রিফাত হত্যা: ফেসবুকে ঘৃণার ঝড়

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১১:১৮, জুন ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৮, জুন ২৭, ২০১৯

ড. গীতিআরা নাসরিনের স্ট্যাটাস বুধবার (২৬ জুন)। সকাল সাড়ে ১০টা। আলো ঝলমলে একটি দিনের শুরু। রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচলও স্বাভাবিক। অন্যদিনগুলোর মতোই এদিনটাও স্বাভাবিক-সুন্দরভাবেই শুরু হয়েছিল তরুণ দম্পতি রিফাত ও মিন্নির। বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল সন্ত্রাসী-মাদক ব্যবসায়ী নয়নসহ একদল দুর্বৃত্ত। রিফাত তার স্ত্রীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসতেই খুনিরা তাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।দুই দুর্বৃত্ত প্রকাশ্যে রাম দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে রিফাত শরীফকে (২৫)। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীরা তখন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নীরব দর্শক মাত্র! ওরা কি আসলেই পথচারী নাকি খুনিদের সহযোগী? ব্যতিক্রম কেবল মিন্নি। কখনও স্বামীকে আড়াল করার চেষ্টা, রাম দা হাতে উদ্যত দুই জল্লাদকে ঝাপটে ধরার চেষ্টা। কিন্তু প্রাণপণ সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয় তার। রাম দা’র ক্রমাগত আঘাতে ততক্ষণে রিফাতের সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে নিস্তেজ প্রায়। খুব অল্প সময়ে অপারেশন শেষ করে অস্ত্র উঁচিয়ে বীরদর্পে এলাকা ত্যাগ করে খুনিরা। গুরুতর অবস্থায় রিফাতকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রথমে বরগুনা সদর হাসপাতালে এবং পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বুধবার বিকালে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রিফাত।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিও’র নির্মম দৃশ্যগুলো মানুষকে হতবাক করে দেয়। এমন দৃশ্য মেনে নেওয়া কষ্টের। ক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। এর বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ফেসবুকে, নিন্দার ঝড় ওঠে। ক্ষোভ, ঘৃণা, প্রতিবাদ ও খুনিদের শাস্তির দাবি জানিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজ নিজ ওয়ালে স্ট্যাটাস দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন লিখেছেন—‘‘চুল খোলা আয়েশা…’’ নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়, দেহভঙ্গিমাই বলে দেয় তারা Second Line of support. এটা আমার মতো আম বুঝতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তারক্ষাকারী ঝুনো নারকেলরা বুঝতে পারছেন না বলে মনে করেন?

প্রভাষ আমিনের স্ট্যাটাস

সাংবাদিক ও কলামিস্ট প্রভাষ আমিন তার পোস্টে লিখেন, ‘একটি ভিডিও নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। আমি এখনও দেখিনি, দেখার সাহসও পাচ্ছি না। দুই সন্ত্রাসী প্রকাশ্য রাজপথে কুপিয়ে এক যুবককে হত্যা করেছে। হতভাগা যুবকের স্ত্রী চেষ্টা করেও তার স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি। স্বামীকে বাঁচাতে না পারা সেই নারীর অসহায়ত্ব আমাদের সবাইকে গ্রাস করেছে। এভাবেই কি সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে? আর কতদিন? আর কতদিন? কবে এই নির্বিকারত্বের, প্রতিবাদহীনতার অবসান ঘটবে?’

