ওসি মোয়াজ্জেমের প্রতি সদয় পুলিশ?

Send
জামাল উদ্দিন ও নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:০২, জুন ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৬, জুন ১৭, ২০১৯

আদালতে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন (ছবি  ফোকাস বাংলা)ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতারের পর তাকে হাতকড়া না পরানোয় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। এছাড়া তার ছবি তুলতে গেলে ফটো সাংবাদিকদের বাধার দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেমের প্রতি কি পুলিশ সদয় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপ্রার্থীরা। তবে, পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, একজন আসামিকে যেভাবে আদালতে নেওয়ার কথা, সেভাবে তাকেও নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, সোমবার (১৭ জুন) শুনানি শেষে মোয়াজ্জেম হোসেনের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে পরবর্তী শুনানির তারিখ ৩০ জুন নির্ধারণ করে দেন বিচারক।

এরআগে, গত ১৫ এপ্রিল ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে সাইবার ট্রাইব্যুনালে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী। এরপর মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন। তদন্ত শেষে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে দায়ী করে আদালতে পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন দিলে গত ২৭ মে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর তিনি ঢাকায় পুলিশ সদর দফতরে কাজের কথা বলে কর্মস্থল থেকেও লাপাত্তা হয়ে যান। বিচারপ্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাইবার ট্রাইব্যুনালে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকেই তার প্রতি সদয় ছিল পুলিশ। এ কারণেই শুরুতে তার গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়েও পুলিশ লুকোচুরি করেছে।

প্রসঙ্গত, ফেনী পুলিশ তার গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পাওয়ার কথা স্বীকার করে আদালত থেকে পাঠানোর একসপ্তাহ পর। কিন্তু সেই গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পেলেও ফেনী পুলিশ তা রংপুর পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বিধি মোতাবেক পাঠানো হয়নি বলে রংপুর থেকে সেই পরোয়ানা আবার ফেনীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাকে গ্রেফতার নিয়ে পুলিশের এই আচরণ জনমনে নানা প্রশ্ন তুলেছে।

গ্রেফতারের পর জানা যায়, পরোয়ানা জারির পর থেকে তিনি রাজধানীর কল্যাণপুরে খালার বাসায় ছিলেন। যখন গোয়েন্দারা তাকে গ্রেফতারে তৎপর হন, তখন তিনি রাজধানী ছেড়ে কুমিল্লার চান্দিনায় গিয়ে খালাতো ভাই পুলিশ ইনস্পেক্টর আসাদুজ্জামানের বাসায় ছিলেন। পরে সেখান থেকে এসে রবিবার (১৬ জুন) উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরই পুলিশ তাকে উচ্চ আদালত এলাকা থেকে গ্রেফতার করে শাহবাগ থানায় রাখে। সোমবার (১৭ জুন) তাকে আদালতে নেওয়ার সময় তার হাতে কোনও হাতকড়া ছিল না। এ সময় ফটো সাংবাদিকদেরও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তার ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি। তার ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে গিয়ে অনেক ফটো সাংবাদিক পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন।

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে হাতকড়া না পরানোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে দায়ের করা মামলার বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে হাত হাতকড়া দিয়ে কেন আদালতে আনা হয়নি, সে বিষয়ে পুলিশ ভালো জানে। তবে পুলিশের কাছে আমার অনুরোধ, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে যেভাবে আদালতে আনা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে অন্য অভিযুক্তদেরও যেন একইভাবে আনা হয়।’

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রতি পুলিশ সদয় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘নমনীয় হলে তো তাকে গ্রেফতারই করা হতো না। আমরা তাকে গ্রেফতার করেছি কী সদয় হয়ে?’

একই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার আনিসুর রহমান বলেন, ‘কোনও সাংবাদিককেই ছবি তুলতে বাধা দেওয়া হয়নি। শত শত মানুষ ও সাংবাদিকদের সামনে দিয়েই তাকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তারা ছবিও তুলেছেন। একজন আসামিকে যেভাবে আনার কথা, ঠিক সেভাবে তাকেও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।’   

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল এইচএসসি সমমানের আলিম আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে গেলে দুর্বৃত্তরা সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাপসাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যান।

এর আগে নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। পরে সেই ভিডিও আবার সোশ্যাল মিডিয়ায়ও ছড়িয়ে দেন তিনি। এ ঘটনায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গত ১৫ এপ্রিল ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিজিটাল আইনে মামলাটি দায়ের করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর  ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। এরপর ২৭ মে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