ওসি মোয়াজ্জেমকে হাতকড়া না পরানোয় আদালতে হইচই

Send
তোফায়েল হোছাইন
প্রকাশিত : ১৯:২২, জুন ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫১, জুন ১৭, ২০১৯

আদালতে নেওয়া হচ্ছে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমকে

সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিট। আদালতের এজলাসে উপচেপড়া ভিড়। ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতের হাজতখানা থেকে এজলাসে উঠানো হলো বিশেষ নিরাপত্তায়। গায়ে হলুদ টি শার্ট। চোখে কালো সানগ্লাস। কাঠগড়ার সামনে দাঁড় করানো হলো তাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাধারণ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হইচই দেখা যায়। অভিযুক্তকে কাঠগড়ায় নেওয়া হচ্ছে না কেন? হাতকড়া পরানো হলো না কেন, জানতে চান তারা। সঙ্গে সঙ্গে আদালতের নির্দেশে কাঠগড়ায় উঠানো হয় তাকে। আদালতে শুনানি চলাকালে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।
শুনানি শেষে বিচারক সাবেক এই ওসি’র জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সোমবার (১৭ জুন) বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগ গঠনে শুনানির জন্য পরবর্তী তারিখ আগামী ৩০ জুন নির্ধারণ করেন।
এদিকে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে হাতকড়া পরানো হয়নি কেন- এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় আদালতে। মামলার বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনও হাতকড়া না পরানোয় বিষয়ে সমালোচনা করেন। তাকে কেন হাতকড়া পরানো হলো না জিজ্ঞাসা করলে এ আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, 'ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে হাতকড়া দিয়ে কেন আদালতে আনা হয়নি সে বিষয়ে পুলিশ ভালো জানেন। তবে পুলিশের কাছে আমার অনুরোধ, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে যেভাবে আদালতে আনা হয়েছে পরবর্তীতে অন্য অভিযুক্তদেরও যেন একইভাবে আনা হয়।’
এদিকে সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের চত্বর আনা হয়। সেখান থেকে তাকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে আবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর শুনানি শুরু হয়। মামলার বাদী সায়েদুল হক সুমন আদালতে বলেন, ‘আসামি যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতেন তাহলে তিনি কেন এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন? তিনি পুলিশ বিভাগের কলঙ্ক।’ এ সময় তিনি জামিনের বিরোধিতা করেন।
পরে আসামি পক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘আসামি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তিনি ভিডিও প্রচার করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি এটি প্রচার বা প্রকাশ করেন নাই। মূলত একটি মামলার এজাহার হলে পরবর্তীতে বাদী বিভিন্ন চাপের কারণে মামলা উঠিয়ে নেয়। মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে মোয়াজ্জেম তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন। তবে তিনি প্রচার করেন নাই। আর আসামি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে যে তিনি পলাতক ছিলেন। আসলে তিনি পলাতক ছিলেন না। তিনি আদালতে আসার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। আদালতে আসার কোনও পরিবেশ ছিল না। পরে তিনি হাইকোর্টে জামিন নিতে গিয়েছিলেন। সেখানে হাইকোর্টের একটা টেন্ডার নম্বরও আছে। তাকে সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তিনি হাইকোর্টে জামিন নিতে গিয়েছিলেন। আসামি আদালতে হাজির আছেন। আমরা তার জামিন প্রার্থনা করছি।’
এদিকে জামিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম আদালতকে বলেন, ‘ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য মামলাটি দিন ধার্য ছিল আজ। সে অনুযায়ী ফেনীর সোনাগাজী থানা পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করেছেন। অভিযুক্ত ওসি মোয়াজ্জেম ভিডিওটি নিজের মোবাইলে ধারণ করে তা শেয়ারইট অথবা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটিয়েছেন। তাই আমরা জামিনের বিরোধিতা করেছি। তার জামিন নামঞ্জুর করা হোক।’
এর আগে রবিবার (১৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। এরপর সোমবার ফেনীর সোনাগাজী পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন শাহবাগ থানা পুলিশ। গত ২৭ মে, ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা মামলার ১২৩ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেন ট্রাইব্যুনালে। এরপর বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
গত ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এরপর বিচারক মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন।
প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী ছিলেন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে একটি ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ নুসরাত পাঁচদিন পর ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান।

/টিএইচ/ওআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