নতুন অর্থবছরে ঢাবির ‘গবেষণা খাতে’ বরাদ্দ কমছে

Send
সিরাজুল ইসলাম রুবেল, ঢাবি
প্রকাশিত : ০৬:৫৪, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৫৫, জুন ২৬, ২০১৯

ঢাবিঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট বুধবার (২৬ জুন) সিনেটে উপস্থাপন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দীন সিনেট সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে এ বাজেট উপস্থাপন করবেন।

জানা গেছে, এবার ঢাবির বাজেটের পরিমাণ ৮১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তবে মোট বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৫.০৪ শতাংশ। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬.৬২ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্র প্রতিনিধিরা এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। একটি কলেজ প্রতিষ্ঠান আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার পার্থক্যই হলো গবেষণা। আর্ন্তজাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার জন্য অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কম হওয়ার বিষয়টিকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গবেষকরা যা বলছেন
‘ইমেরিটাস’ উপাধিতে ভূষিত অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গবেষণা ছাড়া তো বিশ্ববিদ্যালয় চলে না। এটি কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না, এটি তো গবেষণা প্রতিষ্ঠান। যেখানে জ্ঞান সৃষ্টি করা হবে। তাই ঢাবির গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রয়োজন। আগে যে বরাদ্দ দেওয়া হতো তাতেও আমরা সমালোচনা করতাম। কিন্তু এবারে আগের চেয়ে কমানো হয়েছে, যা মোটেও ঠিক না। গবেষণার বিষয়টি কেবল বরাদ্দের বিষয় না। এটিকে উৎসাহিত করারও বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনাও নেই, যা আছে তাও সীমিত। আসলে গবেষণার যে মর্যাদা সেই মর্যাদা লঙ্ঘিত হচ্ছে, আর সেটা হচ্ছে গবেষণায় বরাদ্দ কম দেওয়ার মাধ্যমে। জ্ঞানের চর্চা ছাড়া তো আমরা এগোতে পারবো না। শুধু বাইরের অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে তো আর হবে না।’

জাতীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি গবেষণাখাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা বাড়ানো প্রয়োজন। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গবেষণা রয়েছে অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় বাজেটেও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অনেক কম রাখা হয়েছে। যার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেটেও গবেষণাখাতে বরাদ্দ কমেছে। গবেষণাখাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা অনেক কম। এভাবে তো আসলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন হয় না। কিন্তু এর জন্য জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে আমাদের বরাদ্দের পরিমাণকেই দায়ী করছি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি গবেষণা না-ই হয় তাহলে কলেজের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায় থাকবে?’

অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গবেষণাখাতে ব্যয় বাড়ালে বা কমালে কিছু যায় আসে না। কারণ বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান যে সমস্যা তা হলো, এখানে আসলে কোনও জবাবদিহিতার কাঠামো নেই। এখানে যদি আজকে বাজেটের ৫০ শতাংশও গবেষণাখাতে ব্যয় করে, তাহলেও গবেষণাখাতে কোনও উন্নয়ন হবে না বলে আমার ধারণা। কারণ, আমরা এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাসে যায় কিনা বা ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পড়াচ্ছেন কিনা তা নিশ্চিত করা যায়নি। সেখানে গবেষণার বরাদ্দ বাড়িয়ে কি লাভ? এখানে তো গবেষণার জন্য কাউকে জবাবদিহিতা করতে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় টাকা দিলো, কিন্তু ভালো গবেষণা হলো কিনা তারা কোনও জবাবদিহিতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো নেই।’

ছাত্র প্রতিনিধিদের দাবি 
ঢাবির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সহ-সাধারণ সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের প্রাণের ঢাবি এখন একটি ‘টিচিং এবং লার্নিং’ ইউনিভার্সিটিতে পরিণত হয়েছে। আমরা মনে করি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে রিসার্চ ইউনিভার্সিটিতে পরিণত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গবেষণাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং পঠন-পাঠন সামগ্রী গবেষণা কেন্দ্র হওয়া উচিৎ। সেক্ষেত্রে আমরা ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দাবি জানাই, যাতে গবেষণাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়। এছাড়াও সিনেট অধিবেশনে আমাদের সিনেট প্রতিনিধি থাকবে, তারা বিষয়টি অধিবেশনে জোরালোভাবে তুলে ধরবেন।’

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজের মতো চলতে না দেওয়ার কারণেই নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হচ্ছে না। আসলে জ্ঞান সৃষ্টির জন্য যে গবেষণা, সেটিকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্যই এই খাতে কম বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চরিত্র, তা পাল্টানোর অপচেষ্টা চলছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন র‌্যাংকিংয়ে থাকে না। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে কোনোভাবেই প্রতিযোগিতায় টিকছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক কাজ হলো গবেষণা, তবে একে শুধু সার্টিফিকেটধারী তৈরির কারখানা হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।’

গবেষণা কাতে বরাদ্দ কমা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোন খাতে কত ব্যয় করা হবে, সে নির্দেশনা সরকার দিয়ে দেয় এবং সে নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট বরাদ্দ পায়। আমরা চাইলেই তা পরিবর্তন করতে পারি না। যেমন বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ থাকে মোট বাজেটের ৬০ শতাংশ। বাকি বাজেট গবেষণাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়। সব সময় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা এবং গবেষণায় বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। অবশ্যই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এটিকেই সাপোর্ট করার জন্যই। তবে, এবারে গবেষণা খাতে ওইভাবে বলতে গেলে তেমন বরাদ্দ বাড়েনি।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেকেপ প্রকল্পের আর্থিক অনুদান এবারের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় গবেষণায় বরাদ্দ কমেছে। তবে, কেউ যদি ভালো গবেষণা করতে চান, তাহলে টাকার অভাব হবে না। বিভিন্নক্ষেত্র থেকে আমরা গবেষণার জন্য আর্থিক সহযোগিতা পাবো। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ব্যয়ে গবেষণার বরাদ্দ রাখা উচিৎ, সে বিষয়টি আমি দেখবো।’

/টিটি/

লাইভ

টপ