‘সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে জঙ্গিবাদ ভিন্ন নামে আসবে’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২২:০৯, এপ্রিল ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৩০, এপ্রিল ৩০, ২০১৯

single pic template-1 copyএদেশে একসময় সর্বহারা জঙ্গি ছিল। বর্তমানে উত্থান ঘটেছে ইসলামিক জঙ্গির। জঙ্গিবাদের ধরন পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। ভবিষ্যতে হয়তো আরেকভাবে আসবে। তাই চলমান সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে জঙ্গিবাদ ঘুরেফিরে ভিন্ন নামে আসবে। অন্যদিকে,  এ নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে।         

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘শ্রীলঙ্কায় নারকীয় জঙ্গি হামলা, এরপর?’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন বক্তারা। মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (৩০ মার্চ) বিকালে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে অনুষ্ঠিত হয় সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

4এ সময় বেসরকারি টিভি চ্যানেল ডিবিসির সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, ‘এদেশে জঙ্গিবাদের ঘটনা নতুন নয়। প্রথম জঙ্গি আক্রমণ ধরা যায় ’৯৯ সালে উদীচীর হামলা। তখন তো আইএস ছিল না। '৯৮-এ আল কায়েদা মাথাচাড়া দেয়। ওখানেও ফজলুর রহমান নামে বাংলাদেশের একজন ছিল। এই সমাজ ব্যবস্থা যদি আপনি বদলাতে না পারেন, তাহলে ঘুরেফিরে অন্য নামে জঙ্গিবাদ আসবে। এদেশে ইসলামিক জঙ্গি আছে। একসময় তো সর্বহারা জঙ্গি ছিল। সেটির ধরন পরিবর্তন হয়েছে। সেজন্য বলছি, সমাজটা যেন এমন না হয়।’

প্রযুক্তির কারণে জঙ্গিবাদ সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইএসকে সিরিয়া থেকে এসে এখানে যুদ্ধ করতে হবে কেন? আল কায়েদা কি সারা বিশ্বে সংগঠন তৈরি করতে পারবে?  আল কায়েদা একটি কনসেপ্ট, একটি আইডিওলজি। এখান থেকে বসে এটি ধারণ করতে তো সিরিয়ায় গিয়ে যুদ্ধ করা লাগে না। বাগদাদি এসে বলেছে, “লোন উলফ” হক অ্যাটাক হোক। কেউ সেই অনুযায়ী আক্রমণ করলো! নামমাত্র আইএসপন্থী যারা, তারা বাচ্চাসহ আইএসের হয়ে বাইয়াত নিচ্ছে। তার জন্য তো সিরিয়া যাওয়া লাগছে না, দেশের কোনও এক প্রান্তে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করেই জঙ্গি হওয়া যায়। সেই হাজী শরিয়তউল্লাহ, তিতুমীরের মতো ইসলামিক স্টেটের কথাই তো বলছে এরা। তাই আমি সে জায়গা থেকে বলছি, আমরা চিন্তা করিনি সমাজ থেকে এটা জন্ম হয়।’

রাতারাতি একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনমানসিকতার পরিবর্তন হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আজকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু মৌলবাদ নিয়ে কথা বলি না। সমাজটাকে আমরা ধীরে ধীরে ওই জায়গায় নিয়ে গিয়েছি।  একমাত্র রাজনৈতিক শক্তিই এটাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে। ওই রাজনৈতিক শক্তি এখানে দিনের পর দিন দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে মৌলবাদ ঢুকেছে। সরকারের কাঠামোর মধ্যে ঢুকেছে। এটা প্রতিরোধ করতে যদি উদার গণতান্ত্রিক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা না থাকে, তাহলে পুলিশের কাউন্টার টেরোরজিমের মনিরুল ইসলামকে দিয়ে ১০০, ২০০, ৫০০ জঙ্গি মারতে পারবেন, জঙ্গিবাদ দমাতে পারবেন না।’   

