লন্ডন প্রবাসী দয়াছের অডিও সংলাপে দুদকের ওরা কারা? (অডিও)

Send
দীপু সারোয়ার
প্রকাশিত : ২২:২৪, জুন ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫২, জুলাই ০১, ২০১৯

বাংলা ট্রিবিউন এক্সক্লুসিভ

ডিআইজি মিজানুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত থেকে নিষ্কৃতি পেতে সরাসরি ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন করেছেন। গোপনে ধারণ করা বেশ কিছু অডিও রেকর্ডে সে প্রমাণ উঠে এসেছে। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন আব্দুল দয়াছ নামে লন্ডন প্রবাসী এক ব্যক্তি। এসব কথোপকথন হয় রাজধানীর একটি হোটেলে। সম্প্রতি  এ রকম পাঁচটি অডিও রেকর্ড বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে। এসব কথোপকথনে অনুসন্ধান ও মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে দুদক কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার এবং প্রয়োজনে আরও দেওয়ার কথা বলেন মিজান।

অডিও রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ঘুষ লেনদেনের সমন্বয়কারী আব্দুল দয়াছ যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক। পেশায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। দয়াছের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের ছাতারপইয়ে।

দয়াছ ও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে এসব কথোপকথনে অংশ নেন অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) থাকা দুদক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভূইয়া। ইকবাল, এনামুল বাছির, শফিক, নাসিম, জায়েদ ও পাটোয়ারী নামে ছয়জনকে ঘিরে এই কথোপকথন চলে। অডিও কথোপকথনে আলোচিত ব্যক্তিরা দুদক কর্মকর্তা। আর তাদের অনেকেই দয়াছের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছেন। 

দুদকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দয়াছের ছবিও পাওয়া গেছে। আর তা বাংলা ট্রিবিউনের হাতেও এসেছে। বিভিন্ন ছবিতে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের সঙ্গেও দয়াছকে দেখা যায়। লন্ডন থেকে দেশে আসার পর ডিআইজি মিজান নিজেও দয়াছকে গাড়ি-হোটেলের সুবিধা দিয়েছেন এমন তথ্যও আছে অডিও রেকর্ডে।

সম্প্রতি দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন—গণমাধ্যমের কাছে এমন অভিযোগ করেন পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান। এ বিষয়ে একাধিক অডিও প্রকাশ করেন তিনি। তার অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের দায়িত্বে ছিলেন বাছির। এ অভিযোগের পর দুদক খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং ডিআইজি মিজানের ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রাখে। পুলিশ সদর দফতরও বিষয়টি পৃথকভাবে তদন্ত করছে। দুদকের তদন্ত কমিটি গঠন হয় গত ১৩ জুন। অন্যদিকে, পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ১৬ জুন।

লন্ডন প্রবাসী আব্দুল দয়াছ

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কথোপকথনে ইকবাল নামে যার নাম আলোচিত হয়েছে তিনি হলেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। এনামুল বাছির হলেন দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির, শফিক হলেন দুদক পরিচালক কাজী শফিক, নাসিম হলেন দুদক পরিচালক নাসিম আনোয়ার এবং পাটোয়ারী হলেন দুদকের উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী, আর জায়েদ হলেন দুদকের সাবেক পরিচালক এ কে এম জায়েদ হোসেন খান। 

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ রবিবার (২৩ জুন) বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আব্দুল দয়াছকে চেনেন তিনি। তবে দুদকের কোনও অনুসন্ধান বা তদন্তের বিষয়ে দয়াছের সঙ্গে কখনও আলোচনা হয়নি। আর দুদকে তার বিষয়ে কেউ কখনও অভিযোগও করেননি বলে জানান দুদক চেয়ারম্যান।

কথোপকথনে নাম এসেছে কেন জানতে চাইলে দুদক পরিচালক কাজী শফিফ বলেন, আমার নাম আলোচিত হতেই পারে। ডিআইজি মিজানের বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই লেগে আছি আমি। তবে তার দাবি, দয়াছের সঙ্গে তার একবারই কথা হয়েছিল। লন্ডন থেকে ভাইবারে ফোন দিয়েছিলেন দয়াছ। তখন তার প্রশংসাও করা হয়। আর সাক্ষাতের জন্য সময় চাওয়া হয়।

