বামনায় বদলে গেছে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১০:৩৭, জুলাই ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৩৫, জুলাই ০৪, ২০১৯

রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়বরগুনার বামনা উপজেলার রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন দুপুরে শিক্ষার্থীদের রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও পাসের হার শতভাগ, ঝরে পড়ার হার শূন্য, আর গড় উপস্থিতি ৯৮ শতাংশ। বিরতির সময়ে কোনও শিক্ষার্থীই স্কুল ফাঁকি দিয়ে চলে যায় না। শুধু রুহিতার এই স্কুলটিই নয়, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-এর আওতায় বামনা উপজেলার ৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি এবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং চারটি এনজিও পরিচালিত স্কুলেও দুপুরে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। এসব স্কুলে শিক্ষার মানও ঈর্ষণীয়। বলা যায়, দুপুরে শিক্ষার্থীদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণের উদ্যোগই এই সাফল্যের বড় কারণ। এখানকার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে এমন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, উপজেলার ৬২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৬৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতি ৯৭ শতাংশ।

 রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরে রান্না করা খাবার খাচ্ছে শিশুরাসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য মতে, স্কুলে দুপুরে খাবার বিতরণের কারণে বামনা উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার নারী সবজি চাষি এবং রাধুনী হিসেবে ১৪৩ জন নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এছাড়া, জ্বালানি কাঠের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে আরও ৩৫ জনের।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বরগুনার বামনা এবং জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ডব্লিউএফপি’র আওতায় ২০১৩ সাল থেকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মিড-ডে মিল বা দুপুরে রান্না করা খাবার বিতরণ। পরে এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে বান্দরবানের লামা উপজেলাও। সেখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও দুপুরে খাবার দেওয়া হচ্ছে। ডব্লিউএফপি স্থানীয় বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে  এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। অর্থিক সহায়তা না দিলেও সরকারএ প্রকল্পে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে।

 রান্নার করা খাবার খাচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরারুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রান্না ঘরে বসে কথা হচ্ছিল তিন রাঁধুনির সঙ্গে। এখানকার প্রধান রাধুনী রানী বেগম। তাকে সহায়তা করেন মাসুদা বেগম ও খাদিজা বেগম। অ্যাপ্রোন পরে তারা খিচুড়ি রান্না করছিলেন। তারা জানান, প্রধান রাধুনী মাসে বেতন পান ৬ হাজার ১৩০ টাকা এবং অন্য দুজন পান ৫ হাজার ১৫০ টাকা করে।

রানী বেগম বলেন, ‘আগে সংসার চালাতে পারতাম না, এখন সংসার চালাতে কোনও কষ্ট হয় না। এলাকায় রান্না করার জন্য লোকজন আমাদের ডাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াতও পাই।’

সবজিচাষী আকলিমা বেগম বলেন, ‘স্বামীর আয়ে সংসার চলতো না। এখন সবজি চাষ করে মাসে ১২শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা আয় করি। সবজি চাষে খরচ হয় ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে।’ তিনি বলেন, আমার ছেলে রুহিতা স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তাকে লেখাপড়া করাতে কষ্ট হয় না। অনেকেই সবজি চাষ করে আমার চেয়ে বেশি আয় করে।’

রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছে রান্নার আয়োজনরুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইব্রাহীম খলিল বলেন, ‘এই কর্মসূচি চালুর আগে অনেক শিশুই স্কুলে ভর্তি হতো না। এখন এলাকার সব শিশুই স্কুলে ভর্তি হয়। গড়ে ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্কুলে উপস্থিত থাকে। আমাদের স্কুলে  শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কোনও দৃষ্টান্ত নেই। বিরতির সময় কেউ আর স্কুল পালায় না। ম্যানেজিং কমিটি অ্যাকটিভ থাকে।’

রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও উপজেলার দক্ষিণ সফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ছোটভাই জোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

