এটিএম বুথ জালিয়াতি: ঢাকায় একাধিক বিদেশি চক্রের সন্ধান

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:৪৪, জুন ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪৯, জুন ১০, ২০১৯

DIT road Rampuraঢাকায় অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বুথ জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া একাধিক বিদেশি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। তবে, একটি চক্রের ছয় সদস্যকে ধরতে পারলেও বাকিদের এখনও শনাক্ত করতে পারেনি। তারা দেশেই আছে নাকি এরইমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, সে বিষয়ে এখনও পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি। জালিয়াত চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করতে গত পনেরো দিনে দেশে আসা সব বিদেশি নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের নাগরিকদের বিষয়ে চলছে বিশেষ নজরদারি।

প্রসঙ্গত, বিদেশি জালিয়াত চক্রের সদস্যরা গত ১ জুন ডাচ বাংলা ব্যাংকের আরও সাতটি বুথ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এদিকে, এটিএম বুথ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার খবর জানাজানি হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চক্রের সব সদস্যকে শনাক্তের চেষ্টা করছে। ঠিক কী প্রযুক্তি ব্যবহার করে জালিয়াতচক্রের সদস্যরা এভাবে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, তা জানতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সোমবার (১০ জুন) বৈঠক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহিদুর রহমান রিপন বলেন, ‘ডিজিটাল জালিয়াতি চক্রের সব সদস্যকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে আমরা জালিয়াতির কৌশলও জানার চেষ্টা করছি।’

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কোনও এটিএম কার্ড ক্লোন না করেই এবং পিন কোড ছাড়া অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি করার বিষয়টি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ঘটেছে। জালিয়াত-চক্রের সদস্যরা কী প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, তা জানার জন্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বসেছিলাম। দু’টি পদ্ধতিতে এই চক্রটি এটিএম বুথে জালিয়াতি করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে?  একটি হলো, শুধু এটিএম বুথের সিস্টেম হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অথবা এটিএম বুথের সার্ভার হ্যাকিংয়ের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ধারণা করা হচ্ছে, তাইয়ুপকিন নামে একটি ম্যালওয়ারের মাধ্যমে এটিএম বুথ হ্যাক করা হয়েছিল। এই ম্যালওয়ার এটিএম বুথে ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে বুথটি সাইবার হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সাধারণত উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে যেসব এটিএম পরিচালিত হয়, সেসব এটিএমে এই ম্যালওয়ার কাজ করে বেশি। ডাচ-বাংলা ব্যাংকসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালিত বেশিরভাগ এটিএমেই উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচাতি হয়, যেগুলো এনসিআর করপোরেশন নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে থাকে।

ওই কর্মকর্তা জানান, তাইয়ুপকিন ম্যালওয়ারের মাধ্যমে যেভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথগুলোতেও একই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা গেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, জালিয়াত চক্রের সদস্যরা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য এটিএম বুথে কার্ড  প্রবেশ করানোর সময় ফোনে কথা বলছে। ফোনের অন্যপ্রান্তে চক্রের সদস্যরা সিস্টেম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কোড ঠিক করে দিচ্ছে, যেন প্রতিবার একসঙ্গে চল্লিশটি করে ব্যাংক নোট বের হয়ে আসে।

Badda 1ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তারা নয়টি বুথের মধ্যে তিনটির ফরেনসিক ইমেজ সংগ্রহ করেছেন। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কৌশল জানার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে এটিএম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনসিআর করপোরেশনের ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। আগামী ১৮ বা ১৯ জুন এনসিআর তাদের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করবেন। সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই জালিয়াত-চক্রের সঙ্গে এনসিআর করপোরেশনের কোনও অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত রয়েছেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হবে। এছাড়া, এই চক্রের সঙ্গে দেশীয় নাগরিকও জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

ইন্টারপোলে চিঠি

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়া ইউক্রেনের ছয় নাগরিক—ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই, ওলেগ, ডেনিস, নাজেরি, সারগি, ভোলোবিহাইন ও পলাতক ভিটালি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তাদের পূর্ববর্তী ক্রিমিনাল রেকর্ড ও তাদের সহযোগীদের সম্পর্কেও তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তারা আগে অন্য কোনও দেশে গিয়ে এটিএম জালিয়াতির কোনও ঘটনার সঙ্গে জড়িত কিনা, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

 চক্রের বাকি সদস্যরা কোথায়?

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতার হওয়া ছয় জনের বাইরে এটিএম জালিয়াতি চক্রে আরও অন্তত ১০-১২ জন রয়েছেন। তারা এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছে নাকি এরই মধ্যে অন্য কোনও দেশে চলে গেছে, তা জানার চেষ্টা চলছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া ছয় জন জানিয়েছে, তারা ৩০ মে তার্কিশ এয়ার লাইন্সের একটি বিমানে ঢাকায় আসে। পরদিন থেকেই তারা জালিয়াতি শুরু করে। ধারণা করা হচ্ছে, একই সময়ে চক্রের বাকি সদস্যরাও অন্য কোনও রুটে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। এজন্য গত ১৫ মে থেকে ৩০ মে পর্যন্ত যেসব বিদেশি নাগরিক দেশে প্রবেশ করেছে, তাদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে এই সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের কত জন নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। বিস্তারিত তথ্য পেলে তাদের বর্তমান অবস্থান জানার পাশাপাশি নাম উল্লেখ করে পূর্ববর্তী ক্রিমিনাল রেকর্ড জানার জন্য ইন্টারপোলে আবারও চিঠি পাঠানো হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ভিডিও ফুটেজ দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, চক্রে আরও সদস্য রয়েছে। কিন্তু তাদের নাম ও পাসপোর্ট নম্বর না জানার কারণে ইমিগ্রেশনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়নি। তারা দেশেই আছে না পালিয়ে গেছে, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভিতালি নামে একজন যে পলাতক রয়েছে, তার বিষয়ে ইমিগ্রেশনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, বৈধভাবে তার দেশ ছাড়ার কোনও সুযোগ নেই।

 মানি লন্ডারিং আইনে সিআইডির মামলা

এদিকে, গত ১ জুন রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেন থেকে গ্রেফতার হওয়া ছয় ইউক্রেনের নাগরিক ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই ০৫১৫৬২), ওলেগ (পাসপোর্ট নম্বর ইএক্স ০৮৯৯৬৩), ডেনিস (পাসপোর্ট নম্বর এফএল ০১৯৮৩৪) নাজেরি (পাসপোর্ট নম্বর এফটি ৫০০৫০১), সারগি (পাসপোর্ট নম্বর এফএইচ ৪২৪৩৯৪) ও ভোলোবিহাইন (পাসপোর্ট এফটি ৩৭৯৯৮৩) ও পলাতক ভিটালি (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮)-এর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সিআইডির সাইবার ক্রাইম বিভাগের উপ-পরিদর্শক প্রশান্ত কুমার সরকার বাদী হয়ে সোমবার (১০ জুন) বাড্ডা থানায় একটি মামলা (নং ১০) দায়ের করেন।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