3এ সময় শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর (অব.) আশরাফ উদ দৌলা বলেন, ‘গত ২০-২৫ বছরে আমাদের সমাজের একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে। আমি গ্রামেই বড় হয়েছি। আমি কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে একটা ‘কমিউনাল ভায়োলেন্স’ সেটা লক্ষ করিনি। কিন্তু গত ২০-২৫ বছরে আমাদের গ্রামে-গঞ্জে এতো বোরখা পড়া মানুষ দেখেছি, যেটা আমি আগে কখনও দেখিনি। হয়তোবা এখন স্কুল-কলেজ বেশি হয়েছে, মেয়েরা স্কুলে বেশি যাচ্ছে, সেটাও একটা কারণ হতে পারে।’

2বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে উল্লেখ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেছেন,  ‘কখনও কখনও আমাদের কাছে মনে হয়েছে, কোনও কোনও শক্তি জোর করে প্রমাণ করতে চাচ্ছে বাংলাদেশে আইএস আছে। তারা এটি  বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকার করতে বাধ্য করাতে চাচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন,  ‘বাংলাদেশকে ঘিরে ইতোপূর্বে আমরা একটি তৎপরতা লক্ষ করেছি। ২০১৬ সালে  হলি আর্টিজানের ঘটনার দুই থেকে তিন বছর আগে যখন  সারা দেশে একের পর এক টার্গেট কিলিং হচ্ছিল, তখন সারা বিশ্ব থেকে আমরা নানা মন্তব্য পাচ্ছিলাম। সে সময় আমাদের কাছে মনে হয়েছিল, বিশ্বের একটি পক্ষ বা শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু মানুষ সুর মিলিয়েছিলেন, বাংলাদেশে আইএস এসে গেছে।’

1ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেছেন, ‘হলি আর্টিজানের ঘটনার পরে জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা অনেক গুণ বেড়েছে। আমাদের রেগুলেশন করা, ইন্টারনেট ট্র্যাক করা, আমাদের ফোন কল ট্র্যাক করা, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বহুগুণ বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অধিকতর ধারণা নিয়ে আসছেন।’

ইউরোপ আমেরিকাতেও জঙ্গিবাদ রয়েছে উল্লেখ করে আব্বাসী বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশে কেনো জঙ্গিবাদ থাকবে?  এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার! জঙ্গির উত্থান তো যুক্তরাষ্ট্রতেও হচ্ছে, যুক্তরাজ্যতেও হচ্ছে, ফ্রান্সে হচ্ছে, জার্মানিতে হচ্ছে। এখানে আমাদের একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ সাম্প্রতিককালে অনেক এগিয়েছে। এখন কিন্তু আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা মিলেমিশে কাজ করছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আগের তুলনায় অনেক ভালো। আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে। এখন বিষয়টি দাঁড়িয়েছে– “সব দোষ গরিবের” মতো। এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো কেনো নেপালের ঘটনা আড়াল করে বাংলাদেশেরগুলো তুলে ধরছে? দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ কখনও কখনও অপসাংবাদিকতার শিকার হয়।’       

5জঙ্গিবাদের উত্থান প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘মৌলবাদী শক্তিকে রাজনৈতিক কাজে প্রধান দুই দলই ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমরা “মৌলবাদ থেকে বেরিয়ে আসবো” এই জায়গায় তারা একমত হতে পারেনি। আইএস আছে কিংবা নেই এই বিতর্কগুলো চলতে পারে একদিকে, পাশাপাশি অনলাইনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সেটাকে থামাতে হবে। সেটা থামাতে গেলে রাজনৈতিক পথ লাগবে।’

এর সমাধানে সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও মজবুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, আমাদের সমাজ ভেঙে গেছে। এই ভেঙে যাওয়া সমাজ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। দলীয়করণের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসা খুবই জরুরি। না হলে আমাদের সমাজের এই জায়গা থেকে উঠে আসা খুবই কষ্টকর।’

6

 ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এসও/এমএএ/

লাইভ

টপ