গার্মেন্টসে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, শ্রমিকের কাজের ক্ষেত্র কমছে না!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:৩৩, জুন ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৬, জুন ১৮, ২০১৯

গার্মেন্ডসে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র

২০১৭ সাল। পোশাক কারখানায় তখন স্বয়ংক্রিয় মেশিন আসতে শুরু করেছে। এতে গাজীপুরের কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের মধ্যে ছাঁটাইয়ের ভীতি তৈরি হয়। দানা বাঁধে আন্দোলনও। সেসময় থেকেই স্বয়ংক্রিয় মেশিনের বিরোধিতা করা হলেও এরইমধ্যে ৯৫ শতাংশ গার্মেন্টসে নিটিংয়ের কাজ চলছে কম্পিউটারচালিত মেশিনে। মালিকপক্ষের দাবি, বিশ্বায়নের যুগে চাহিদা ও কাজের সক্ষমতা বিবেচনা করলে আধুনিক যন্ত্রের বিকল্প নেই, তবে কোনও শ্রমিক বেকার হচ্ছে না। কারণ হিসেবে তারা কারখানার সংখ্যা ও পরিসর বৃদ্ধির কথা বলছেন। আর শ্রমিক নেতারা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় মেশিন আসুক, কিন্তু শ্রমিককে কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। বিজিএমইএ’র সভাপতির ভাষ্য— শ্রমিকদের এগিয়ে নিতে দক্ষতা বৃদ্ধি সহায়ক উদ্ভাবনী সক্ষমতা নিয়ে কাজ চলছে। তবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার কমবে না।

সরকারি সংস্থা এটুআই ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এ বিষয়ে একটি যৌথ গবেষণা করেছে৷ সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, যান্ত্রিকীকরণের কারণে বাংলাদেশে ৫টি খাতে ৫৩ দশমিক ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে রয়েছে৷ ২০৪১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতেরই ২৭ লাখ বা বিদ্যমান ৬০ ভাগ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে৷ ফার্নিচার শিল্পের ১৩ দশমিক ৮ লাখ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে রয়েছে ৬ লাখ করে মানুষ৷ একলাখ মানুষের কর্মসংস্থান কমতে পারে চামড়া শিল্পেও।

২০১৬ সালে আইএলও আশঙ্কা করেছিল, তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল শিল্পে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির প্রসার ঘটায় এশিয়ার কিছু দেশে ৮০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক কাজ হারাবে। শ্রমিকের জায়গায় কাজ করবে স্বয়ংক্রিয় মেশিন।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, মেশিনে দক্ষ না হওয়ায় কাজ হারাচ্ছেন নারীকর্মীরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) একটি সমীক্ষা সেই দাবিকে সমর্থন করে বলছে, গার্মেন্টস শিল্পে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির বিকাশ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নারী শ্রমিকের হার কমতে শুরু করেছে। সর্বশেষ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে পোশাক শিল্পে মোট শ্রমিকের মধ্যে নারী শ্রমিক ছিল ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ছিল ৬৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে গোটা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ৯৫ লাখ শ্রমিক নিয়োজিত ছিল, যা ২০১৭ সালে সাড়ে ৮৭ লাখে নেমে এসেছে৷ অর্থাৎ এই সময়ে আট লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন এ খাত থেকে৷ বছরে কর্মসংস্থান কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ হারে৷

সাধারণত গার্মেন্টসে স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডায়িং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং টেস্টিং, ওয়াশিং এবং অ্যামব্রয়ডারি মেশিন ব্যবহার হয়। মালিকরা বলছেন, জ্যাকার্ড মেশিনের দাম প্রায় ১৫ লাখ টাকা। একজন শ্রমিক একাই সাতটি পর্যন্ত মেশিন চালাতে পারেন। ফলে শ্রমিক ছাঁটাই হবে। তবে পাশাপাশি অনেক কারখানার পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে, ফলে বেকারত্ব বাড়বে না।

