ঈদে ফুটপাতের সামগ্রীতেই ভরসা নিম্ন আয়ের মানুষের

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১২:৪৫, মে ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫১, মে ২৭, ২০১৯

ঈদের কেনাকাটায় ক্রেতাদের ভিড়

আব্দুর রহমান পেশায় সিএনজি চালক। ঢাকা কলেজের উল্টো পাশের সড়কে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছেন ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হকারের দিকে। শিশুদের নতুন জামা নিজের ঘাড়ে রেখে ‘খালি ১০০’ দাম হাঁকিয়ে ক্রেতাদের আকর্ষণের চেষ্টা করছেন হকার। কিছুক্ষণ পর সামনে একটু এগিয়ে গিয়ে কয়েকটি জামা নেড়ে দেখলেন আব্দুর রহমান। দুটি জামা নিতে চাইলেন। একদাম হওয়ার পরও আরও কিছু কম রাখার অনুরোধ করেন তিনি। হকার সজীব কিছুতেই আর দাম কমাবেন না। শেষমেশ ২০০ টাকা দিয়েই নিজের ছেলের জন্য দুটি জামা কিনলেন আব্দুর রহমান। 

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছোট ছেলের জন্য দুইটা জামা নিলাম। সারাদিন গাড়ি চালাই, সময় করতে পারি না। আর মার্কেটের থেইক্কা এইগুলা কিনলে আরও বেশি টাকা লাগে। হকারদের কাছে কম দামে পাওয়া যায়। তাই এখান থেকে নেওয়া।’   

ফুটপাতই নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসাঈদ আসলে ছোটরা নতুন কাপড় কেনার বায়না ধরে, আবার বড়দেরও যে ইচ্ছে থাকে না, তা নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই-ই কিছু না কিছু কেনার চেষ্টা করেন। উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে একেবারে নিম্ন আয়ের মানুষেরা সবাই ঈদে কেনাকাটা করেন। সচ্ছল মানুষেরা যে যার পছন্দের মার্কেট কিংবা দোকান থেকে কিনে থাকেন পছন্দের জামা, কিংবা আনুষঙ্গিক সামগ্রী। কিন্তু কম আয়ের মানুষদের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফুটপাত। যদিও ফুটপাতে হকারদের দোকান বসানোর ওপরে নিষেধাজ্ঞা আছে। তারপরও তারা কাঁধে করে নতুন পোশাক কিংবা অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন পথে পথে। 

এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেন না হকাররা

রমজানের শুরুতেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ঘোষণা দেন— ‘রমজানে ফুটপাতে কোনও হকার বসতে পারবেন না। কেবল মতিঝিল এলাকায় অফিস শেষে হকাররা বসতে পারবেন। তবে এই নিয়ম সিটির অন্য কোনও এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে না।’ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সুপারিশ অনুযায়ী, শুধুমাত্র ১১টি হলিডে মার্কেট করার কথা জানান তিনি। পুরো রোজার মাসে নিউ মার্কেট এলাকায় হকারদের দৌরাত্ম্য দেখা না গেলেও ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে তাদের আনাগোনা। তবে এক জায়গায় তারা বেশিক্ষণ অবস্থান করতে পারেন না। পুলিশ আসলেই পণ্য নিয়ে দৌড় দিতে হয়। রাজধানীর গাউসিয়া মার্কেটের সামনে চাদর বিক্রেতা কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যে দামে দেই দোকানে গেলে আরও কমপক্ষে ২০০-৩০০ টাকা বেশি লাগবে। সবাই তো আর আমাদের কাছ থেকে কেনে না। আমাদের কাস্টমার আলাদা।’

এক জায়গায় কতক্ষণ দাঁড়াতে পারেন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কোনও ঠিক-ঠিকানা নাই। এই এখন দেখতেছেন, একটু পর ঘুইরা আসলে দেখবেন নাই। পুরা এলাকার সব ফাঁকা।’

ফুটপাতে ঈদের কেনাকাটারাস্তার ওপরে দাঁড়ানো শিশুদের পোশাক বিক্রেতা সজীবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যবসা খুব একটা ভালা না। একেতো দাঁড়াইতে পারি না, তার ওপর ঈদের সিজন। মাল কম কইরা আনি, ব্যাচতে সারাদিন শেষ। বসার একটা জায়গা পাইলে ঈদের সময় অন্তত অনেক মাল বিক্রি করতে পারতাম।’

নিত্য প্রয়োজনীয় সবই পাওয়া যায় ফুটপাতে           

চামচ থেকে শুরু করে বাটি, মোজা থেকে শুরু করে কামিজ, এমনকি পাঞ্জাবি পর্যন্ত পাওয়া যায় নিউ মার্কেটের ফুটপাতে। ছোট-বড় সবার স্যান্ডেল, ব্যাগ, জুতা সবই আছে সেখানে। ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে পড়েন এসব কিনতে। রবিবার (২৬ মে) রাতে নিউ মার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ হকারদের সামনে ক্রেতাদের  প্রচণ্ড ভিড়। কেউ জুতা কিনছেন, কেউ পাঞ্জাবি,কেউবা জামা। ধানমন্ডির রায়ের বাজারের বাসিন্দা নুরুল হক গাউসিয়ার সামনে পাঞ্জাবি নিয়ে বসা এক বিক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছেন। তিনি পাঞ্জাবি নেবেন তিনটা। বিক্রেতা বলছেন একদাম, আর কমাবেন না। নুরুল হক সেই একদামেই কিনলেন তিনটি পাঞ্জাবি। তিনি বলেন, ‘একই জিনিস দোকানেও পাওয়া যায়। দোকানে দাম বেশি। কিছু টাকা বাঁচাতেই এখান থেকে কেনা।’ জিনিসের মান নিয়ে প্রশ্ন করলে নুরুল হক বলেন, ‘আমি সারা বছরই কিনি। দাম অনুযায়ী মান ঠিকই আছে।’
ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে পোশাক বিক্রি করছেন হকাররাঅন্যদিকে, বাসার জন্য ডাবল বেডের চাদর কিনছেন গৃহিণী আফিয়া। চাদর ৩০০ এবং বালিশের কাভারসহ ৪০০ টাকা দাম চাইলেন বিক্রেতা। তিনি কিছুটা কম দিতে চাইলে বিক্রেতা বলেন— এর চেয়ে কমে কোথাও পাবেন না। ৪০০ টাকা দিয়েই আফিয়া কিনলেন বালিশের কাভার ও বিছানার চাদর। দোকান থেকে না নিয়ে ফুটপাত থেকে কেন নিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ওই পাশে দোকানে দেখে আসলাম, একই জিনিস কাভারসহ ৬৫০ টাকা চাচ্ছে। দামটা একটু বেশি মনে হওয়ায় দোকান থেকে কিনি নাই। যাওয়ার সময় ফুটপাতে এইটা চোখে পড়লো, দাম করে নিয়ে নিলাম।’    

 

/এসও/এপিএইচ/

লাইভ

টপ