কাজী শফিকের দাবি, সাক্ষাতের জন্য দয়াছকে সময় দেওয়া হয়নি। এমন সাক্ষাতে দুদকের নিষেধ আছে জানানো হয় দয়াছকে।

দয়াছের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চ মাসে কথা হয় বলেও জানান শফিক।

কথোপকথনে অবসর প্রস্তুতিকালীন ছুটিতে (এলপিআর) থাকা দুদক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভূইয়া বলেন, শফিকের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। ও আমার কথা রাখবে—এমন কথা বলার মানে কী? আর ডিআইজি মিজানের বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে শফিক বলেন, আজিজ ভূইয়া আমার পুরনো কলিগ। তার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। দয়াছ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায় বলে আজিজ ভূইয়া জানিয়েছিলেন আমাকে।

আব্দুল আজিজ ভূইয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে বলা হয় রং নম্বর। পরে বলা হয় দুদকের এই কর্মকর্তা বর্তমানে নম্বরটি ব্যবহার করছেন না।

দুদক কর্মকর্তা নাসিম আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। আর এনামুল বাছির এ নিয়ে কথা বলেননি। জায়েদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।

ডিআইজি মিজান অডিও রেকর্ডের কথোপকথনের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘দয়াছ দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের ঘনিষ্ঠ।’

(শুনুন: ডিআইজি মিজানের বক্তব্য)

মোবাইল ফোন থেকে দয়াছের লন্ডনের নম্বরের (+৪৪৭৫.....০০২) যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ফোন ধরেননি তিনি।

বাংলা ট্রিবিউনের হাতে আসা তিনটি অডিও রেকর্ডের সময়কাল চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি। অন্য দু’টি অডিও রেকর্ডের সময়কাল নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ৩০/এ, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টনের হোটেল ভিক্টোরির ২১১ নম্বর রুমে দয়াছ, ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক আব্দুল আজিজ ভূইয়ার মধ্যে ওই কথোপকথন হয়।

ডিআইজি মিজানুর রহমান (ফাইল ফটো)

যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক দয়াছ জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছিলেন। সেবার ঢাকা ও সিলেট মিলে দেশে অবস্থান করেন প্রায় দুই সপ্তাহ। গত এপ্রিল মাসে সর্বশেষ লন্ডন থেকে ঢাকায় আসার পর হোটেল ভিক্টোরিতেই উঠেছিলেন দয়াছ।

যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় এলে দয়াছ হোটেল ভিক্টোরিতেই অবস্থান করেন বলে নিশ্চিত করেন হোটেলটির ফ্রন্টডেস্ক কর্মকর্তা মেহেদী। বলেন, হোটেলের পুরনো কাস্টমার তিনি। আর দুই-তিন মাস পরপরই তিনি দেশে আসেন বলে জানান এই হোটেল কর্মকর্তা।

কথোপকথনে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা গায়েব নিয়ে গঠিত দুদকের তদন্ত কমিটি এবং এ নিয়ে দুদক কর্মকর্তা শফিকের ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। কথোপকথনে সবচেয়ে আলোচিত নামটিও তার। শফিককে নিয়ে ডিআইজি মিজানের ভীতির বিষয়টিও কথোপকথনে স্পষ্ট। তাকে (শফিক)  এনামুল বাছির সিন্ডিকেটের প্রধান বলেও কথোপকথনে মন্তব্য করা হয়েছে। এছাড়াও দীর্ঘ কথোপকথনে দুদক কর্মকর্তাদের প্রমোশন, বদলি ও স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।

হাতে পাওয়া ৫৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের পাঁচটি অডিও রেকর্ডের কিছু অংশ অস্পষ্ট। সেই অংশগুলো বাদ রেখেই দয়াছ, মিজান ও আজিজের কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।    

কথোপকথন-১

ডিআইজি মিজান: বসের সাথে দেখা হয় নাই।

আব্দুল দয়াছ: বসের সাথে দেখা হইলো, গল্পটল্প হইলো। বললো এবার ইলেকশনে মজা লাগলো না। কয় এই দয়াছ তুমি জানো...আজিজ ভাই আছিলো আমার লগে। ইলেকশনটা মজা লাগলো না।

ডিআইজি মিজান: হা হা...(হাসি।) যাকগে এগুলা বাহিরে বলা যাবে না।… এখন কী?...এনামুল বাছির কী বললো?

