ঢাবি ‘গবেষণা খাতে’ বরাদ্দের বিষয়ে কী বলছেন গবেষক ও ছাত্রনেতারা

Send
সিরাজুল ইসলাম রুবেল, ঢাবি
প্রকাশিত : ১৭:১০, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৫, জুন ২৬, ২০১৯

গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে সিনেট ভবনের সামনে মানববন্ধন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)-এর ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য ও সিনেট সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে বুধবার (২৬ জুন) বিকাল তিনটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে বাজেট উপস্থাপন করেন কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড.কামাল উদ্দীন। এরপর ‘গবেষণা খাতে’ বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা।

তাদের অন্য দাবিগুলো হলো- সব বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ করা, সব প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করা, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার্থীদের বহন করা বাসগুলো রাত ৮টা পর্যন্ত চালু রাখা ইত্যাদি ৷ 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের পরিমাণ হলো ৮১০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। মোট বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫.০৪ শতাংশ, যা গত বছর ছিলো ৬.৬২ শতাংশ।

এ বিষয়ে শিক্ষক, গবেষক ও ছাত্রপ্রতিনিধিরা বলছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। একটি কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যকার পার্থক্যই হলো এটা।

কী বলছেন গবেষকরা? 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ গবেষণা করায় ‘ইমেরিটাস’ উপাধিতে ভূষিত অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গবেষণা ছাড়া তো বিশ্ববিদ্যালয় চলে না। এটি তো কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না, এটি তো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেখানে জ্ঞান সৃষ্টি করা হবে। তাই গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আগে যে বরাদ্দ দেওয়া হতো, তাতেও আমরা সমালোচনা করতাম। কিন্তু এবারে আগের চেয়ে কমানো হয়েছে, যা মোটেও ঠিক না। গবেষণার বিষয়টি কেবল বরাদ্দের বিষয় না, এটিকে উৎসাহিত করারও বিষয়। আসলে গবেষণার যে মর্যাদা সেই মর্যাদাটা লুণ্ঠিত হচ্ছে, আর সেটা হচ্ছে গবেষণায় বরাদ্দ কম দেওয়ার মাধ্যমে। শুধু বাইরের অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে তো আর হবে না। জ্ঞানের চর্চা ছাড়া তো আমরা এগুতে পারবো না।’

জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমি মনে করি গবেষণাখাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা বাড়ানো উচিত। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের জাতীয় বাজেটেও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অনেক কম রাখা হয়েছে, যার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেটেও গবেষণাখাতে বরাদ্দ কমেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি গবেষণা না হয়, তাহলে কলেজের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়? তখন তো এটি কলেজে পরিণত হবে। আমাদের দেশে যারা বেকার, দুর্বল তারাই গবেষণা করেন। অর্থাৎ গবেষণার জন্য কোনও ফান্ড নেই। তবে, আমি বলবো এটি সরকারের ওপর নির্ভর করছে। সরকার শিক্ষাকে কীভাবে দেখছে।’

অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গবেষণাখাতে ব্যয় বাড়ালে বা কমালে কিছু যায় আসে না। কারণ বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রধান যে সমস্যা, তা হলো এখানে আসলে কোনও জবাবদিহিতার কাঠামো নেই। এখানে যদি আজকে বাজেটের ৫০ শতাংশও গবেষণাখাতে ব্যয় করে, তাহলেও গবেষণাখাতে কোনও উন্নয়ন হবে না। কারণ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঠিক মতো ক্লাসে যায় কিনা, বা ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কী পড়াচ্ছেন, এধরনের কোনও জবাবদিহিতা আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারিনি। এখানে তো গবেষণার জন্য তো কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় টাকা দিলো, কিন্তু ভালো গবেষণা হলো কিনা তারা কোনও জবাবদিহি নেই।’ 

ছাত্রনেতাদের বক্তব্য:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সহ-সাধারণ সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটি ‘টিচিং এবং লার্নিং’ ইউনিভার্সিটিতে রয়ে গেছে। আমরা মনে করি এই বিশ্ববিদ্যালয়কে রিচার্স ইউনিভার্সিটিতে পরিণত করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গবেষণাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।’

ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে জ্ঞান সৃষ্টির জন্য যে গবেষণা, সেটিকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্যই এই খাতে কম বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চরিত্র, সেটিকে পাল্টানোর অপচেষ্টা চলছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন র‌্যাংকিংয়ে থাকে না। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে কোনোভাবেই প্রতিযোগিতায় টিকছে না।’ 

গবেষণা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার কারণ:

বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) দশ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এবারের বাজেটে এই প্রকল্পের আর্থিক অনুদান না থাকায় গবেষণা খাতের বরাদ্দ কমেছে বলে জানা যায়। তবে, এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে এটির আর্থিক অনুদান পেলে গবেষণা খাতের বরাদ্দও বাড়বে।

যা বলা হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে:

এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দীন বলেছেন, ‘কোনখাতে কত ব্যয় করা হবে, সে নির্দেশনা সরকার দিয়ে দেয় এবং সে নির্দেশনা অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ পেয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা চাইলেই তা পরিবর্তন করতে পারি না। যেমন বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ থাকে মোট বাজেটের ৬০ শতাংশ। বাকি বাজেট গবেষণাসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়। সব সময় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা এবং গবেষণা বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। অবশ্যই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এটিকেই সাপোর্ট করার জন্যই। তবে, এবারে গবেষণা খাতে ওইভাবে বলতে গেলে তেমন বরাদ্দ বাড়েনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, ‘হেকেপ প্রকল্পের আর্থিক অনুদান এবারের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় গবেষণায় বরাদ্দ কমেছে। তবে, কেউ যদি  ভালো গবেষণা করতে চান, তাহলে টাকার অভাব হবে না। বিভিন্নক্ষেত্র থেকে আমরা গবেষণার জন্য আর্থিক সহযোগিতা পাবো। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব ব্যয়ের খাত থেকে গবেষণার বরাদ্দ রাখা উচিত, সে বিষয়টি আমি দেখবো।’  



/এএইচ/

লাইভ

টপ