‘ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে সাংবাদিকতা’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ০০:০২, মে ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২১, মে ১৪, ২০১৯

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিসময়ের প্রয়োজনে সাংবাদিকতার ধরনে আসছে নানা পরিবর্তন। অনলাইনের মতো নতুন সংবাদমাধ্যম সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে এই সেক্টরটি বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা। সাংবাদিকতার সঙ্গে রাজনীতি একাকার হয়ে গেছে। এখনও আমাদের মিডিয়া সেক্টর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এছাড়া রয়েছে পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য নানা সংকট। অনেকেই আবার পেশাদারিত্বের জায়গায় দৃঢ় না থেকে সরে আসছেন। যার ফলে এক ধরনের আস্থাহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে। এমন নানারকম সংকট নিয়ে সাংবাদিকতা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলে মনে করছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘বদলে যাচ্ছে সাংবাদিকতা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন তারা।  মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে শুরু হয় সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

single pবৈঠকিতে আমাদের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেছেন,  ‘এখনও আমাদের গণমাধ্যম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে রাজনীতির যুক্ত হওয়ার বিষয়টা দুঃখজনক।  হয় ব্যবসা, না হয় রাজনীতির কারণে মিডিয়াকে একটা অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যমের বিকাশ হয়েছে এরকম নজির খুবই কম। যে কারণে বারবার আমাদের মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে।’

গণমাধ্যমকর্মীদের সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি তারা চরম একটি ক্রাইসিসে আছি। সেটার চিত্র দ্রুত ফুটে উঠছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে হয়তো দেখা যাবে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে আসে। এতগুলো পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন কোনওটারই কিন্তু একটা স্ট্রিম লাইন হয়নি। যাকে-তাকে টেলিভিশন চ্যানেল খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, ফলে এখানে সরকারের দায় নেই এই কথাটা আমি বলবো না।’  

60189336_1082398508624913_798623703830102016_nবেসরকারি টিভি চ্যানেল চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের বার্তাপ্রধান রাহুল রাহা বলেছেন, ‘যেই গরজ নিয়ে আমরা সাংবাদিকতা শুরু করেছি, সেটা কি এখন আছে? একাত্তর পরবর্তী সময়, স্বৈরাচারের সময় যেই সাংবাদিকতা হয়েছে– সেটা কি এখন আছে? সেইভাবে বুক ফুলিয়ে কি কেউ বলতে পারছে? আমি যেটা ভয় পাই– “ধান্ধাবাজি সাংবাদিকতা” ঢুকে পড়েছে। গণমাধ্যম যার ইচ্ছা খুলছে, যা ইচ্ছা ছাপাচ্ছে, মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এরা প্রকৃত সাংবাদিকতাকে ক্ষতি করছে, চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে এবং এই চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি। আমাদের এই চ্যালেঞ্জটা মোকাবিলা করতে হয়।’

60347707_657519934683479_67924877721468928_nঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘সাম্প্রতিক কালে কয়েকটি রিপোর্ট করা হয়েছে যেখানে সরকারের দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে প্রমাণসহ। এক্ষেত্রে সাংবাদিককে গ্রেফতার বা হয়রানি করা হয়েছে তা আমার চোখে পড়েনি। যেসব কারণে সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হয়েছেন সে জায়গায় অন্য বিষয় জড়িত। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যখন আপনি রিপোর্ট করেন, তারা মামলা করে দেয়। রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব আছে, যখন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো সাংবাদিকদের হয়রানি করে, তখন তাকে নিরাপত্তা দেওয়া। সেই নিরাপত্তা আদায় করতে গেলে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আছে, সাংবাদিকতার বডিগুলোর দায়িত্ব আছে। সেইদিক থেকে মনে হয় আমরা দুই জায়গায় পিছিয়ে আছি– প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নেই, সাংবাদিকদের সমাজের কাছে সুরক্ষা নেই। সেই কারণে সেলফ সেন্সরশিপটা বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইদানীংকালে আমাদের অনেক গণমাধ্যম আছে।  ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে– “মিডিয়া সেক্টর ইজ ইন ফ্লাক্স নাউ”। এক ধরনের উত্থান-পতন এক ধরনের ভাঙাচোরার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। হাজার হাজার অনলাইনের রেজিস্ট্রেশনের কথা অনেক দিন ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেই। যার ফলে যারা সত্যিকারের সাংবাদিকতা করছে, তাদের সঙ্গে যারা ফেক নিউজ প্রচার করছে তাদের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায় সাধারণ মানুষের। সংবাদপত্রে রাজনীতিটা কিন্তু নতুন না। এটা আগেও ছিল, শুধু ধরনটি পরিবর্তন হয়েছে। কারণ সাংবাদিকরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতেই পারেন।’

60000825_309323129982802_2372758689879687168_nঅনলাইন সংবাদ মাধ্যমের সফলতা ও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেছেন,  ‘অনলাইনের কারণে সংবাদ এখন খুব দ্রুত সব জায়গায় পৌঁছে যায়। এই তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিক কত দ্রুত সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারবেন, তার ওপর নির্ভর করবে ওই অনলাইন মাধ্যমের নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠা। ফেসবুকের কল্যাণে অনলাইনে সংবাদ ছাপার আগেই মানুষ তা জেনে যায়। তাহলে পাঠক কেন নতুন কিছু পড়বে? অনলাইন পত্রিকা যদি নির্ভরযোগ্য হয় তাহলে পাঠক পড়বে। এজন্য পড়বে যে, তথ্যটির সঠিকতা যাচাই করেই এখানে ছাপা হয়েছে।’

