গাবতলীর হাটে অতিরিক্ত খাজনা, প্রভাব পড়ে মাংসের দামে

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১২:৩৮, মে ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৪, মে ১৪, ২০১৯

মাংসের দোকানঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মালিকানাধীন গাবতলী পশুর হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ হাটের ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ক্রেতারা বলছেন, ইজারাদার অতিরিক্ত খাজনা আদায় করায় পশুর দাম বেশি পড়ে। এ কারণে মাংসের দামও বেড়ে যায়।
ডিএনসিসির এই হাটের ইজারার শর্তে বলা আছে, সাধারণ ক্রেতাদের জন্য প্রতিটি পশুর মূল্যের ওপর সাড়ে তিন শতাংশ এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঈদের দিনসহ আগের চার দিনের জন্য পাঁচ শতাংশ খাজনা (হাসিল) আদায় করতে হবে। তবে বছরের যেকোনও সময়ে মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য ছাগল ও ভেড়াপ্রতি ৩৫ টাকা, গরুপ্রতি ১০০ টাকা ও মহিষপ্রতি ১৫০ টাকা খাজনা আদায় করতে হবে।
মাংস ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হাটের ইজারাদাররা এই শর্ত মানছেন না। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো পশুর খাজনা আদায় করে থাকেন। দেখা গেছে, এক্ষেত্রে মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য যে শর্ত রয়েছে, সেটা না মেনে বরং সাধারণ ক্রেতাদের জন্য যে হারে খাজনা আদায় করা হয়, মাংস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সেই অনুপাতে খাজনা আদায় করেন ইজারাদাররা। ফলে এক লাখ টাকা দামের একটি গরুতে যেখানে মাংস ব্যবসায়ীদের ১০০ টাকা খাজনা দেওয়ার কথা, সেখানে আদায় করা হচ্ছে সাড়ে তিন হাজার টাকা। আর তিন লাখ টাকার গরুতে খাজনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫০০ টাকা।

গাবতলী হাটে খাজনা নিয়ে কথা হয় কুষ্টিয়ার ব্যাপারী মিন্টু হোসেনের সঙ্গে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ক্রেতাদের যেমন অতিরিক্ত খাজনা দিতে হয়, ঠিক বিক্রেতা বা গরু ব্যবসায়ীদেরও পথ পথে অতিরিক্ত খাজনা দিতে হচ্ছে। গ্রাম থেকে একটি গরু ঢাকায় আনতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়ে।’

তিনি জানান, দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গরুর কোনও ট্রাক যখন গাবতলী হাটে প্রবেশ করে সেখানে পশু নামানোর স্থানে (তাদের ভাষায় বিট বলা হয়) দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা। এছাড়া শ্রমিক বাবদ আরও ৬০০ টাকা দিতে হয়। পশু বিক্রি না হলে কিংবা অন্য হাটে নিতে হলে, পশু বের করার সময় ফের আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়।

মিন্টু হোসেন আরও জানান, সাধারণ মানুষ যদি কোনও পশু ক্রয় করেন তাহলে তাকে মোট দামের ওপরে সাড়ে তিন শতাংশ খাজনা দিতে হয়। ক্রেতা মাংস ব্যবসায়ী হলে ৫০ হাজার টাকার গরুর জন্য ৫০০ টাকা এবং তার ওপরে দাম হলে এক হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া রয়েছে ট্রাক ভাড়া, শ্রমিক খরচ, ব্যাপারীর লাভ ও থাকা-খাওয়ার খরচ তো আছেই। এই পুরো খরচই পশুর দামের ওপরে পড়ে। আর এভাবেই পশুর দাম বেশি হওয়ায় মাংস ব্যবসায়ীরা দামও বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য ছাগল ও ভেড়াপ্রতি ৩৫ টাকা খাজনা হলেও ইজারাদার আদায় করছে ১০০ টাকা করে। এক্ষেত্রে ব্যাপারীকেও দিতে হয় ১০ টাকা।

একই অভিযোগ পুরনো ঢাকার মাংস ব্যবসায়ী খবিরুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে মাংস ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু মাংস ব্যবসায়ী হিসেবে সিটি করপোরেশন যে সুবিধা দিয়েছে, আমরা সেই সুবিধাটুকু পাই না। হাটে সাধারণ ক্রেতাদের মতোই আমাদেরও গরুপ্রতি খাজনা দিতে হয়।’

এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন ইজারাদাররা। তারা বলছেন, গাবতলী হাটে চাঁদাবাজি বা অতিরিক্ত খাজনা আদায় করা হয় না। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত হারেই তারা খাজনা নেন। অতিরিক্ত খাজনার কারণে মাংসের দাম বেশি পড়ে— মাংস ব্যবসায়ীদের এই দাবিকে অযৌক্তিক বলছেন তারা।

