দুদক কর্মকর্তাকে দেওয়া ডিআইজি মিজানের ঘুষের টাকা কোথায়?

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ২২:৪৮, জুন ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৬, জুন ১১, ২০১৯

দুদক

পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছ থেকে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ ওঠার পর অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে দুদক। একইসঙ্গে তিনি ঘুষের টাকা নিয়েছেন কিনা, নিলে সেই টাকা কোথায় আছে, এ বিষয়ে আলাদা তদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছিলেন দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। তবে ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’ তিনি অস্বীকার করলেও দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে আলাদা একটি বিভাগীয় তদন্ত হবে।’

সম্প্রতি এটিএন নিউজের একটি খবরে ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরের কথোপকথনসহ একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। খবর প্রচারের পরপরই ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে গত ৯ জুন একটি তদন্ত কমিটি করে দুদক। তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিতে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতকে প্রধান করা হয়। তদন্ত কমিটি ১০ জুন কমিশনে প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তদন্তের দায়িত্ব থেকে এই কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তার স্থলে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। তিনিই ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান শেষ করবেন।

মিজানুর রহমান ও খন্দকার এনামুল বাছিরের কথোপকথন থেকে জানা গেছে, দুই দফায় টাকা নিয়েছেন এনামুল বাছির। প্রথম দফায় গত ১৫ জানুয়ারি ২৫ লাখ টাকা নেন তিনি। একটি বাজারের ব্যাগের করে এই টাকা নিয়ে আসেন ডিআইজি মিজানুর। আরও ২৫ লাখ টাকা এক সপ্তাহের মধ্যে দেওয়ার জন্য বলে বাছির। তাতে রাজি হন মিজান। বাকি টাকা ১ ফেব্রুয়ারি লেনদেন হয়।

ঘুষ নেওয়ার পর টাকা কোথায় রাখবেন, বিষয়টি নিয়েও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে পরামর্শ করেন এনামুল বাছির। তখন সাউথ-ইস্ট ব্যাংকে অন্য একজনের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার কথা বলা হয়। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে আরও কারও কাছ থেকে এভাবে ঘুষ নিয়ে যেন অ্যাকাউন্টে রাখতে পারেন, সে ব্যাপারেও কথা হয়।
দুদক কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার বিষয়ে ডিআইজি মিজানুর রহমান বলেন, ‘লোকটা যখন আমাকে হয়রানি করেছেন, টাকা চেয়েছেন, তখন আমি আমার সেফটির কথা ভেবে এটা করেছি। তিনি যে দুর্নীতিবাজ, তা প্রমাণ করার জন্য আমি এটা করেছি।’

ঘুষ দেওয়ার জন্য এত টাকা কোথায় পেলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি মিজান বলেন, ‘টাকাটা আমার আত্মীয়-স্বজনের কাছে ধার করা।’

দুদক একের পর এক হয়রানি করেছে অভিযোগ করে পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘দুদক আমাকে ওয়ান বাই ওয়ান হ্যারেস করেছে। প্রথমজনকে এ কারণে উইথড্রো করা হয়েছে। দ্বিতীয়জনেরও একই অবস্থা। আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমি তো তাদের কাছে কোনও ফেবার চাইনি। আমি ল’ফুল হেল্প চেয়েছি। আমি এখনও বলছি, আগেও বলেছি। আমার ফাইলের বাইরে কিছু থাকলে অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। আমার ভাইয়ের প্রপার্টির জন্য আমি দায়ী নই। যার যার ফাইলের জন্য সে সে দায়ী। আমি শুধু তাদের কাছে ল’ফুল হেল্প চাই। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, আমার প্রতি যেন কোনও অবিচার করা না হয়। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তো দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে পারেন না।’

তবে, ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সদ্য বরখাস্ত হওয়া দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমাকের ফাঁসানো হয়েছে। তিনি শুধু আমাকেই ফাঁসাননি, এর আগেও অনেককে ফাঁসিয়েছেন।’

ঘুষ নেওয়া ও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে তদন্তে থাকা কর্মকর্তার কথোপকথন সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চাননি দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি সোমবার (১০ জুন) বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফরেনসিক রিপোর্ট ছাড়া ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অডিও ক্লিপের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ের মন্তব্য করা মুশকিল। এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তে ডিজি পর্যায়ে একজন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। তিনি দেখবেন সার্বিক বিষয়, ঘুষ লেনদেনসহ এনামুল বাছির কি করেছেন।’

উল্লেখ্য, এক নারীকে জোর করে বিয়ে ও নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে মিজানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়। সেই অভিযোগে একই বছরের ৩ মে মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ওই সময় অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ছিলেন উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান উপ-পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