ভেজালের মামলায় আইন নির্ধারণেই ভেজাল

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:০৮, জুন ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৪, জুন ১৯, ২০১৯

ভেজাল ও অনিয়ম প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট, ফাইল ছবিভেজালবিরোধী একাধিক আইন থাকায় এই অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা বা শাস্তি নির্ধারণে কোনও  সমন্বয় নেই বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। ভেজালবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনাকারী পৃথক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা অন্য কোনও আইনে নয়, নিজেদের আইনে মামলা পরিচালনায় স্বস্তিবোধ করেন। আবার অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের  বিধান রেখে নতুন আইনের দাবিও  দীর্ঘদিনের।  আইনমন্ত্রী বলছেন,বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এ এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান আছে। কাজেই সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করলে নতুন আইনের দরকার হয় না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সবগুলো আইনের সমন্বিত একটি আইন জরুরি।

ভেজালের বিরুদ্ধে দেশে ‘ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯’, ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’, ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫’, ‘দণ্ডবিধি ও বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪’ রয়েছে। এসব আইনের অধীনেই মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনার বিধান আছে।  খাদ্যে ভেজালের জন্য বা ভেজাল খাদ্য, পানীয়, ওষুধ  বা প্রসাধনী উৎপাদন ও বিক্রির মতো  অপরাধ বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। ভেজালবিরোধী অভিযানে যেসব  অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে, তার সবই বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এর ২৫/সি ধারায় বিচার করা সম্ভব। এ ধারায় অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের কারাদণ্ড। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এমন একটি কঠিন আইন থাকার পরও  এ  ধরনের  অপরাধের জন্য নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এর অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে।

এদিকে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ  প্রতিরোধের লক্ষ্যে  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ পণ্যের মোড়ক, মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা, সেবার মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, ধার্য করা মূল্যের অধিক দামে ওষুধ বা সেবা বিক্রয় করা, ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করা, খাদ্য পণ্যে নিষিদ্ধ  দ্রব্যের মিশ্রণ করা, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা, ওজনে কারচুপি করা, বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি করা, পরিমাপে কারচুপি করা, পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন করা, মেয়াদোত্তীর্ণ কোনও পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করা ইত্যাদি ঘটানো, মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা ইত্যাদি অপরাধধের সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড  বা উভয়দণ্ড দেওয়ার বিধান করা হয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাসুম আরেফিন মনে করেন,  ‘কেবল মৃত্যুদণ্ডের জন্য পৃথক আইনের খুব বেশি দরকার আছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন বেশ শক্তিশালী। এতে মৃত্যুদণ্ডের  বিধান আছে। যেসব আইন আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করাটাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। এরপরও যদি কেউ অন্য আইনে মৃত্যুদণ্ডের  বিধানের কথা বলেন সেটা সরকারের বিবেচনার বিষয়। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, বিশেষ ক্ষমতা আইনের পর আর এই বিধান নিয়ে আরেকটা আইনের খুব দরকার নেই।’

সরকার চাইলে মৃত্যুদণ্ডের  বিধান রেখে নতুন আইন করতে পারে উল্লেখ করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মাহবুব কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করবো না। কেননা, সেটার নির্দিষ্ট আদালত আছে। আমরা আমাদের নিজেদের আইনে মামলা করবো। যাতে করে অপরাধ কী, অপরাধী কোন পর্যায়ের, অর্থাৎ সব ধরনের বিষয় সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়।’ 

অবহেলা থেকেই এই আইনে মামলা হয় না উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ এর ২৫ এর/সি ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে কোন ভেজালগুলোর ক্ষেত্রে এই আইন ব্যবহার করা যাবে এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত আছে। এরপরও নতুন আইন করে মৃত্যুদণ্ডের বিধানের দাবি করছেন যারা, তারা কেন করছেন তা আমি বলতে পারবো না।’

সেক্ষেত্রে কেন বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার না করে তুলনামূলক দুর্বল ও কম শাস্তির ধারা দিয়ে মামলা করা হয় প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘সেটা যারা করেন তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে আমাকে বলতে বললে আমি বলবো— নেগলিজেন্স থেকে এটা করা হয়ে থাকে।’

বঙ্গবন্ধু সেই সময় যে আইনগুলো তৈরি করেছেন সেগুলো এখনও যুগপোযোগী উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অনেক অপ্রয়োজনীয় আইনের কথা বিএনপি, জামায়াত ও সুধীসমাজ বলার চেষ্টা করেছে। এমনকি যারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেসময় আইন প্রণয়নকালে যুক্ত ছিলেন, এমন অনেকে নতুন আইনের কথা বলছেন। অথচ এটুকু খেয়াল করেন না যে, বঙ্গবন্ধু অনেক আইন করে দিয়েছেন, যেটি আজকের দিনেও যুগোপযোগী।’

একাধিক আইনের কারণে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেন তেমন হবে, গুরুত্ব সহকারে করলেই তো হলো।’

মানবাধিকারকর্মী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, ‘একই বিষয়ে একাধিক আইন থাকলে একধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। কোন আইন কখন ব্যবহার হবে, তার সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দরকার। জটিলতা এড়াতে একটি সমন্বিত আইন করা যেতে পারে— যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিয়ে কোনও ধরনের দ্ব্যর্থকতার সুযোগ থাকবে না।’

 

 

/ইউআই/এসটি/এপিএইচ/

লাইভ

টপ