আব্দুল দয়াছ: ওকে আছে। আজকে আইবো। লেনদেনের কথা। কাল-পরশু দিয়া দিয়েন কিন্তু। …না দিলেও কইরা দিতো।

ডিআইজি মিজান: না, আমি দেবো।

আব্দুল দয়াছ: আপনি নিজেই দিয়েন।

ডিআইজি মিজান : ওর সামনে আমি ফেস হই না। আপনি নিয়ে নেন। ডিমান্ড বেশি না। আজকেই দিয়া দেই। আজিজ ভাই থাকবো।

আব্দুল দয়াছ: ডিমান্ড টিমান্ড বুঝি না। ওইসব কথা বইলা লাভ নাই। আমাদের প্ল্যান করতে হইবো। আপনার বিষয়টা তো ক্লিয়ার করতে হইবো। নিলে বলবো আরও দেবো। কারণ, আপনারটা ক্লিয়ার করতে হইবো।

ডিআইজি মিজান: আর বসের ব্যাপারটা?

আব্দুল দয়াছ: আরেকজন বন্ড কমিশনার আছিলো, তারে ক্লিয়ার কইরা দিয়া আইছি। ৪০ লাখ… ইকবাল ভাইরে কয়া আমি ক্লিয়ার কইরা আলাইছি।

ডিআইজি মিজান: ইকবাল ভাইরে দিয়া আপনের বলাইতে হইবো।

আব্দুল দয়াছ: আমি তো...শুনেন।

ডিআইজি মিজান: শুনে আমি করবো?

আব্দুল দয়াছ: করছি তো। আপনেরে আমি দেখাই। আপনি তো বিশ্বাস করবেন না। আমার কাজ তো আপনি বুঝবেন না।

ডিআইজি মিজান: দরকার নাই। আমার দরকার কাজ। ইকবাল ভাইয়ের সাথে আপনার কী সম্পর্ক না সম্পর্ক সেটা আমার দরকার নাই।

আব্দুল দয়াছ: না.. না… আমি কই আপনাকে।

ডিআইজি মিজান: শোনেন...ওর সাথে কোথাও বসেন।

আব্দুল দয়াছ: আজকে বইয়া...আমি তো শনিবার যাইতাম গি। আমারে আজিজ ভাইয়ে কয় আমরা তো...।

ডিআইজি মিজান: শফিককে কী আর দরকার আছে?

আব্দুল দয়াছ: না, শফিককে আর দরকার নাই।

ডিআইজি মিজান: ওকে। ও তো (বাছির) আমাদের ভয় করে। ওরে আবার বইলেন না। তাইলে ও তো আবার মাইন্ড করতে পারে। শফিককে দেবে কিনা মনে হয়?

আব্দুল দয়াছ: আপনের এইটা চিন্তা করা লাগবো না।

ডিআইজি মিজান: একজনের কথা আরেকজনকে বলা যাবে না।

আব্দুল দয়াছ: বলা যাবে না তো।

এরপর অন্য প্রসঙ্গে আরও কিছু সময় আলাপ চলে।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের (মাঝে) সঙ্গে আব্দুল দয়াছ (ডান থেকে দ্বিতীয়)

কথোপকথন-২

ডিআইজি মিজান: আজিজ ভাই, দয়াছ ভাই, দু’জনেই আছেন। আমার এটা কী করবেন? শেষ পর্যায়ে আর কী।

আব্দুল দয়াছ: উনি (বাছির) আপনার সাথে কথা বলছে কি?

ডিআইজি মিজান: উনি (বাছির) আমার সাথে অতো...ই...হবে না।  এখন আমি বলি, ওখানে যে...ই...আছে না...ডাইরেক্টর শফিক...শফিককে কীভাবে কী দেয়া যায়?