সাংবাদিক লুৎফর রহমান হিমেল লিখেছেন, ‘রাম দা হাতে দুই খুনি কোপাচ্ছে রিফাত শরীফ নামের এক যুবককে। পেছনে তার স্ত্রী জাপটে ধরে আটকানোর চেষ্টা করছে খুনিদের। স্বামীকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা তার ব্যর্থ হয়। রিফাত লুটিয়ে পড়েন।

ঘটনাটি রাত-বিরাতে নয়, সকাল দশটার। বরগুনা সরকারি কলেজের গেটে শত লোকের চোখের সামনে একটা তরতাজা যুবককে এভাবে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো। ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে তার হত্যার ভিডিও। আমি দেখার সাহস পাইনি। স্ক্রিনশটের ছবিগুলো শুধু দেখলাম। এই স্থিরচিত্র দেখেই আমি কিছুসময় বাকরুদ্ধ ছিলাম।

সাংবাদিক লুৎফর রহমান হিমেলের পোস্টআমাদের প্রশাসন চলছে ব্রিটিশ আমলের আইনে। কিছুটা সংশোধন-বিয়োজন অবশ্য হয়েছে। কিন্তু মূল আইন সেগুলোই আছে। নাহলে অপরাধ প্রমাণ হলে শাস্তি দিতে দেরি হবার কথা না। ব্রিটিশ আমলে ভিডিও ছিল না, সিসি টিভি ক্যামেরা ছিল না। প্রযুক্তির পরিবর্তনে আইনও বদলানো দরকার। এই যেমন, বরগুনার এই ঘটনার ভিডিও বড় প্রমাণ। এই ভিডিওকে সামনে নিয়ে বিশেষ আদালত বসিয়ে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে বিচারপ্রার্থীদের মনে কিছুটা সান্ত্বনা মিলতো। সংসদ অধিবেশন চলছে, এই অধিবেশনেই এমন একটি আইন তৈরি করা হোক। এ ধরনের অপরাধ ৯০% কমে যাবে, গ্যারান্টি।

যেহেতু প্রমাণ আছে, তাই রিফাতের দাফনের আগেই দুই অপরাধীকে ধরে এনে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক। সুবিচারের নজির সৃষ্টি হোক।

আর নাহলে ৫ বছর, ১০ বছর, ২০ বছর আদালত-শুনানি-টাকা পয়সার গচ্চা দেওয়ার পর সেই বিচার দিয়ে কী হবে? সেই বিচারকে নজিরবিহীন বলবো কী করে? আমি ব্যক্তিগতভাবে অমন বিচারের পক্ষে না।’

বাকি বিল্লাহ স্ট্যাটাসবাকি বিল্লাহ লিখেছেন, ‘তুলনা কইরেন না। বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ কারও সঙ্গেই তুলনা কইরেন না। তুলনা করলেই ঘটনাগুলো পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়—আর মনে হয়, আপনি বুঝি এবার প্রতিশোধ নিয়ে নিলেন। ধারালো অস্ত্র হাতে প্রতিটি খুনির একই চেহারা, অভিন্ন মুখ। বিপরীতে মরতে থাকা রক্তাক্ত শার্ট অথবা পাঞ্জাবি গায়ের মানুষগুলোও একই মানুষ।

দাঁড়িয়ে থাকা নির্বিকার মানুষগুলোকে গালি দিয়েন না। ওরা আপনার আমারই আয়না। এই ডাকাত রাষ্ট্র-সংস্কৃতি এরচেয়ে ভালো কিছু পয়দা করতে সক্ষম না। বাস্তবতা বদলাতে চাইলে সবগুলো দেয়াল আর আড়াল ছিঁড়ে ফেলে ওই আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে হবে আমাদের; পরস্পর বিশ্বাস ফিরে পেতে হবে। চিৎকার করে বলতে হবে—আয়রে ভাই, আয়রে বইন, আর কত! আয় এবার হাতে হাত বাইন্ধা দাঁড়াই। একজন যেদিন জানবে, সে রুখে দাঁড়ালে এগিয়ে আসবে অন্যরাও—সেদিন আর কেউ নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকবে না।’

