অবহেলিত প্রাণীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৭:৫৯, মে ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৮, মে ২৩, ২০১৯

কুকুর ও বিড়াল

একসময় ‘কুকুর আসছে’ শুনলে আঁতকে উঠতো সাধারণ মানুষ। আক্রমণাত্মক হয়ে আঘাত করে সরিয়ে দেওয়া কিংবা এড়িয়ে চলাই ছিল বাস্তবতা। শুধু কুকুর নয়, বিড়ালের প্রতিও ছিল একইরকম নির্দয় মনোভাব। এসব প্রাণীর অধিকাংশেরই নির্দিষ্ট কোনও মনিব নেই। তাই পথে পথে ঘুরে কিংবা এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করেই কাটে তাদের দিন। রাস্তায় যা পাওয়া যায় তাই খায়। দেশে বর্তমানে এ ধরনের প্রায় ১৬ লাখ কুকুর রয়েছে। তবে বিড়াল কতো আছে সেই সংখ্যা অজানা। আশার কথা, অবহেলিত এসব প্রাণীর প্রতি সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ধারণার পরিবর্তন ঘটছে ধীরে ধীরে।

এসব প্রাণীর প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে তাদের নিয়ে কাজ করা কিছু বেসরকারি সংগঠন।  বছরের পর বছর তাদের সোচ্চার অবস্থানের কারণে প্রাণী কল্যাণ আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া এসব প্রাণীর আচরণ পরিবর্তন করে পুনরায় আবার সমাজে প্রতিস্থাপনের কাজও করে থাকে বেসরকারি সংগঠনগুলো। এমনকি প্রাণীদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কিছু করা হলে সেক্ষেত্রে মামলাও করছে বেসরকারি সংগঠনগুলো।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবহেলিত প্রাণী যেমন– কুকুর, বিড়ালের সেবায় নিবন্ধিত সংস্থা রয়েছে তিনটি। সেগুলো হলো– অভয়ারণ্য, পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন এবং কেয়ার ফর পজ। এছাড়া ফেসবুকভিত্তিক আরও কয়েকটি সংগঠনের খোঁজ পাওয়া গেছে। এসব সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিটিই কুকুর এবং বিড়ালের সেবায় নিয়োজিত। বিপদ্গ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসাসেবা, আচরণ পরিবর্তনের মতো কাজ এসব সংস্থা করে থাকে। সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ মানুষ এসব অবহেলিত প্রাণীর প্রতি এখন অনেকটাই মানবিক।

বেওয়ারিশ কুকুর

বেসরকারি সংস্থা কেয়ার ফর পজ প্রাণীদের কল্যাণে কাজ করছে তিন বছরের বেশি সময় ধরে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান সৌরভ শামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন মানুষের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে এসব প্রাণীর প্রতি যে ধরনের মানসিকতা ছিল সেখান থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে তারা। এখন অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষও এসব প্রাণীদের যত্ন নেয়।’

সৌরভ শামিম বলেন, ‘আমাদের সংস্থা মূলত যেসব কুকুর-বিড়াল দুর্ঘটনার শিকার হয় তাদেরকে চিকিৎসা দেওয়া, তাদেরকে নিরাপদে রাখার কাজ করে। কোনও প্রাণীর হয়তো একটি চোখ নেই অথবা পা নেই, তখন বাধ্য হয়ে আমাদের শেল্টারে রেখে দিতে হয়। এছাড়া কোথাও যদি কুকুর-বিড়ালের প্রতি অন্যায় করা হয়, তখন সেখানে গিয়ে আমরা তাদের বোঝাই। যদি সেটা অপরাধের পর্যায়ে চলে যায়, আমরা মামলা করি। সম্প্রতি বিড়ালকে হত্যা করে টুকরো করার দায়ে যে মামলা করা হয়েছে সেটা আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকেই করা হয়েছে।’    

ইতোমধ্যে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কুকুর হত্যার দায়ে শাস্তি হয়েছে। রাজধানীর রামপুরায় দুই মা-সহ ১৪ কুকুরছানাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে হত্যার দায়ে এক যুবককে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ওই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাকিবুল ইসলাম এমিল। তার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রাণীদের কল্যাণে কাজ করে আসছে।

এমিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও বিষয় নিয়ে সোচ্চার হলে সেটি নিয়ে সবার টনক নড়ে। এসব নিয়ে আরও বেশি কথা বলতে হবে, সবার নজরে আনতে হবে। এদিক থেকে আমরা বলতে পারি, প্রাণী কল্যাণের একটি ইস্যু আছে সমাজে। সেটা নিয়ে আমাদের দেশে কথা বলার সুযোগ ছিল না একসময়। কারণ একসময় মানুষ “নগদ” কী উপকার পাবে সেটার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতো। এজন্য প্রাণী নিয়ে বেশি কথা হতো না। এখন অনেক গ্রুপ, দু-তিনটি সংগঠন। অনেক মানুষ এখন সচেতন। তারা কথা বলছে, একটা আওয়াজ তুলছে তারা। এর একটা প্রভাব পড়ছে সমাজে। এটার প্রভাবই আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। সরকারও কিন্তু এখন একটু নড়েচড়ে বসছে।’