আব্দুল দয়াছ: না না..., শফিক কোনও সমস্যা না।

আজিজ: শফিক কিছু করবে না। হেই রিপোর্ট দিয়া দিবো। সে সাইন দিয়া দিবো শেষ।

ডিআইজি মিজান: এখন আমার কী করার আছে?

আজিজ: শফিকরে আমরা...এই যে...এর আগে যা হইছে না। শফিকরে এর আগে আমরা কম বুঝাইছি?

আব্দুল দয়াছ: তাইলে...কী আর কই!

ডিআইজি মিজান: না, কাজ তো অনেক আগাইছে। দয়াছ ভাই যে উপকারটা করছে। উপকার তো করছে। অস্বীকার করার কিছু নাই।

আব্দুল দয়াছ: রিপোর্টটা দিবে।

ডিআইজি মিজান: রিপোর্টটা, সে (বাছির) বলে ওপর থেকে বলাইতে।

আব্দুল দয়াছ: ওপর থিকা তো আর বলা লাগবে না।

ডিআইজি মিজান: না ভাই, আমি আর উনার সাথে কথা বলবো না।

আব্দুল দয়াছ: চেষ্টা করেন।

আজিজ: এগুলা তো অফিসার সুলভ কথা না।

ডিআইজি মিজান: না, না অতো বেশি প্রেসার দিয়েন না। প্রেসার দিলে ভয় পাইয়া যাইবো। এমনি বেচারা...ডায়াবেটিস টায়াবেটিস কি আছে না...।

তিন জনের কথোপকথনের একপর্যায়ে দয়াছ একটু সরে মুঠোফোনে কারও সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আজিজের সঙ্গে ডিআইজি মিজান কথা বলতে থাকেন। পরে কথা শেষ করে দয়াছ আবার যোগ দেন।

ডিআইজি মিজান: এখন আমি বলি, আমি আপনাকে বলি ভাই। আমার তো যা...

আজিজ: দিছেন...

ডিআইজি মিজান: আরে ১০, ১০-বিশ টোটাল দেওয়া হইছে। ... এখন তো আমার ক্ষতি তো বা...

আজিজ: দয়াছ তাইলে বলে না ক্যা, করে না কেন।

ডিআইজি মিজান: এখন সে নিছে নাকি অন্যরে দিছে তা তো আমি জানি না।

আজিজ: সে নিতে যাবে কেন?

ডিআইজি মিজান: এখন আমি...শফিকরে দিয়া একটু বলান না।

আজিজ: শফিকরে আমি বলতে পারবো।

ডিআইজি মিজান: শফিকরে আপনি বললে মাইন্ড করবো।

আজিজ: না, না...শফিকের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক।

ডিআইজি মিজান: শফিকের যদি কিছু লাগে...আমি কিছু দিয়া দেই।

আজিজ: শফিকের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। কিন্তু রিপোর্টটা তো হ্যার দিতে হইবো।

ডিআইজি মিজান : রিপোর্ট...শোনেন...রিপোর্ট সে দেবে। ভেতরের খবর পাইছি। রিপোর্টটা সে করতাছে খুব চুপেচাপে। কারও জানা নাই। বুঝছেন। আমার সব গেছে। আরেক জায়গায় টাকা দিলাম সেই টাকাটা মাইর গেছে। এখন আমাকে আর কী করতে হবে...

আজিজ: আইচ্ছা উনি আসুক।

মুঠোফোনে কথা শেষে দয়াছ আসেন।

ডিআইজি মিজান: ভাই...এখন যেটা বোঝা গেছে...ভাই হিসেবে বলি আপনাকে।

আব্দুল দয়াছ: ভাই হিসাবে না বইন হিসাবে বলেন।

ডিআইজি মিজান: (হাসি...) ও শালা...আপনারে ভয় পায়...কি নাম ওর...?

আব্দুল দয়াছ:  হু...এনামুল

ডিআইজি মিজান: এনামুল বাছির...। এখন সে...ভেতরের খবর পাইলাম। ভেতরের মানে কি নিচের লেভেলে। কাজ করতে আছে। ও কী করতে আছে আমি জানি না।

আব্দুল দয়াছ: হু...