রান্না করা খাবার বিতরণ প্রসঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুশীলনের সহকারী পরিচালক শেলিনা আকতার বলেন, ‘বামনা উপজেলার ৬৮টি বিদ্যালয়ে সপ্তাহে পাঁচ দিন খিচুড়ি দেওয়া হয়। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিসহ প্রথম শিফটের খাবার দেওয়া হয় বেলা ১২টায়। এরপর দ্বিতীয় শিফটের খাবার দেওয়া হয় দুপুর দেড়টায়। একেক দিন একেক ধরনের সবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি দেওয়া হয় চার দিন। সপ্তাহে একদিন খিচুড়ির সঙ্গে ডিম দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার দেওয়া হয় উচ্চপুষ্টির বিস্কুট।’

বামনা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোফাজ্জেল হোসেন মণ্ডল বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে এই কর্মসূচি নজিরবিহীন। শতভাগ ভর্তি, উপজেলায় শিক্ষার্থীদের গড় উপস্থিতি ৯৭ শতাংশ। শিশুরা স্কুলকে আর সমস্যা মনে করে না। আনন্দের মাধ্যমে লেখাপড়া করে। দেশের সব উপজেলায় এমন কর্মসূচি চালু করা দরকার। সরকারিভাবে এই উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে। ঝরে পড়াও  পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব। এছাড়া, সারাদেশে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়বে। শিশুদের পুষ্টিহীনতায় ভুগতে হবে না। মানুষ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলী হরি বলেন, ‘এটা একটা জনহিতকর কর্মসূচি। এটি প্রাথমিক শিক্ষার মানউন্নয়নে অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণস্বাক্ষরতা অভিযান (ক্যাম্পে) এর উপপরিচালক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘বরগুনা জেলার বামনা উপজেলাসহ দেশের তিনটি উপজেলায় দুপুরে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়। সফল এই কর্মসূচি সরকারিভাবে চালু করলে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে। শিক্ষার্থীরা মনোযোগের সঙ্গে লেখাপড়া করতে পারবে।’

কে এম এনামুল হক আরও  জানান, বর্তমানে দেশের ১০৪টি উপজেলায় ১৫ হাজার ৮০টি বিদ্যালয়ে স্কুল ফিন্ডিং কর্মসূচি চালু আছে। এরমধ্যে ৯৩টি উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। স্কুলগুলোতে শিশুদের উচ্চপুষ্টির বিস্কুট দেওয়া হয়। তবে এর পাশাপাশি দেশের তিনিট উপজেলায় ডব্লিউএফপি’র অধীনে স্কুল মিল কর্মসূচি চলছে। এই কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের দুপুরে স্কুলে রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে।

কর্মসূচি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

সরেজমিনে বামনার বিভিন্ন  স্কুলের সফলতা যেমন চোখে পড়েছে, তেমনই এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা গেছে। কিছু বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বনের কথাও বললেন সংশ্লিষ্টরা। তারা চাল-ডাল-তেল সংরক্ষণ, রান্না করা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলেন। যথাযথ মনিটরিং করা না হলে তেল,লবণ ও ডাল লোপাট হেওয়ার সম্ভাবনার কথা  জানান তারা।

রুহিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্ন রান্না ঘর

স্থানীয়দের দাবি,শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম থাকলেও শতভাগ উপস্থিতি দেখানোর মাধ্যমে খাদ্য সামগ্রী লোপাটের আশঙ্কা থাকে। এছাড়া, শিক্ষকতার বাইরে শিক্ষকরা সারাবছর বিভিন্ন সমীক্ষাসহ সরকারি অন্যান্য দফতরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এমন অবস্থায় স্কুলে রান্নার কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ত করা হলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।

তবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ক্যাম্পের উপ-পরিচালক কে এম এনামুল হক এবং সুশীলনের সহকারী পরিচালক শেলিনা আকতারসহ  বলেন, ‘কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অংশগহণ নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। এখন যেমন শিক্ষকদের এই কর্মসূচির বাইরে রেখে ক্রয় কমিটির মাধ্যমে কেনাকাটা করা হচ্ছে। এছাড়া, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও আমরা যেমন মনিটরিং করছি, তেমনই সরকারিভাবে এ প্রকল্প শুরু হলে এবং মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করলে এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণ কঠিন কিছু নয়।’

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