ঢাবি শিক্ষার্থী অনিমেষের স্ট্যাটাসঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী জাকারিয়া হোসাইন অনিমেষ তার ওয়ালে লেখেন, ‘খুন করা ঠেকাতে মানুষ এগিয়ে আসেনি কেনো? তার চাইতে বড় প্রশ্ন—দেশে কোন কোন রাজনৈতিক শক্তি ও চিন্তা এবং আদর্শের সমন্বয়ে এমন এক অবিচার-বিচারহীনতার অবস্থা তৈরি হইছে যে, খুনিরা মুখ না ঢেকেও দিনের আলোয় প্রকাশ্যে এত সময় ধরে খুন করতে পারে। খুনিরা কারা? তাদের এই সুপার পাওয়ারের উৎস কী? কীভাবে এই সুপার পাওয়ার খুনিদের পেছনে জমা হলো? যারা খুন করা ঠেকাতে যাবে, তারা কি ওই সুপার পাওয়ারওয়ালা খুনিদের কাছে নিরাপদ?’

শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবির ঢালী লিখেছেন, ‘কোনও কথা হবে না। রিফাতের খুনিদের ধরে ডাইরেক্ট ক্রসফায়ারে দেওয়া হোক। এই নিয়ে কোনও যুক্তিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ, নীতি-রাজনীতি শুনতে চাই না। শান্তিতে বসবাস করতে চাই। যারা দাঁড়িয়ে থেকে বেকুব দর্শক হয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখেছে, তাদের প্রতি ঘৃণা।’

সাংবাদিক গোলাম মওলার স্ট্যাটাসরিফাত হত্যাকাণ্ডের ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক গোলাম মওলা লিখেছেন, ‘আসুন আমরা সবাই তাকিয়ে থাকি। আর ওরা কোপাতে থাকুক।’

কানাডা প্রবাসী ক্রীড়া সাংবাদিক ফরহাদ টিটোর স্ট্যাটাস—‘প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা…তখনই হয়, যখন অপ্রকাশ্য অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে আইন আর বিচার প্রক্রিয়া।’

শাওন মাহমুদের পোস্টশহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ লিখেছেন, ‘এইটা কী দেখলাম আমি!!! এক বিশ্বজিৎ এখনও চোখে ভাসে। আরেক রিফাত এসে হাজির হলো সাথে। এ কেন দেখলাম আমি!!! (দুর্বল চিত্তদের না দেখা ভালো)।’

অ্রাক্টিভিস্ট দীপার স্ট্যাটাসঅ্যাক্টিভিস্ট বৃত্ত্বা রায় দীপা তার পোস্টে বলেছেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে কুপিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। কোথায় বাস করছি আমরা!? এদেশে আইন পুলিশ সেনাবাহিনী মন্ত্রী মিনিস্টার সব আছে। নেই শুধু ন্যূনতম মানবিক বোধ। কোনেও দলের চ্যালাপালা কুপিয়ে মানুষ মারে। কোনও দলেরটা আবার পুড়িয়ে মারে। কে কার বিচার করবে? আমার দেখা সময়ের মধ্যে সবচেয়ে অন্ধকারে এখন বাংলাদেশ।’

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীনের স্ট্যাটাসঅ্যাক্টিভিস্ট ও লেখক লীনা পারভীন লিখেছেন, ‘অপরাধীকে ধরা কি খুব কঠিন? সহজ আবার কঠিনও। কঠিন কারণ খুনের বিচার করার মানসিকতার অভাব। একটা সমাজ যখন আইন-আদালতের ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন আইনের শাসনকে এভাবেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় নয়নের মতো এমন ছোকড়ারাও। সিদ্ধান্ত আমাদের, এই রাষ্ট্রের, এই আইন ব্যবস্থাপকদের। কোনদিকে যাবো, আর নিয়ে যাবো এই দেশ, এই সমাজকে—খুনের রাজ্যে না আইনের শাসনে? চলুন, সমাধান খুঁজি।’

 আরও পড়ুন:

আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে: রিফাতের বাবা 

রিফাত হত্যা: ১২ জনের নামে মামলা, গ্রেফতার ১

‘সে যে মাদক ব্যবসা করে তা আমি জানতাম না’

 

স্বামীকে বাঁচাতে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ নারীর, তবুও শেষ রক্ষা হলো না

 

/এএ/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