তবে শ্রমিকদের হিসাব ভিন্ন। তারা বলছেন, ১০ জন নিটিং শ্রমিকের সমান কাজ করার জন্য একটি জ্যাকার্ড মেশিনই যথেষ্ট। একটি জ্যাকার্ড মেশিন ১০ জন নিটিং অপারেটরকে বেকার করে দিচ্ছে। তারা অন্য কোথাও কাজ পাচ্ছেন না তা নয়, তবে আগের মতো ভালো অবস্থান পাচ্ছেন না।

জ্যাকার্ড আসার পর অনেক শ্রমিক ভালো চাকরি থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন উল্লেখ করে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেসময় আমরা আন্দোলন করেছিলাম। শ্রমিকও ছাঁটাই হয়েছিল গাজীপুর এলাকার কারখানাগুলো থেকে। শ্রমিক তার ভালো ও নির্ভরযোগ্য চাকরি হারিয়েছেন, কিন্তু বেকার হননি খুব একটা। কেননা, কারখানার পরিসর বেড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এই মেশিনের বেশকিছু নেতিবাচক বিষয়ের একটি হলো, এর ফলে নারী শ্রমিকরা চাকরি হারিয়েছেন। মেশিনের জায়গাগুলোতে নারী শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, নতুন নিয়োগ হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেবল অটোমেশিন নয়, নতুন বেতন কাঠামো হলো যখন, তখন প্রতিজন অপারেটর পিছু দু’জন হেলপারের একজন কমিয়ে দেওয়া হলো। তারা একই খরচ রাখবে, শ্রমিকের বেতন বাড়লে শ্রমিকের সংখ্যা কমবে।’

এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী হতে পারে, এ প্রশ্নে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের আধুনিক বিশ্ব থেকে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। বাজারটা প্রতিযোগিতার। স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ফলে শ্রমিক কিছু বাদ পড়বে— এটা স্বাভাবিক, তবে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা আছে।’ তিনি বলেন, ‘এটুআই প্রকল্পের সঙ্গে বর্তমানে শ্রমিকদের উদ্ভাবনী দক্ষতা নিয়ে একটি কাজ শুরু হতে চলেছে; সেটা খুব কাজের হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

শ্রমিকের দক্ষতা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘টেক্সটাইলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র অনেক বেশি, গার্মেন্টসে কম। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর হিসাব বলছে, শ্র্রমিকের সংখ্যা ৪৪ লাখ। তাহলে শঙ্কা করার মতো শ্রমিক কমেছে বলা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সোয়েটার কারখানায় স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ওপরে নির্ভরশীলতা বেশি বলে সেখানে লোক চাকরিচ্যুত হয়েছে, কিন্তু তারা বেকার হয়নি। আরও অনেক কাজের জায়গা তৈরি হয়েছে, সেখানে ঢুকেছে। যারা দক্ষ না, তাদের জন্য কিছু বলার নেই।’ আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চায়নার একজন অপরারেটরের জায়গায় আমাদের তিনজন লাগে। ফলে আমি সবদিক দিয়েই ক্রেতার কাছে নেতিবাচক ইমেজ দিচ্ছি।’ শ্রমিক তার দক্ষতা বাড়াবে কীভাবে, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের আয়োজনে তাদের জন্য বেসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। সরকারের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে।’

এদিকে, এক্সেসরিজের বাজারে খুব বেশি স্বয়ংক্রিয় মেশিনের প্রবেশ ঘটেনি উল্লেখ করে বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আব্দুল কাদের খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্রেতার চাহিদা, তাদের কোয়ালিটি বজায় রাখতে গেলে স্বয়ংক্রিয় মেশিন ছাড়া উপায় নেই। আর যখনই সেদিকে প্রবেশ করবো, শ্রমিক সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে। তবে এতে শ্রমিক বেকার হচ্ছে না। কেননা, প্রতিবছর আমাদের সদস্যও বাড়ছে, কাজের জায়গা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে নতুনভাবে এই ব্যবসায় আসা কঠিন। এখন যারা আসছেন, তারা বড় বিনিয়োগ নিয়ে আসছেন এবং কমপ্লায়েন্স নিয়ে তাদের ভাবনা বেশি। সব মিলিয়ে এখন পযন্ত যে বার্তা আমাদের কাছে আছে, তাতে খুব বেশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের খবর নেই।’ 

/এমএ/এপিএইচ/

লাইভ

টপ