বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২৩:১৮, জুন ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:২৫, জুন ২৫, ২০১৯

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি

বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায় না, তা করা সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। এজন্য সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘তারুণ্যের কর্মসংস্থান ও বাজেট’ শীর্ষক বৈঠকিতে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন বক্তারা।

মঙ্গলবার (২৫ জুন) বিকালে মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে ‘তারুণ্যের কর্মসংস্থান ও বাজেট’ শীর্ষক বৈঠকির আয়োজন করা হয়।

মুন্নী সাহা

এসময় তরুণদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন ইয়াং বাংলার কনভেনর ও সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘একটি বাজেটে অনেক কিছু থাকে। বাজেট যখন প্রস্তাব করা হয়, তার বিস্তারিত কিন্তু আমরা পাই না। সেই জায়গাতেও আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে। আমরা যারা তরুণদের নিয়ে কাজ করি, তারা চাই এই বাজেটের জায়গা থেকে তরুণদের গতি বাড়াতে। আমাদের মনিটরিং এবং মূল্যায়নের জায়গায় কাজ করতে হবে।’ 

নাহিম রাজ্জাক

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের যে ইশতেহার ছিল, তাতে দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল দারিদ্র বিমোচন এবং তারপরে ছিল তারুণ্যের প্রতি আমাদের যে প্রতিশ্রুতিগুলো। সেই জায়গা থেকে আসলে ১০০ কোটি টাকা কিছুই না। কিন্তু সেখানে যদি আমরা দেখি যে, বিভিন্ন খাতওয়ারিতেও বরাদ্দ রাখা আছে। এগুলোকে বাস্তবায়ন করা একটা চ্যালেঞ্জ আর বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

তরুণদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে এবারের নির্বাচনি ইশতেহার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ( আইআইডি)-এর প্রধান নির্বাহী সাঈদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘‘এবারের বাজেট করা হয়েছে নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে। নির্বাচনি ইশতেহারের একটা বড় অংশ জুড়েই ছিল তরুণ। তরুণদের কর্মসংস্থান একটি বড় মাথাব্যথার বিষয় ছিল আমাদের।’

সাঈদ আহমেদ

বাজেট বরাদ্দ ও তা বাস্তবায়নের বিষয়ে সাঈদ আহমেদ আরও বলেন, ‘প্রতিফলনের দিকে তাকালে আমরা দেখি, বর্তমান বরাদ্দের বাইরেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খাতওয়ারি কর্মসংস্থানের জন্য বাজেট আছে। কিন্তু আমাদের শঙ্কার জায়গা যেখানে, বাজেট বরাদ্দ যতো বাড়ছে , বাস্তবায়ন ততো বাড়ছে না। পাঁচ বছর আগে একশ’ টাকা খরচ করতে চাইলে, সেটার জন্য ১১০ টাকা বরাদ্দ করতে হতো। গতবছরের হিসাব হয়েছে, ১০০ টাকা খরচ করতে চাইলে বরাদ্দ করতে হয় ১২৫ টাকা। এই যে গ্যাপটা দিন দিন বাড়ছে।’

দেশের অর্থনীতির জন্য এবারের বাজেটের তুলনায় আরও ৩০-৪০ শতাংশ বড় বাজেট প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের চাহিদা বাড়ছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে। আমাদের উন্নয়নের চাহিদার তুলনায় এই বাজেট খুব বেশি বড় না, আরও বড় হওয়া উচিত। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে উন্নয়নের যে অবস্থা, সেই তুলনায় দেশের অর্থনীতির জন্য এই বাজেট থেকে ৩০-৪০ শতাংশ বড় বাজেট প্রয়োজন।

তৌফিকুল ইসলাম খান

বাজেট বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে তৌফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, ‘আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছি ১৩ শতাংশের মতো। কারণ যেমন হওয়া উচিত, তার ৭ ভাগ মাত্র খরচ করতে পারছি। এর ফলে আমাদের যে জায়গায় বরাদ্দ দরকার, সেখানে যথেষ্ট বরাদ্দ হচ্ছে না। শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বে কম বরাদ্দের জায়গা আমাদের দেশ। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বরাদ্দ হচ্ছে না। একদিকে আমরা সারা বিশ্বের তুলনায় সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেই স্বাস্থ্যে, অন্যদিকে নিজের পকেট থেকে অর্থ খরচের দিক দিয়ে বাংলাদেশ সবার আগে। এইগুলোর সবকিছুর প্রভাবই আমাদের উন্নয়নের মধ্যে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি জায়গায় আমরা সমস্যায় পড়ি। যে ব্যয় হচ্ছে, এটা কতটুকু ভালোভাবে হচ্ছে? কারণ যখনই দেরি করে ব্যয় করা হয়, তখন সেই প্রকল্পে আরও বেশি ব্যয় দরকার হয়। সময়মতো না করতে পারলে আমার অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে।’

বাজেটের সুফল পাওয়ার জন্য পরিকল্পনার পর্যায়েই অনেকগুলো বিষয়কে মাথায় রাখার কথা বলেছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রকাশ প্রকল্পের জেন্ডার ও সোশ্যাল ইনক্লুশন অ্যাডভাইজর ও আইবিপি ম্যানেজার শিরিন লিরা