জানতে চাইলে গাবতলী পশুর হাট কর্তৃপক্ষের সদস্য সানোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা শুধু গাবতলী হাট থেকেই পশু কেনেন না। তারা অন্যান্য হাট থেকেও গরু কেনেন। গাবতলী ছাড়া আরিচা হাটে ৫১০ টাকা, আশুলিয়ায় ৪০০, কেরানীগঞ্জের পাড়াগাঁওয়ে ৪০০, ফরিদপুরের অরুণখোলায় ৬০০, ধামরাইয়ে ৫০০, কমলাপুরে ৪০০, রাজশাহী সিটিতে ৪৫০, কালিয়াকৈরের কাইতলায় ৩৫০, বাইনাপাড়া হাটে ৪০০ টাকা করে খাজনা আদায় করা হয়। সেই তুলনায় গাবতলী হাটে খাজনা অনেক কম। বরং এই হাটে সরকার নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। ফলে রাজধানীতে মাংসের দাম বাড়ানোর কোনও যৌক্তিকতা নেই।’

তার দাবি, মাংস ব্যবসায়ী হিসেবে শুধু তারাই ১০০ টাকা করে খাজনা দেওয়ার সুবিধা পান, দুই সিটি করপোরেশন থেকে যাদের তালিকা দেওয়া হয়েছে। আর সিটি করপোরেশনের ওই তালিকা অনুযায়ী, ডিএসসিসিতে ৪৭৪ ও ডিএনসিসিতে ৩৭০ জন মাংস ব্যবসায়ী রয়েছেন। এদের নাম করে অন্য কেউ এলেও সুবিধা দেওয়া হয় না। অর্থাৎ তালিকার বাইরে কেউ মাংস ব্যবসায়ী হিসেবে সুবিধা পাবেন না।

গাবতলী হাট ইজারাদারের অভিযোগ, বর্তমানে ভারত থেকে বৈধভাবে গরু আমদানি বন্ধ রয়েছে। তবে সীমান্তরক্ষীদের যোগসাজশে কিছু গরু অবৈধ পথে নিয়ে আসা হচ্ছে। সেই হিসেবে এক জোড়া গরু সীমান্ত পার করতে ৬৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। এরপর ঢাকায় আনতে ট্রাকভাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিতে হয়। এরপরও গরুপ্রতি কমপক্ষে চার হাজার টাকা খরচ রয়েছে। সেই হিসাব ধরেই বিক্রি হচ্ছে মাংস। সীমান্ত উন্মুক্ত না হলে মাংসের দাম কমার সম্ভাবনা নেই।

অন্যদিকে, মাংস ব্যবসায়ীদের অভিযোগ— নগরীর পশু ক্রয়ের একমাত্র স্থায়ী বাজার গাবতলী হাটে সরকার নির্ধারিত খাজনার চেয়ে টাকা আদায় করা হয়। এমনকি গাবতলী হাটে মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য রক্ষিত অফিসটিও দখল করে রেখেছেন ইজারাদার। এ নিয়ে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করলেও তারা বিষয়টি আমলে নেয়নি। দায়িত্বরত সিটি করপোরেশনও এ নিয়ে কোনও কথা বলছে না। এছাড়া, প্রতিবছর রমজানের আগ মুহূর্তে মাংসের দাম নির্ধারণ করার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বসা হলেও উত্তর সিটি করপোরেশন মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে না।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাবতলী হাটের ইজারাদারের চাঁদাবাজির কারণেই মাংসের দাম বেশি পড়ছে। মাংস ব্যবসায়ীদের থেকে ১০০ টাকা হাসিল আদায়ের কথা থাকলেও তারা গরুপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করে থাকেন, যার প্রভাব পড়ে গিয়ে মাংসের দামের ওপরে। এই চাঁদাবাজি বন্ধ হলে রাজধানীবাসীকে ৩০০ টাকা দামে মাংস খাওয়ানো যাবে।’

সম্প্রতি নগরীর হাতিরপুল কাঁচাবাজার পরিদর্শন শেষে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনও গাবতলী হাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঢাকা শহরের কাঁচাবাজারগুলোতে মাংস বিক্রির জন্য অধিকাংশ গরু গাবতলীর পশুর হাট থেকে কেনা হয়। এই হাটে চাঁদাবাজির ব্যাপক অভিযোগ আছে। এই চাঁদাবাজি কমলে গরুর মাংসের দাম অনেকটাই কমে আসবে। চাঁদাবাজির বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়েছে।’

এর আগে রমজান উপলক্ষে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মহানগরীর মাংস ব্যবসায়ীরা ঢাকা দক্ষিণের মেয়রের কাছে গাবতলী হাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলে; মেয়র বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন। যদিও গাবতলী হাটের মালিক ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। মাংস ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না। এমনকি রমজান উপলক্ষে তাদের সঙ্গে কোনও বৈঠকও করছে না।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। তবে খোঁজ নিয়ে দেখবো। ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলবো। অভিযোগ সত্য হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