মামলার প্রক্রিয়াতেই অকার্যকর পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:০৩, মে ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:২০, মে ২৩, ২০১৯

আদালত

সালেহা বেগম (৬৭) এক সন্তানের মা। সন্তানকে বড় করে তোলার আগেই মারা যান তার স্বামী রবিউল হোসেন। সন্তান বড় হয় ঠিকই কিন্তু মায়ের কাছে সামান্য কিছু টাকা পাঠানোর বাইরে আর কোনও খোঁজ নেন না। প্রতিবেশীরা কখনও কখনও তাকে দেখেন বটে- কিন্তু সালেহার ভাষায় তিনি এখন রোজ নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা চেয়ে খোদার কাছে দোয়া করেন। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ তাকে আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেন। তবে এ বিষয়ে সালেহা বেগম বলেন, ‘অধিকার পেতে ছেলেকে কোর্ট-কাচারিতে ডাকি ক্যামনে বাছা?’

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩ অনুযায়ী, সন্তান যদি বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব না নেন তাহলে প্রতিকার পেতে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। তবে সেই মামলা আদালতে গিয়ে বাবা-মাকেই দায়ের করতে হবে৷

সালেহা বেগমের মতো বাঙালি সব মা-বাবাই চান সন্তান যেন সুখে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে যেন দাঁড়াতে না হয়। এখন মামলা করার এই পদ্ধতির কারণেই এই আইনটি অকার্যকর হয়ে থাকবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের মফস্বলের বৃদ্ধ বাবা-মা কখনও সামর্থ্যই রাখেন না আদালতে যাওয়ার, সন্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর তো প্রশ্নই ওঠে না।

আইনে পিতা-মাতার ভরণপোষণের বিষয়ে বলা আছে, ‘প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও পিতা-মাতার সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে৷ তবে কোনও বাবা অথবা মা আলাদাভাবে বসবাস করতে চাইলে সন্তানরা তাদের আয় অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত ভাতা দেবেন৷’ আইনে পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি, নানা-নানির ভরণপোষণের কথাও বলা হয়েছে৷

মামলা করার প্রক্রিয়ার বিষয়ে আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম বলেন, ‘আদালতেই যেতে হবে কেন? আইনের ৮ ধারায় বলা আছে- আদালত সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদে আপোস-মীমাংসার জন্য পাঠাতে পারে। তাই যদি হয় তাহলে শুরুতে আদালতে না গিয়ে আপোসের কোনও প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে পারে।’ সেটি কোন পদ্ধতিতে হতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সালিশি পরিষদ গঠন করে দেওয়া যেতে পারে। সেখানে ব্যর্থ হলে তারাই বলে দেবে আপোস সম্ভব নয়। তখন আদালতে যেতে পারেন বাবা-মা। ভিকটিমকে দ্বারে-দ্বারে ঘুরতে হবে এমন মনে করলে আইনটি কার্যকর হবে না।

অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের বাইরে অন্য কাউকে মামলার ক্ষমতা দিলে সমস্যা তৈরি হতে পারে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, যাকে ক্ষমতা দেওয়া হবে তিনি ভিকটিম পিতা-মাতার অনুমতি নিয়ে মামলার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়া মামলা না শুনে শুরুতেই তো জরিমানা হবে না। ফলে তৃতীয় পক্ষের সুযোগ নেওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই।

এই আইনটি কার্যকরের জন্য বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে উল্লেখ করে বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির প্রধান সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পিতা-মাতার পক্ষে অন্য কাউকে মামলা করার সুযোগ আইনে দেওয়া হয়নি। এমনকি ভিকটিম পিতা-মাতাকে লিখিত অভিযোগ করতে হবে, কোন মৌখিক অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হবে না। এই আইনটি কেন করা হয়েছে তা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের সমাজ, পারিবারিক শিষ্টাচার ও অনুশাসনগুলো একসময় জোরালো থাকলেও নানা কারণে তা ভেঙে গেছে। সেগুলোর বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার জন্যই এই আইন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করার মাধ্যমেই এগিয়ে নিতে হবে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে ততটা কাজ হবে না। ফলে এই আইন ও আইনটি প্রণয়নের কারণগুলো যত প্রচার হবে তত আইনটি কার্যকর হবে।

বাবা-মায়ের পক্ষে মামলা অন্য কারও করার বিষয়ে আইনে কোনও পরিবর্তনের কথা ভাবা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইন বিধিমালা দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। আমরা বিধিমালার মাধ্যমে এর বাস্তবায়নের নানা প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছি। নানা স্তরে নানা কমিটি তৈরি করে দেওয়া থেকে শুরু করে এর বাস্তবায়ন কৌশল নিয়েও কাজ করছি। তবে এই মামলার প্রক্রিয়া পরিবর্তনের বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সরকারের নজরে আনা হলে হয়তো আইনটির পরিবর্তন আসতে পারে।

 

/ইউআই/ওআর/

লাইভ

টপ