শিরিন লিরা বলেন, ‘বাজেটের ক্ষেত্রে সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার আগে, যখন আমরা বাজেট তৈরি করছি, তখন আমাদের একটি পরিপূর্ণ ধারণা থাকা দরকার যে কোন কোন জায়গায় কীভাবে বাজেট দিচ্ছি। অর্থাৎ আমরা তরুণদের নিয়ে কথা বলছি, এর অনেক বড় একটি অংশ নারী, এছাড়া আদিবাসী, প্রান্তিক তরুণ আছে, তাদের জন্য আমরা কীভাবে বাজেট বরাদ্দ করছি এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যদি পরিকল্পনা পর্যায়ে এগুলো মাথায় না রাখি, তাহলে আমরা যে সুফল আশা করি সেটা অনেক সময় হয় না।’

শরিফুল হাসান

কর্মসংস্থানের বিষয়ে বাজেটের কোথাও বিস্তারিত বলা নাই বলে দাবি করেছেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও  ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজেটে বলা হলো ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থান করা হবে। কোন মন্ত্রণালয়ে কতো করবে কেউ বলতে পারবে? বাজেটে রাখার দরকার তাই রাখা হয়েছে, কিন্তু কোনও বিস্তারিত কিছু নাই। ৩ কোটি লোককে চাকরি দিতে হলে প্রতি বছর গড়ে ৩০ লাখ লোককে চাকরি দিতে হবে। বিসিএস থেকে প্রতি বছর সুযোগ পায় ৩-৪ হাজার ছেলে-মেয়ে। সাড়ে ৪ লাখ ছেলে মেয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়। এরা তাহলে কোথায় যাবে?’

এসময় শরিফুল হাসান আরও বলেন, ‘আজকের তরুণদের একটা বড় ভাবনা হচ্ছে কর্মসংস্থান। প্রতিবছর আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার লাখ শিক্ষার্থী পাস করে বের হয়, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে আরও ৫৪ হাজার। এই যে সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী বের হচ্ছে প্রতি বছর, ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স বলছে এদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ বেকার থাকে। উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে বেকারের হার সবচেয়ে বেশি।’

শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গণমুখী শিক্ষা নিয়ে কোনও ভাবনা নেই। আমাদের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির বয়স প্রায় চার দশক। এখনও আমাদের গার্মেন্টসে সবচেয়ে বেশি বেতন পান শ্রীলংকান কিংবা ইন্ডিয়ানরা। আমাদের এই শিল্পে কাজ করছে ২৫ লাখ লোক। মূল টাকাটা যারা নিয়ে যাচ্ছে, আমরা কী ২০-২৫ বছর আগে ভাবতে পারলাম যে, এই সেক্টর এতো বড় হচ্ছে? আমি কেন ৩টা ইউনিভার্সিটি তৈরি করবো না, যেখানে আমার গার্মেন্টস সংক্রান্ত শিক্ষা থাকবে।’

হারুন উর রশীদ

বৈঠকিতে বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ বলেন, ‘‘দেশে তো এই প্রথম বাজেট হয়নি। দেশের একটি নীতিমালা থাকে, সেই অনুযায়ী একটি পরিকল্পনা থাকে। বাজেট তো সরকার করে। অর্থমন্ত্রী যদি ভালো লিডার হন, তাহলে তার একটা ইনপুট সেখানে থাকে। সুতরাং বাজেট যে ‘অর্থমন্ত্রীর বাজেট’ এটা বলার কোনও কারণ নেই।’’

কর্মসংস্থানের ব্যাপারে মানুষকে নীতিগত সহায়তা দিতে সরকারের শক্ত অবস্থান নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

হারুন অর রশীদ আরও বলেন, ‘এখন ধরুন, দেশে কয়েকটি কর্মসংস্থানের মডেল আছে। আমরা সেই মডেল সব জায়গায় বাস্তবায়ন করি না কেন? এই মডেলগুলো পুরো দেশে কার্যকর করা যাবে কিনা সেটা নিয়ে একটা বিতর্ক আছে। মানুষ তার অবস্থান পরিবর্তন করেছে, সরকারের দরকার নীতিগত সহায়তা। সরকার মানুষকে সহায়তা দেবে, সেই জায়গায় খুব শক্তভাবে অবস্থান নিতে হবে।’

রাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এই বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইডি)-এর সহযোগিতায় আয়োজিত বৈঠকিটি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ সম্প্রচার করা হয়েছে।  

 

আরও খবর: 

‘তারুণ্যের কর্মসংস্থান ও বাজেট’ শীর্ষক বৈঠকি শুরু 

তরুণদের কর্মসংস্থান একটি বড় মাথাব্যথার বিষয় ছিল: সাঈদ আহমেদ
বাজেট আরও বড় হওয়া উচিত: তৌফিকুল ইসলাম খান

কোন জায়গায় কীভাবে বাজেট দিচ্ছি পরিপূর্ণ ধারণা দরকার: শিরিন লিরা

মনিটরিং এবং মূল্যায়নের জায়গায় কাজ করতে হবে: নাহিম রাজ্জাক

বাজেটে রাখা দরকার তাই রাখা, বিস্তারিত কিছু নাই: শরিফুল হাসান

‘কর্মসংস্থান মডেল’ বাস্তবায়ন করা যায় না কেন?: হারুন উর রশীদ 

 

/এসও/এএইচ/

লাইভ

টপ