ডিআইজি মিজান: সে আমার কথা শুইনা...যেহেতু আপনার সাথে কথা বলছে...ভাইয়ের (আজিজ) সাথে কথা বলছে। জায়েদ ভাই কথা বলছে...। এখন আমার কথা হলো যে...কোনও যদি খেদমত লাগে...শফিক বা...শফিক হলো মেইন। তাহলে সেটাতো ফুলফিল করতে পারি...অসুবিধা নাই...বা ও যদি চায়...।

আব্দুল দয়াছ: আজকালের মধ্যেই কথা হইবো।

ডিআইজি মিজান: ও যদি চায়...

আব্দুল দয়াছ: দেখি টেলিফোনে অরে...এনামুল বাছিররে। ধরতাছে না।

ডিআইজি মিজান: এখন ও ভয়ে কথা বলবে না। এই নম্বরে (অফিসিয়াল নম্বর) কথা বলবে না।

আব্দুল দয়াছ: হু...

আজিজ: চাকরির ব্যাপার তো...

ডিআইজি মিজান: চাকরির ব্যাপার তো কথা বলবে না।

আব্দুল দয়াছ: হু...

ডিআইজি মিজান: আমি তাকে কালকে একবার রিং দিছি এই নম্বরে...সে আমারে লিখছে ডোন্ট কল মি। লিখছে যে হোয়াই ইউ আর কলিং মি...

আব্দুল দয়াছ: আপনারে ম্যাসেজ দিছে...

(সবাই হাসেন)

ডিআইজি মিজান: আমি তো আর কল করি নাই।

আব্দুল দয়াছ: কল দিছে...কল দিছে... সে কল দেবে তারটা ট্র্যাকিং হবে...আমারটা...আমারটা ট্র্যাকিং হবে না।  (ফোনে কথা বলেন) ওয়ালাইকুম সালাম। ভাই কই। আমি আইছি তো ঢাকা...গতকালকা বিয়াশাদি খাইয়া সিলেট থেকে। আপনি ফ্রি হইলে ফোন দিয়েন...আমি তো আছি একা একা। আমি তো অফিসে যাইতামই। আপনিও সময় পেলে চইলা আইসেন এদিকে। হোয়েন এভার ইউ ফ্রি...আমি তো হোটেলেই।…(অপর প্রান্তের কথা শুনে) তাইলে আমি দেখমুনে। গোসল টোসল কইরা আপনারে ফোন কইরা আসমুনে ওইদিকে। ওকে সালামালাইকুম।

(এই কথোপকথনের অন্য পাশের বক্তব্য নেই বাংলা ট্রিবিউনের কাছে)।

ডিআইজি মিজান: এখন আমি বলি...

আব্দুল দয়াছ: ও (বাছির) বলে, ভাই...

(সবার হাসি...)

ডিআইজি মিজান: ভয় পাইছে, ভয় পাইছে...। দয়াছ ভাই আমি বলি...টাকাডা বড় কথা না...মানসম্মান বড় কথা। আমার ফাইলে তো কী আছে সবাই জানে...কিছুই নাই। উনারা তো বিশেষজ্ঞ। উনারা দেখছে...ইয়ে দেখছে...আপনি নিজে দেখছেন...এরপর আমার কাছে যে কাগজপত্র চাইছে আমি সব দিছি।

আজিজ: দিয়া দিছেন?

ডিআইজি মিজান: সব দিয়া দিছি। তারপর সে নিজে নেগেটিভ, পজেটিভ কিছু বলে নাই। তবে একটা জিনিস বলছে যে...মিজান ভাই আমি যেটুকু পারি আপনার মানসম্মান রাখবো। এটুকু বলছে। সে কিন্তু একেবারে নেগেটিভ কিছু বলে নাই...আবার পজেটিভও না।

আব্দুল দয়াছ: সে কিন্তু না করলে বলতো না। সে কিন্তু স্কোপ দিয়া রাখছে।

ডিআইজি মিজান: এখন সবাই মিলা আমাকে...শোনেন শোনেন ভাই...দয়াছ ভাই...আপনে শফিককে একটু পজেটিভ কইরা দেন...যাতে সে নেগেটিভ না হয়। আর ওকে একটু বলে দেন...

