মোদির ‘সেকেন্ড টার্ম’ বাংলাদেশের জন্য কেমন?

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ২৩:৫৫, মে ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৫, মে ২৮, ২০১৯

নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর জোটের নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয় তাকে। (সাম্প্রতিক ছবি)

ভারতে লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই যে বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন বার্তা আসা শুরু হয়, তার একেবারে প্রথম দিকেই ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম।

বস্তুত, ঢাকার গণভবন থেকে দিল্লির সাত নম্বর জনকল্যাণ মার্গে যখন শেখ হাসিনার ফোনটা আসে, তখনও কিন্তু ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেউই মোদির সঙ্গে কথা বলে উঠতে পারেননি।

পরে এই বিষয়টির উল্লেখ করেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘এটাই দেখিয়ে দেয় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটা কী অসাধারণ – আর দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কটাও কত মধুর।’

বস্তুত, মাসচারেক আগেই বাংলাদেশে নির্বাচনের পর প্রথম যে বিশ্বনেতা ৩১ জানুয়ারির সকালে শেখ হাসিনাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তিনি নরেন্দ্র মোদি – আর প্রথম সুযোগেই শেখ হাসিনাও সেই সৌজন্যের প্রতিদান দিলেন।

কিন্তু, বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, সে বিষয়ে গত তিন-চারদিনে গণমাধ্যমে বেশ কিছু নিবন্ধ ও মতামত প্রকাশিত হয়েছে – বাংলাদেশের কোনও কোনও বিশ্লেষক এক্ষেত্রে কিছুটা সংশয়ও প্রকাশ করেছেন।

ভারত এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে, তা বোঝার জন্য বাংলা ট্রিবিউন দিল্লিতে কথা বলেছিল দু’জন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। তারা হলেন  সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মুচকুন্দ দুবে এবং দিল্লির নামি থিঙ্কট্যাঙ্ক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো ড. শ্রীরাধা দত্ত।

ভারতীয় কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে ও শ্রীরাধা দত্ত

তাদের দুজনের মতামতের সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো।

সার্বিক কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব:

নরেন্দ্র মোদি  ও শেখ হাসিনার আমলেই যে ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘সর্বকালের সেরা পর্ব’ অতিক্রম করছে তা নিয়ে বেশ কিছুকাল ধরেই দুদেশের পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকাররা সবাই প্রায় একমত। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তারা দুজনেই আবার বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে নিজ নিজ দেশের ক্ষমতায় – দুজনেই দুজনকে খুব ভালভাবে চেনেন ও পছন্দ করেন - কাজেই সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কোনও ছন্দপতন ঘটার কারণ নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবেমুচকুন্দ দুবে: গত পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কেমিস্ট্রিটা যেভাবে ‘আনফোল্ড’ করেছে সেটা সত্যিই অবাক করার মতো। আমরা বাস্তবের মাটিতেও তার প্রতিফলন দেখেছি। যে বাংলাদেশ একদিন তাদের ভূখণ্ডে ভারতীয় জঙ্গিদের অস্তিত্বই স্বীকার করতো না, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তাদের ধরে ধরে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। সহযোগিতার দিগন্ত নানা ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়েছে। আর ভারতীয় গণতন্ত্র এমন একটা ম্যাচিওরিটি গত সত্তর বছরে অর্জন করেছে, যেখানে সরকারের বদল হলেও দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটা ধারাবাহিকতা থাকে – দুম করে সব কিছু পাল্টে যায় না। আর এখানে তো মোদি আর হাসিনা দুজনেই আগামী পাঁচ বছরও ক্ষমতায় থাকছেন, কাজেই আমি অন্তত সম্পর্কের গ্রাফে ঊর্ধ্বগতিই দেখছি।

শ্রীরাধা দত্ত: এটা অস্বীকার করার উপায় নেই বিজেপি যখন পাঁচ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিল, তখন বাংলাদেশে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল যে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী দাঁড়াবে। কিন্তু, যেভাবেই হোক নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা দুজনেই সেই আশঙ্কাকে খুব তাড়াতাড়ি ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন–তারা দুজনেই যে একই ধরনের লেন্স দিয়ে দেখেন সেটাও শিগগির বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। মোদি ক্ষমতায় আসার মাত্র বছরখানেকের মধ্যে স্থল সীমান্ত চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এখন দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আট বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিগ ইনফ্রা (অবকাঠামো) প্রকল্পে ভারত শত শত কোটি টাকা লগ্নি করছে। শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার মতো ঘটনাও দুটো দেশকে নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে বলেই আমার বিশ্বাস।

বিজেপির হিন্দুত্ব এজেন্ডাও এনআরসি অভিযান:

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনের প্রচারণায় বিজেপি হিন্দুত্ববাদী তাসকে ব্যবহার করেছে খোলাখুলিভাবে। আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) তৈরির মাধ্যমে লাখ লাখ বাঙালি মুসলিমের ভারতীয় নাগরিকত্ব যখন হুমকির মুখে, সেই একই ধরনের অভিযান পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে শুরু করা হবে বলে বিজেপি ঘোষণা করেছে। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ হুমকি দিয়েছেন, ‘অবৈধ বাংলাদেশিরা হলো উইপোকার মতো–তাদের খুঁজে খুঁজে বের করে দেশ থেকে তাড়ানো হবে। এখন বিজেপি আবার জিতে আসার পর এসবের কোনও প্রভাব কি বাংলাদেশে পড়বে না?’