বিড়ালতিনি আরও বলেন,  ‘১০০ বছরেও যে আইনটি পরিবর্তিত হয়নি, বাংলাদেশের ৪৮ বছরে প্রাণী কল্যাণ আইন নিয়ে কেউ চিন্তাই করেনি, সেই আইন নিয়ে গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে নড়াচড়া করে এখন কিন্তু খসড়া চূড়ান্ত হয়ে ক্যাবিনেটে পাস হয়ে গেছে। এটা হয়েছেই মূলত আমাদের আওয়াজ তোলার কারণে। প্রাণীপ্রেমীরা আর সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারলো– “আমরা অমানবিক দিকে চলে যাচ্ছি”, তখনই আমরা কয়েকবার রাজপথে দাঁড়িয়েছি। প্রশাসন বুঝতে পারলো যে, এটা নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে, সরকারের একটি পলিসি তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের ভীতি কাজ করতো। তারা মনে করতো– “কুকুরকে আবার ধরা যায় নাকি? এগুলো তো রাস্তায় থাকে, তাদের আবার আদর করা যায় নাকি!” যখন সবাই দেখে আমাদের মতো মানুষরা রাস্তায় নেমে এদের ধরছে, চিকিৎসা দিচ্ছে, তখন তাদের মধ্যেও মানবিকতাটা চলে আসে। মানুষ তখন চিন্তা করে যে– “আমরা চাইলেও কিন্তু পারি”। এর অবশ্যই একটি পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়েছে সমাজে।’     

লোকবলের অভাবে কাজ করতে পারে না সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো

লোকবলের অভাব থাকায় এসব প্রাণীর কল্যাণে কাজ করতে পারে না ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তবে জলাতঙ্ক রোগ নির্মূলে কাজ করছে এই দুই প্রতিষ্ঠান। জলাতঙ্ক রোগ নির্মূলে টিকাদানের কাজ করছে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি)। ২০১৪ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুকুর নিধন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। ২০১৪ সালেই ঢাকার অবিভক্ত সিটি করপোরেশন কুকর নিধন কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে কুকুরকে ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় আনার কাজ শুরু করে। পরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আলাদা করে ভ্যাক্সিন দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো.মোমিনুর রহমান মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ভ্যাক্সিনেশনের কাজ সিডিসির প্রজেক্টের মাধ্যমে গত সপ্তাহে করলাম। আমাদের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থা অভয়ারণ্যের একটি সমঝোতা (এমওইউ) আছে। তারা সারাবছরই এটা করছে। সব ধরনের কুকুরকেই আমরা টিকা দিয়ে থাকি। অভয়ারণ্য আবার কুকুরগুলোকে ব্যবস্থাপনার কাজও করে। তারা কুকুরগুলোকে নিয়ে আসে, তাদের আচরণগত পরিবর্তন নিয়ে আসে। এরপর তাদেরকে আবার পুরনো জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আসে। গত তিন বছর ধরেই এই কার্যক্রম চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে বেশির ভাগই স্ট্রিট ডগ, বেশির ভাগই বেওয়ারিশ। হাইকোর্টের নির্দেশনাও আছে, নিধন করা যাবে না। তাই আমরা যেটা করতে পারি তা হলো, ভ্যাক্সিনেশন আর ম্যানেজমেন্ট করে তাদের আচরণগত পরিবর্তন এনে ছেড়ে দিতে পারি। আমাদের নিজস্ব কোনও জনবল কিন্তু নেই, আমাদের যা আছে তা অপ্রতুল এক কথায়। তাই আমরা সিডিসি আর অভয়ারণ্যের সঙ্গেই কাজগুলো করছি।’

১৯২০ সালের আইনের আদলে নতুন প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৮

১৯২০ সালের পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধ আইনের ভিত্তিতে নতুন প্রাণী কল্যাণ আইন করা হয়েছে।  এই আইনে কুকুরকে একটানা ২৪ ঘণ্টা বা এর বেশি সময় বেঁধে বা আটকে রাখলে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৮’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এটি এখন সংসদে পাস হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এই আইনের অধীনে অপরাধ করলে বা অপরাধে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। যা আগে ছিল তিন মাসের জেল বা এক হাজার টাকা জরিমানা।

 

/এসও/এমএএ/

লাইভ

টপ