আব্দুল দয়াছ: আমি আপনাকে বলি...আমরা কি বুঝি না...ইকবাল স্যার তো ডেইলি বলবে না। ওইদিন যা বলার বলছে...

ডিআইজি মিজান: না, না, না...ইকবাল স্যার তো...

আব্দুল দয়াছ: ইকবাল ভাই...বলছে জাস্টিস ফর এনাফ...

ডিআইজি মিজান: এইটুকু বললেই হয়...

আব্দুল দয়াছ: বুঝছেন...এইটা তো বলছে...নাইলে ওরা কী বলছে...আমি বুঝি না।

ডিআইজি মিজান: এইটা কি শফিকরে বলছে...?

আব্দুল দয়াছ: আমি বলি শফিক মিয়া তো...ওরা…আলাপ হইছে...এনামুল বাছির আর শফিকরে...এনামুলরে বলছে একটা ডাইরেক্টর দিয়া করাইয়া দেও। এবং শফিকরেও তো দিছে এনামুল বাছিরে, আজিজে কথাবার্তা কইয়া...এরা সবাই কথাবার্তা বলছে...যদি নেগেটিভ হইতো...স্যারে যেভাবে বলছে তাহলে তো উল্টা কইতো...।

(একটু পর তিনি আবারও বলেন)

আব্দুল দয়াছ: শুনেন, তার প্রমোশন আছে না...১০ লাখ, ২০ লাখ আর ৫০ লাখতো ব্যপার না। শুনেন, এখানে নাসিম ভাই ছিল...তারে খুলনায় পাঠাইছিল। এরপর ইকবাল ভাইরে সাইজ টাইজ কইরা তারে ঢাকায় নিয়া আসছি না...

(দয়াছ আবারও বলেন)

আব্দুল দয়াছ: এনামুল বাছিরের কথা যদি কইয়া দেই সে টাকা খাইছিল...একটা প্রধানের ব্যাপারে আপনার ভালো কইতে হইবো...তার ভালো ছাড়া খারাপ কইবার পারেন না...আনলেস আপনার ম্যাজেস্ট্রিসি দেখাইতে হবে...এনামুল বাছিররা যে সিন্ডিকেট ক্রিয়েট করছে....

ডিআইজি মিজান: বাড়ি কই? এনামুল বাছিরের বাড়ি কই?  কুমিল্লা?

আজিজ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়...

ডিআইজি মিজান: না, না, এনামুল বাছিরের বাড়িতো কুমিল্লায়...

আব্দুল দয়াছ: ইকবাল ভাই যারে স্ট্যান্ড রিলিজ করি ফালায়, তার জিন্দেগি খারাপ হয়া যায়...ইকবাল ভাইরে রিকোয়েস্ট কইরা নাসিমরে ঢাকা আনছি।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে আব্দুল দয়াছ

কথোপকথন-০৩

ডিআইজি মিজান: এখন শোনেন আপনি যে কয়দিন আছেন, জোর করে অরে রিপোর্ট দিয়া দিতে বলেন...

আব্দুল দয়াছ: রিপোর্ট তো দিয়া দিবো।

ডিআইজি মিজান: আপনি থাইকা একটু পজেটিভ কইরা দিয়া যান না! যেহেতু আমি নিজে...সাফারার তো...আর কতো?  শফিক ও আর ও, বাছির...শফিক যদি কিছু চায়....অসুবিধা নাই।

আজিজ: আমরা যেটা করছি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করার কিছু নাই...

আব্দুল দয়াছ: না না এরপরও তো মনে করেন...

ডিআইজি মিজান: ফাইলে কিছু নাই...আপনি কি স্যাটিসফাইড, আমার ফাইলে কিছু আছে?

আব্দুল দয়াছ: বাছির জানে চেয়ারম্যান পজেটিভ। না হলে তো তার....

