আইন ভেঙে গৃহায়ন কর্মচারীদের গ্রাচ্যুইটি, সরকারের গচ্ছা ২১ কোটি টাকা

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ০৯:৫১, মে ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৯, মে ১৭, ২০১৯

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ

আইন ভেঙে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৬১ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ওয়ার্কচার্জড বা কার্যভিত্তিক কর্মচারীকে গ্রাচ্যুইটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নেই এ সুবিধা দেওয়া হবে। এতে সরকারের ২১ কোটি টাকা গচ্ছা যাবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। গ্রাচ্যুইটির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে এরইমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চাকরির বিধিমালায় বলা আছে, ‘এ বিধিমালা সংস্থাটির সব সার্বক্ষণিক কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হতে প্রেষণে নিয়োজিত, অথবা চুক্তিভিত্তিক বা খণ্ডকালীন  নিয়োজিত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তাদের চাকারর শর্তে এই বিধির কোনও কিছু প্রযোজ্য বলে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলে প্রযোজ্য হবে না।’ গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উল্লিখিত ১৬১ জন কর্মচারীর চাকরির শর্তে এসবের কোনও কিছুই উল্লেখ নেই।

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, এই কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনও ক্যাটাগরির মধ্যেই পড়ে না। তারা উন্নয়ন খাতের আওতাভুক্ত। আর গৃহায়নের চাকরি বিধিমালায় কর্মচারীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘কর্মচারী’ অর্থ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনও কর্মচারী, অস্থায়ী বা স্থায়ী যা-ই হোক এবং যে কোনও কর্মকর্তাও এর অন্তর্ভুক্ত হবেন। এক্ষেত্রে কার্যভিত্তিক কর্মচারীরা এর আওতায় পড়েন না।

জানা গেছে, গত ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত ১৯৭তম বোর্ড সভায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এই কর্মচারীদের গ্রাচ্যুইটি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্থার চেয়ারম্যান মো. রশিদুল ইসলাম। তবে এ সিদ্ধান্তকে আইন বহির্ভূত এবং নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই কর্মচারীদের প্রত্যেকের মূল বেতন ১০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ১৬১ জন কর্মচারীর মোট মূল বেতনের বিপরীতে গ্রাচ্যুইটির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২১ কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মচারীরা তাদের চাকরি স্থায়ী করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। আন্দোলনকে সফল করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চাঁদা আদায় করেন এই কর্মচারীদের নেতারা। কিন্তু সরকার তাদের চাকরি স্থায়ী করেনি। পরে তাদেরকে গ্রাচ্যুইটি আদায় করে দেওয়ার কথা বলা হয়। এ জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে প্রায় এক কোটি ৬১ লাখ টাকা আদায় করেন নেতারা। বিনিময়ে ২১ কোটি টাকার গ্রাচ্যুইটি আদায় করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

১৯৭তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণীর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কার্যভিত্তিক কর্মচারীদের গ্রাচ্যুইটি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের ১৯৫তম বোর্ড সভার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘১৬১ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কার্যভিত্তিক কর্মচারীকে আর্থিক সুবিধা হিসেবে কার্যভিত্তিক পদে চাকরি অথবা কার্যকাল প্রতি বছরের জন্য সর্বশেষ পাওয়া মূল বেতনের দুই মাসের (অনধিক ৬০ মাস) অর্থ স্ব-অর্থের ‘আর্থিক সুবিধা’ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। এরপর প্রস্তাবটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে গত ৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে মতামত পাঠানো হয়। এতে বলা হয় ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (কর্মকর্তা-কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা, পূর্ব নজির এবং এ বিষয়ে প্রচলিত বিধি বিধানের আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানা হয়নি। কারণ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (কর্মকর্তা-কর্মচারী) চাকরি বিধানমালা, পূর্বনজির এবং এ বিষয়ে প্রচলিত বিধি বিধানে কোথাও কার্যভিত্তিক কর্মচারীদের বিষয়ে কোনও কিছুই উল্লেখ নেই। তাছাড়া, কার্যভিত্তিক কর্মচারীরা অবসরে যাওয়ার পর পদটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে বলেও সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে কার্যভিত্তিক কর্মচারীদের গ্রাচ্যুইটি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আইন বহির্ভূত এবং নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারের রাজস্ব খাতে নিয়মিত কর্মচারীরাই কেবল পেনশন এবং গ্রাচ্যুইটি পাওয়ার অধিকারী। তাছাড়া, এ খাতের প্রতিটি কার্মচারীর মাসিক বেতন থেকে নির্ধারিত হারে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা কেটে রাখা হয়। ওই টাকার সঙ্গে সরকারি অংশ যোগ করে গ্রাচ্যুইটি দেওয়া হয়। অথচ কার্যভিত্তিক কর্মচারীরা হচ্ছেন উন্নয়ন খাতের আওতাভুক্ত। সরকারি কিছু সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেও পেনশন কিংবা অবসরকালীন কোনও ভাতা তারা পান না। এমনকি তাদের বেতন থেকে কখনও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা কেটে রাখা হয় না। কাজেই তাদের গ্রাচ্যুইটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও রহস্য ঘেরা।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার ফোন করলেও সংস্থার চেয়ারম্যান মো. রশিদুল ইসলাম ফোন ধরেননি। পরে বিষয়টি জানিয়ে তা মোবাইলে এসএমএস পাঠানো হলেও তিনি তার কোনও জবাব দেননি।

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