলেও পরবর্তীতে চার আসন বাড়িয়ে ৪৯ আসন করাসহ অদক্ষ চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপার নিয়োগ দেন বাসের মালিক ননি গোপাল সরকার। মামলার অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাজী শরিফুল ইসলাম সুপ্রভাত বাসের মালিক- চালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে প্রথম ঘটনায় বলা হয়, মিরপুর আইডিয়াল গার্লস ল্যাবরেটরি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে ধাক্কা দেওয়ায় ওই শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় বাস চালক সিরাজুল ইসলাম ও মালিক ননী গোপাল সরকারসহ চারজনকে অভিযুক্ত করে দণ্ডবিধির ২৭৯/৩৩৮-ক/১০৯ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
অভিযোগপত্রে দ্বিতীয় ঘটনায় বলা হয়, যমুনা ফিউচার পার্কের কাছে নর্দ্দার আইকন টাওয়ারের সামনে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার চৌধুরীকে চাপা দিয়ে নিহতের ঘটনায় মালিক ননী গোপাল সরকার ও কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাতের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২৭৯/৩০৪/১০৯ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
এতে বলা হয়, ঘটনার আগের দিন ১৮ মার্চ রাতে চালক সিরাজুল ইসলাম, কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাত ও হেলপার ইব্রাহিম হোসেন গাঁজা খেয়ে বাসের মধ্যে ঘুমায়। ঘটনার দিন ১৯ মার্চ সকাল ৬ টার দিকে সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে ৬/৭ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি ছাড়ে। এরপর সকাল ৭ টায় সুপ্রভাত বাসটি শাহজাদপুর বাঁশতলা এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুর আইডিয়াল গার্লস ল্যাবরেটরি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনায় চালককে আটক করা হয়। পরবর্তী আবার মালিকের নির্দেশ কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাত ঘাতক বাসটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় যমুনা ফিউচার পার্কের কাছে নর্দ্দার আইকন টাওয়ারের সামনে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার চৌধুরীকে চাপা দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে। এতে ঘটনাস্থলে আবরার নিহত হন।
মালিক ননী গোপাল সরকারের অপরাধ
১. বিআরটিএ ও রুট পারমিট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে অনুযায়ী বাসটি ৪৫ আসন হওয়া সত্ত্বেও তা পরিবর্তন করে ৪৯ আসন করেন।
২. ঢাকা মহাখালী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত রুট পারমিট থাকলেও বেআইনিভাবে সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্ক টু গাজীপুর রুটে চালাতেন।
৩. ড্রাইভিং লাইসেন্স হালকা হওয়া সত্ত্বেও চালক সিরাজুল ইসলামকে নিয়োগ দেন।
৪. ড্রাইভার না হওয়া সত্ত্বেও কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাতকে বাস নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

চালক সিরাজুল ইসলামের অপরাধ
১. চালক সিরাজুল ইসলাম হালকা লাইসেন্স সনদধারী হলেও বাসটি চালানোর অনুপযুক্ত ছিলেন।
২. বেপরোয়া গতিতে শাহজাদপুর বাঁশতলা এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুর আইডিয়াল গার্লস ল্যাবরেটরি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে ধাক্কা দিয়ে গুরুতর আহত করেন।

কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাতের অপরাধ
কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাত ড্রাইভার নয় এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও বাসটি চালান।

হেলপার ইব্রাহিম হোসেনের অপরাধ
হেলপার ইব্রাহিম হোসেন একজন হেলপার হয়েও সঠিকভাবে সিগন্যাল না দেওয়া এবং বেপরোয়া গতিতে রেষারেষিভাবে বাস চালাতে চালক সিরাজুল ইসলামকে সহযোগিতা করেন।

সুপ্রভাত বাস রুটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অপরাধ
অবৈধভাবে রুট পরিবর্তন করে সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্ক টু গাজীপুর রুটে টাকার বিনিময়ে চলতে দেওয়া সুপ্রভাত বাসের রুটের সভাপতি আলাউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফ উভয়ের বিরুদ্ধে রুট পারমিট বাতিলসহ অন্যান্য উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়।
প্রসঙ্গত, ১৯ মার্চ ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা থেকে সুপ্রভাত বাসটি ছেড়ে আসে। তখন চালক ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। বাসটি গুলশানের শাহজাদপুর বাঁশতলা এলাকা অতিক্রম করার সময় মিরপুর আইডিয়াল গার্লস ল্যাবরেটরি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে চাপা দেয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। তখন পরিবহনের যাত্রীরা চালক সিরাজুলকে ট্রাফিক পুলিশে সোপর্দ করেন। ঘটনাস্থলের কিছু দূরে বাসটি রাখা হয়। এ সময় কন্ডাক্টর ইয়াসিন আরাফাত বাসের মালিকের কাছে ফোন দিয়ে জানায়, বাসটি এখানে থাকলে জনগণ পোড়াতে বা ভাঙচুর করতে পারে। তখন মালিক আরাফাতকে দ্রুত বাসটি সেখান থেকে নিয়ে সরে পড়তে বলেন। এরপর চালকের আসনে বসে কন্ডাক্টর বাসটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় প্রগতি সরণিতে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার চৌধুরী বাসটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান।

আরও পড়ুন: সুপ্রভাত বাসের মালিকসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

                সুপ্রভাত বাসের মালিকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

              নর্দ্দা এলাকায় বাসচাপায় শিক্ষার্থী নিহত, সড়ক অবরোধ

            আবরারকে চাপা দেওয়া বাসের বিরুদ্ধে ছিল ২৭ মামলা

 



 

/ওআর/

লাইভ

টপ