ডিআইজি মিজান: তা তো বটেই...সেটা সে বোঝে...এতদিন চাকরি করছে এটা সে বোঝে না?  আপনি তাইলে ইমিডিয়েটলি এনামুল বাছিরকে বইলা দেন...ই… করতে...আমি আপনার ওয়েতে কইরা দেবো...পজেটিভলি।

আব্দুল দয়াছ : সে আমারে কইছে একদিন...‘মিজান ভাই আমারে কইছে এক কোটি টাকা দেবো’...। …টাকা যেহেতু খাইছে, কইরা দিবো। সে তো টাকা খাওয়ার লোক না।

আজিজ: এনামুল বাছির আপনার ফেভারে আছে। শফিকও ফেভারে আছে।

ডিআইজি মিজান: শফিক যাতে ফেভারে থাকে।

আব্দুল দয়াছ: সব ঠিক আছে...

ডিআইজি মিজান: তারপরও আগে কিছু দেওয়া হইছে...ফাইনালি আরও কিছু দিলাম...।

আজিজ: কিছু আনবো...।

ডিআইজি মিজান: না, আপনি চাইলে আমি বলি...।

পুলিশের অতিথি আব্দুল দয়াছ

কথোপকথন-৪

ডিআইজি মিজান: বসেন, বসেন...আমি আপনার সাথে কথা বলে চলে যাবো। আরে ভাই একঘণ্টা লাগলো। জ্যাম, পুরা জ্যাম। আপনার ফ্লাইট কবে? যাবেন কবে?

আব্দুল দয়াছ: শনিবারে।

ডিআইজি মিজান: কনফার্ম?  যাক এখন কী অবস্থা?

আব্দুল দয়াছ: অবস্থা হইলো...আমি আপনারে...

ডিআইজি মিজান: না...বাছিরকে আজকে আসতে বলেন...

আব্দুল দয়াছ: কথা হইছে...

ডিআইজি মিজান: কী বললো...আমি জানি যে মিস্টার দয়াছ পারবে...বলেন...আপনি যদি না থাকেন...লন্ডন চলে যান। তাইলে এই ফাইলটা যদি নোট হয়...যে রিপোর্ট দিবে...পজেটিভ রিপোর্ট দিবে বা... মেম্বার দু’জন লেখবে...তারপর চেয়ারম্যানের কাছে যাবে।

আব্দুল দয়াছ: আপনার স্ত্রীর বিষয়টাও...লেখা থাকবে... থাকতে পারে...।

ডিআইজি মিজান: ওর ট্যাক্স ফাইল আছে তো... প্রোপার্টির ঘোষণা দেয়া আছে তো। ১০/১২ বছরের ট্যাক্সের কাগজ নিয়ে আসছে তো। ওনারে নিয়া রিপোর্ট হয় না। আগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা পাটোয়ারী আমারে নিজে কইছে...

আব্দুল দয়াছ: ওনার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে...

ডিআইজি মিজান: এটা করলে ভুল করবে তারা।

আব্দুল দয়াছ

কথোপকথন-৫

আব্দুল দয়াছ: আমি বলছি মিজান ভাই সবকিছু ওভারকাম করবো। আইজি না হলেও অতিরিক্ত আইজি হইবো।

ডিআইজি মিজান: স্যারকে কী করা যায়?

আব্দুল দয়াছ: স্যার কনভিন্সড।

ডিআইজি মিজান: এখন শফিককে কী করা যায়?

আব্দুল দয়াছ: কোনও সমস্যা নাই।

ডিআইজি মিজান: ও খায়। মুন্সীগঞ্জে ওর এক আত্মীয় আছে, তার মাধ্যমে খায়।

ডিআইজি মিজান: দিনাজপুরের কয়লাখনি নিয়ে কোনও ঘটনা আছে। এইটা নিয়া খাইছে।

আব্দুল দয়াছ: বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। দোষীদের ছাইরা দিচ্ছে ও।

ডিআইজি মিজান: আমি না একদম জিরো হইয়া গেছি। বিশ্বাস করেন। আমার কান্না, আপনার ভাবির কান্না কেউ দেখলে এই ক্ষতি করতে পারতো না আমাদের।

আব্দুল দয়াছ: এনামুল বাছির কেমন লোক মনে হয়?

ডিআইজি মিজান: ঠান্ডা লোক। ডায়াবেটিস আছে...ই… আছে। চালু আছে...দুদকের লোক তো।

আব্দুল দয়াছ: সমস্যা নাই।

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