মুচকুন্দ দুবে: বছর কয়েক আগে আমার ‘ইন্ডিয়া’স ফরেন পলিসি’ বইটাতেই আমি বলেছিলাম বিশেষত আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় একটা দেশের শান্তি ও সুস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করে প্রতিবেশী দেশের পরিস্থিতির ওপরেও। আজকের ভারতে যদি সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে, তাদের পিটিয়ে মারা হতে থাকে–তাহলে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশেও কিন্তু সংখ্যালঘু হিন্দুরা ঝুঁকির মুখে পড়বেন, তাদের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই ভালো হোক, তার মানে এই নয় যে বাস্তবের মাটিতে সব সমস্যাও আপনা থেকে দূর হয়ে যাবে। অন্যভাবে বললে, এই অঞ্চলের সার্বিক সুস্থিতি চাইলে মোদিকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে।

গবেষক ড. শ্রীরাধা দত্তশ্রীরাধা দত্ত: এই যে এনআরসি বা উইপোকা নিয়ে হুমকি, আমার মতে এগুলো বিজেপির ‘ইলেকটোরাল রেটোরিকস’ ছাড়া কিছুই নয়। মানে নেহাত ভোট জোগাড় করার জন্য বলা, তারপর তারা ঠিক ভুলে যাবে। ২০১৪-র ভোটের আগেও নরেন্দ্র মোদি আসামে দাঁড়িয়ে নিজে বলেছিলেন, প্রতিটা তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’কে লোটাকম্বল সমেত তিনি দেশে ফেরত পাঠাবেন। পরের পাঁচ বছরে কিন্তু আমরা দেখেছি মোদি সরকার প্রায় একজন ‘বাংলাদেশি’কেও ফেরত পাঠাতে পারেনি–‘পুশব্যাকে’র হার বিগত ইউপিএ আমলের চেয়েও অনেক কমে গেছে। অবৈধ অনুপ্রবেশের ইস্যুটাও বরাবর বিজেপি ঠিক ভোটের আগ দিয়ে তুলতে থাকে–তারপর আর তাদের মুখে শব্দটাই শোনা যায় না। এবারেও তার পুনরাবৃত্তি হলে আমি অন্তত অবাক হবো না।

তিস্তা চুক্তিতে কোনও ব্রেক-থ্রুর সম্ভাবনা?

গত প্রায় এক দশক ধরে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা হয়ে রয়েছে না-হওয়া তিস্তা চুক্তি। এতদিনে এই ধারণাও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই চুক্তি সম্পাদনের পথে প্রধান বাধা। এবারের নির্বাচনে সেই পশ্চিমবঙ্গেই অপ্রত্যাশিত ভালো ফল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বিজেপি–কিন্তু সে রাজ্যের এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণ তিস্তার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?

মুচকুন্দ দুবে: দেখুন, আগামী দিনে বিজেপি সারা দেশের মধ্যে যে রাজ্যটি দখল করার জন্য সবচেয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাবে, সেটি অবধারিতভাবে পশ্চিমবঙ্গ। এই নির্বাচনের পরই তারা সেখানে ক্ষমতার গন্ধ পেতে শুরু করেছে, আর ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে হঠাতে তারা প্রাণপণে ঝাঁপাবে তা বলাই বাহুল্য। আর যদি বিজেপি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাতে আসতে চায়, তাহলে সে রাজ্যের ‘পপুলার সেন্টিমেন্ট’ যাচাই না-করে তারা তিস্তা নিয়ে এগোতে চাইবে বলে মনে হয় না। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গবাসী যদি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার জল ভাগাভাগির বিরুদ্ধে হয়, তাহলে সেই জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিজেপি তিস্তা চুক্তি সই করার জন্য তৎপরতা দেখাবে বলে তো আমার মনে হয় না। ফলে অন্তত পশ্চিমবঙ্গে ২০২১-র নির্বাচন পর্যন্ত তো আমি তিস্তা নিয়ে কোনও মুভমেন্ট দেখছি না–তারপর সেখানে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারলে হয়তো অন্য কথা।

শ্রীরাধা দত্ত: নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে আমি কিন্তু মনে করছি না তিস্তা চুক্তি অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথম দিকে থাকবে। বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ যেভাবে বদলাতে শুরু করেছে, তাতে মনে হয় বিজেপিও তিস্তা নিয়ে তাদের উৎসাহে আপাতত রাশ টানবে। পাশাপাশি আর একটা কথাও বলা দরকার, ভারতে এখন এই ধারণাটা ক্রমশ বদ্ধমূল হচ্ছে যে তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশ এতদিন একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করেছে–সে দেশে তিস্তার জলের গুরুত্ব যতটা, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব তিস্তাকে দেওয়া হয়েছে বলেই ভারতীয় কূটনীতিক ও নীতি-নির্ধারকরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। ফলে তিস্তা চুক্তির চেয়েও রাঢ়বঙ্গসহ ভাটিতে তিস্তার অববাহিকায় জলের অভাবকে কীভাবে অ্যাড্রেস করা যায়, ফসলের প্যাটার্ন বদলে সেচের জল ছাড়াই কীভাবে চাষাবাদ করা যায় সেদিকে ফোকাসটা ঘোরানোর চেষ্টা চলছে। আমার মনে হয় তিস্তা নিয়ে ভারতে মোদির নতুন সরকারের দিক-নির্দেশও সে দিকেই থাকবে। 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