সময়ের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,  ‘একটা সময় খবর মানুষের মুখে মুখে পৌঁছে যেতো। কেউ একটা কথা বললে সেটা তার থেকে মানুষের মুখে মুখে সবখানে পৌঁছে যেতো। তারপর ধীরে ধীরে পত্রিকা, রেডিও, টিভিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা সংবাদ জানতে পেরেছি। এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অনলাইন সবচেয়ে বড় মাধ্যম। অনলাইনে ছবি, ভিডিওসহ সংবাদের সব উপাদান একসঙ্গেই পাওয়া যাচ্ছে। আমরা যখন বাংলা ট্রিবিউন শুরু করি তখন ভেবেছি, নতুন কী করা যায়? তখন আমাদের প্রকাশক সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন অনলাইন পত্রিকা করার। বর্তমান যুগে পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সনে যাওয়া খুব কঠিন। এছাড়া তরুণদের কাছে পৌঁছতে হলে অনলাইন এমন একটি মাধ্যম যেখানে সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যায়।’

এ সময় গণমাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রসঙ্গে জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যখন গণমাধ্যমে যুক্ত হন তখন তারা চিন্তা করেন, এর মাধ্যমে তিনি ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখবেন। ব্যবসা থেকে তিনি  ২০০-৫০০ কোটি টাকা আয় করবেন। তিনি ব্যবসা থেকে ঠিকই আয় করেন, আবার দুই বছর পরে গণমাধ্যম থেকেও লাভ চান। এখন গণমাধ্যম থেকে লাভও চাইবেন আবার অন্য ব্যবসা থেকে লাভ করবেন এটা তো একসঙ্গে সম্ভব নয়।’

60011455_2247618265354119_6655714637390020608_nএখনকার সাংবাদিকতায় নতজানু মানসিকতার সমালোচনা করে বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ বলেছেন, ‘আমি মনে করি না যে, সাংবাদিকতায় আস্থার জায়গাটি একেবারে শেষ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ কিন্তু সাংবাদিকদের আস্থার জায়গায় নিতে চায়। দেশের মানুষ কিন্তু এখনও সাংবাদিকতা পছন্দ করে। এখনও খেয়াল করবেন,  সাধারণ মানুষ কোথাও কোনও সমাধান না পেলে সাংবাদিকের দারস্থ হন। এই আশায় যে, এখানে একটি সমাধান পাওয়া যাবে। এটি একটি পজিটিভ দিক। তাহলে কেনো সাংবাদিকতায় আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে? এর একটি কারণ হচ্ছে, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা। সেক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে,  “আমরা এক ধরনের চাপের মুখে আছি।” আমি কিন্তু বিষয়টি দেখি উলটোভাবে। পৃথিবীতে এমন কোনও দেশ নেই যেখানে চাপ নেই। আসলে কেন জানি আমাদের ভেতরে একটি আত্মসমর্পণের মানসিকতা তৈরি হয়েছে।’

সাংবাদিকতার সংকট প্রসঙ্গে হারুন উর রশীদ বলেন,  ‘আমার মনে হয় সাংবাদিকতার সংকটে যে জায়গাটি বেশি আলোচিত সেটি হচ্ছে, পেশাদার সাংবাদিকের সংকটকাল। সাংবাদিকরা পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে কেউ কেউ সরে আসছেন। তাতে আস্থাহীনতার একটা জায়গা তৈরি হচ্ছে। গত দুই দশকে প্রচুর সংবাদ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশে। সংবাদমাধ্যম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ব্যবহার করা হয় অন্যভাবে।’ 

60077298_840722282977638_1966506151486947328_n (1)অনলাইন নিউজ পোর্টাল সারাবাংলা ডট নেটের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক রফিকুল্লাহ রোমেল বলেন, এ সময়ের সাংবাদিকতা পর্যালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘হিট বেশি হলে আয় বেশি হবে এটা একদম সহজ হিসাব। এটা কিন্তু একটি স্বয়ংক্রিয় একটি প্রক্রিয়া। হিট বাড়ানোর যে প্রতিযোগিতাটা এখন আমরা দেখি, সেখানে বড় অংশে সাংবাদিকতা খুব কঠিন। বাংলা ট্রিবিউন কিন্তু ব্রেকিং কনসেপ্ট থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে। ৫-৬ মিনিট পর একটি নিউজ আসে, সেখানে বেসিক জিনিসগুলো থাকে। কিছু অনলাইন ডোমেইন আছে, তারা কোনও সাংবাদিকতার মধ্যে নেই। ওদের হিট কিন্তু মূলধারার পত্রিকার চেয়েও বেশি। তিন মিনিটের মধ্যে একটি ব্রেকিং নিউজ দিয়ে বাকিটা “আসছে” বলে যখন ছেড়ে দিচ্ছে, তার ভেতরে কিন্তু আসলে সাংবাদিকতা নেই। থাকে না। আসলে সম্ভব না। সুতরাং সাংবাদিকতা বদলে যাচ্ছে।’

মুন্নী সাহারাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা গেছে এ আয়োজন।

 

/এসও/এমএএ/

লাইভ

টপ